সালাম বলল, হাকিম সাহেব, কাকার অত্যাচারে চিরঞ্জীবের দু কেজি ওজন কমে গেছে। ও কাকাকে তাড়িয়েই দিচ্ছিল। আমি বলেছি, দ্যাখ ওজন কমান সোজা ব্যাপার নয়। আজকাল এসব ব্যাপারে খুব খরচা। কাকার জন্যে দু কেজি ওজন কমেছে, আর কয়েকদিনে আরও তিন কেজি ফ্যাট ঝরিয়ে নে। পাঁচ কেজি ওজন কমে গেলেই কাকাকে ঘাড় ধরে বাসা থেকে বের করে দিবি।
এই সালাম এবং চিরঞ্জীব আমাদের এই সাপ্তাহিক সান্ধ্য বাসরটি মোটামুটি জমিয়ে রেখেছে। এক শনিবার সালামকে বললাম, সালাম, সামনের শনিবার আমার পুরনো আর বন্ধুদের এখানে ডেকেছি। মাছের কচুরি পনিরের সিঙাড়া আর তেঁতুল-লঙ্কা কুচো চিংড়ির চাট–তোমাদের বউদি বাসায় করবেন। তুমি আর চিরঞ্জীব অবশ্য আসবে। তোমার সেদিন স্পেশাল পারফরম্যান্স চাই।
সালাম বলল, আমি বিশেষ কিছু পারব না, তবে পঁচিশ গ্রাম গাঁজা, চার বোতল চোলাই, দু বোতল বাংলা, দু বোতল রাম নিয়ে আসব।
আমি চমকে গিয়ে বললাম, এসব তোমার কাছে কে চেয়েছে? আমি তোমার কাছে পারফরম্যান্স চাইছি, যাতে আমার পুরনো বন্ধুরা বুঝতে পারেন আমি এই নতুন পাড়ায় ভালই। আছি।
পরের শনিবার যথাদিনে এল। সন্ধের একটু আগে সালাম অফিসের একটা জিপে করে এসে গাঁজা থেকে রাম পর্যন্ত তার ফিরিস্তি মতো সব জিনিস নামিয়ে দিয়ে গেল। আমাকে বলল, আমি একটু একটা নার্সিংহোমে যাচ্ছি। আমার ছোটসাহেবের একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। আমি তাঁকে একটু দেখে সরাসরি এখানে ফিরে আসব।
আমি বললাম, দেরি করবে না।
সালাম বলল, না দেরি হবে না। ছোটসাহেবকে দেখে, তার স্টকটা বুঝিয়ে দিয়ে চলে আসব।
আমি বললাম, স্টক আবার কী?
সালাম বলল, নার্সিংহোমে একা একা পড়ে আছেন। একটু সাহচর্য দিতে হবে তো?
আমি প্রশ্ন করি, সাহচর্য?
সালাম মৃদু হেসে জিপের সামনের সিটে উঠতে উঠতে বলল, অল্প গাঁজা কিছু চোলাই, কিছু বাংলা আর অল্প রাম। এই আর কী?
আমাদের শনিবারের আড্ডা সেদিন নতুন পুরনোয় জমজমাট।
প্রায় শেষাশেষি সালাম এল। চোখ লাল, একটু টলছে। এসে ঢুকতে চিরঞ্জীব আমাকে ফিসফিস করে বলল, গাঁজা আর মদ দুইই খেয়েছে।
সালামের দৌলতে সেদিন আমার আড্ডাতেও গাঁজা আর মদ দুই চলছিল। আমি চিরঞ্জীবের কথায় পাত্তা না দিয়ে সালামকে বললাম, কী খবর?
সালাম বলল, দাদা ভাল খবর খারাপ খবর দুইই আছে।
আমি বুঝলাম শ্রীমান প্রস্তুত হয়ে এসেছে। জিজ্ঞাসা করলাম, খারাপ খবরটা বা কী? ভাল খবরই বা কী?
সালাম বলল, আমার নয়, আমার সাহেবের।
আমি অনুমতি দিলাম, তাই বলো।
সালাম যা বলল সেটা অকল্পনীয়। সন্দেহ হল, বোধহয় সত্যি কথাই বলেছে। কারণ এতটা বানানো সহজ নয়।
সালামের ছোটসাহেবের খুব জুতোর শখ। গাঁজা, মদের পরই তার জুতোর নেশা। প্রায় বিশ পঁচিশ জোড়া জুতো তার। চেনাশোনা কারও পায়ে নতুন এক জোড়া ভাল জুতো দেখলেই তিনি খোঁজ নেন, কোথা থেকে কিনলেন? কত দাম?
সেই ছোটসাহেব পরশুদিন চিনেবাজারে জুতো কিনতে গিয়েছিলেন। অনেক দর দাম করে সাড়ে আটশো টাকা দিয়ে একজোড়া লাল চামড়ার ফিতেওলা জুতো কিনে, সেই নতুন জুতো জোড়া পায়ে দিয়ে পুরনো জুতো জোড়া জুতোর বাক্সে ভরে, বগলে করে অফিসে ফিরছিলেন।
চিনেবাজারের অদুরেই অফিস। পায়ে হেঁটেই ছোটসাহেব ফিরছিলেন।
সেদিন সকালবেলা থেকে টিপটিপ করে বৃষ্টি হচ্ছিল। রাস্তাঘাট পিছল। চিৎপুর আর লালবাজারের মোড়ে তাড়াতাড়ি রাস্তা পেরোতে গিয়ে ছোটসাহেব পা পিছলে রাস্তার ওপরে চিত হয়ে পড়ে গেলেন। একটা মোটর সাইকেল বাস লরির পাশ কাটিয়ে কলাকৌশল সহকারে ড্রিবল করতে করতে আসছিল, সেটা অবলীলাক্রমে ছোটসাহেবের পায়ের ওপর দিয়ে উঠে গেল।
এরপরে আর ছোটসাহেবের কিছু মনে নেই। জ্ঞান হয়েছে পরের দিন সকালে নার্সিংহোমে, জ্ঞান ফেরার পরই খোঁজ করেছেন, আমি কোথায়? এবং তারপরে আমার নতুন জুতোজোড়ার কী হল? পায়ে এত ব্যথা কেন?
ধীরে ধীরে লোকের কথা শুনে তাঁর সবই অল্প অল্প মনে পড়ল। বুঝতে পারলেন পা দুটো একেবারে থেঁতলে গেছে। তবে নতুন জুতোজোড়া আছে, সেটা পা থেকে খুলে তার কেবিনেই রেখে দেওয়া হয়েছে।
একটু পরে ডাক্তারবাবু বললেন, আপনার এক্স-রে-টেক্স-রে সব করা হয়ে গেছে। কাল রিপোর্ট পাবেন।
পরের দিন সকালে ডাক্তারবাবু এলেন, এসে বললেন, আপনার খবর আছে। ছোটসাহেব জিজ্ঞাসা করলেন, কী খবর, ডাক্তারবাবু?
ডাক্তারবাবু বললেন, খারাপ খবর আর ভাল খবর দুইই আছে।
ছোটসাহেব বললেন, এ আবার কী হেঁয়ালি। ব্যাপারটা খুলে বলুন ডাক্তারবাবু।
ডাক্তারবাবু বললেন, আগে খারাপ খবরটা শুনবেন, না ভাল খবরটা?
ছোটসাহেব বহুকালের পোড় খাওয়া লোক। বললেন, আগে খারাপ খবরটাই বলুন।
ডাক্তারবাবু নির্বিকারভাবে বললেন, আপনার দুটো পা-ই কেটে ফেলতে হবে।
এই কথা শুনে ছোটসাহেব কপালে করাঘাত করে আর্তনাদ করে উঠলেন, তারপর বললেন, এর পরে আর ভাল খবর কী থাকতে পারে ডাক্তারবাবু?
ডাক্তারবাবু বললেন, পাশের কেবিনের ভদ্রলোক আপনার নতুন জুতো জোড়া কিনতে চেয়েছেন।
তখন আমাদের বাসায় আড্ডা একেবারে তুঙ্গে। গাঁজার ধোঁয়ায়, মদের গন্ধে ঘর জমজমাট।
সালামের গল্প শুনে সবাই ধন্য ধন্য করতে লাগল। পুরনো বন্ধুরা বললেন, এরকম আড্ডা ছাড়া যায় না। এখন থেকে প্রত্যেক শনিবার আসব।
