কিন্তু পাঞ্জাবিটা আছে। ঝুল এখন সেমিজের মতো প্রায় গোড়ালি পর্যন্তই আলখাল্লাই বলা চলে তবে হাত দুটো প্রত্যেকবার কাঁচার পরে তিন ইঞ্চি করে হেঁটে নিই, না হলে একটু অসুবিধা হয়।
ভাল খবর, খারাপ খবর
কাছাকাছি চেনা-পরিচিত লোকজন একেবারেই কেউ নেই, তা নয়। কিন্তু তেমন ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধব, এদিকে কেউ নেই। যাদের সঙ্গে বসে গল্পগুজব, পরনিন্দা, পরচর্চা করতে পারি, হো হো করে হাসতে পারি–সাদা কথায় প্রাণ খুলে আড্ডা দিতে পারি আমার সেরকম আপনজনেরা এই প্রান্তে কেউ নেই।
বেশি বয়েসে পুরনো এলাকা ছেড়ে চলে এসেছি, এরকম যে হবে সেটা জানতাম। কিন্তু কেমন খালি খালি লাগে। বিশেষ করে শনিবারের সন্ধেবেলায় মনটা হু হু করে ওঠে।
এর জন্যে আমি নিজেকে দোষ দিতে পারি না। অবলুপ্তপ্রায় বান্ধবতান্ত্রিক সমাজের শেষ জীব আমরা দু-চারজন এখনও আছি। অর্ধেক বা অর্ধেকের বেশি বোধ হয়, শেষ হয়ে গেছে। আকাশ প্রদীপ জ্বালিয়ে তাদের আহ্বান করতে হয়। অনেকদিন আগে এক কবি লিখেছিলেন,
পুরনো বন্ধুরা সব
স্মৃতির গম্বুজ হয়ে আছে।
আমার বন্ধুরা যারা এখনও বেঁচে আছেন, তাঁরা সবাই যে গম্বুজ হয়ে গেছেন, তা কিন্তু নয়। উৎসবে, ব্যসনে তাঁদের সঙ্গে দেখা হয়। কখনও সাবেকি দক্ষিণ কলকাতায়, কখনও অন্যত্র।
দেখা হয়, কথাবার্তা হয় কিন্তু আড্ডা আর আগের মতো জমে না। অসম্পূর্ণ আড্ডার শেষে অতৃপ্ত চিত্তে নতুন বাসায় ফিরে আসি। শহরের অন্য প্রান্তে।
একটা পুরনো ইংরেজি শ্লোক আছে।
প্রকৃতি শূন্যতা বর্জন করে। আসলে কথাটা হল প্রকৃতি কিছু শূন্য হতে দেয় না যথাস্থান পূর্ণ করে। এই লবণ হ্রদে আমারও তাই হয়েছে। পুরনো শূন্যতাকে নতুন শূন্যতা পূরণ করেছে।
অর্থাৎ এখানে আমার নতুন নতুন সব বন্ধু জুটেছে, অসমবয়সি সব বন্ধু। ঠিক হালফিলের যুবক না হলেও এখনও তেমন প্রৌঢ় হয়নি।
এই নতুন বন্ধুদের নিয়ে শনিবারের সন্ধেয় একটা আড্ডা শুরু করেছি। এদের সঙ্গে আমার বয়েসের মিল নেই, চিন্তার বা লেখাপড়ার মিল নেই কিন্তু একটা জায়গায় মিল আছে। এরা রাজনীতির ধার ধারে না, সিনেমার আলোচনা করে না, আবোল-তাবোল কথা, উলটো-পালটা গল্প বলতে ভালবাসে।
আমিও তাই ভালবাসি। আমার পুরনো আড্ডার পুরনো বন্ধুরাও তাই ভালবাসতেন। সমাজ-সংস্কার, শিল্প-সাহিত্য, সিনেমা-খেলা এসব কিছুই নয়, নেহাত নিরর্থক কথাবার্তা, অট্টহাসি–এ না হলে আড্ডা?
দক্ষিণ কলকাতার সনাতন আড্ডার মতো না হলেও আমাদের এই আড্ডায় আজ কিছুদিন হল, ওই সপ্তাহান্তে শনিবার বেশ ভিড় হচ্ছে। শুধু মধ্যবয়েসিরাই নয়, আমার মতো বিগত যৌবন দু-চারজন আসছেন। তবে আবদুস সালাম না এলে আড্ডাটা ভাল জমে না।
আবদুস সালাম বর্ধমানের ছেলে। মোটামুটি ভাল সরকারি চাকরি করে আবগারি দপ্তরের ইন্সপেক্টর। কাছাকাছি একটা সরকারি আবাসনে সপরিবারে থাকে।
সালামের গল্পগুলো একটু গাঁজাখুরি পর্যায়ের। তার বন্ধুরা পরিহাস করে বলে আবগারি দপ্তরের কাজে যে পরিমাণ গাঁজা সালাম সিজ করে তার প্রায় সবটাই ও নিজে খেয়ে নেয়, অতি অল্প অংশই সরকারের ঘরে জমা পড়ে।
এই আবদুস সালামই আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, দাদা, ইংরেজিতে তো স্ত্রীকে বেটার হাফ বলে, তাই না?
সে সুচতুরভাবে কোনও একটা রসিকতায় ঘোরাপথে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে বুঝতে পেরে আমি সতর্কভাবে উত্তর দিলাম। খুব সংক্ষিপ্ত উত্তর, হ্যাঁ।
সালাম বলল, তা হলে একজন লোক যদি দুবার বিয়ে করে তো শেষ হয়ে যাবে।
আমি আবার সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন করলাম, কেন?
সালাম বলল, বুঝতে পারছেন না? হাফে হাফে ফুল, একেবারে ফিনিশ।
এই রকম সব বাজে কথা বলায় ওস্তাদ, তার প্রতিবেশী চিরঞ্জীব, নিউ সেক্রেটারিয়েটে কাজ করে। সে সালামকে দুচোখে দেখতে পারে না। কিন্তু এদিকে দুজনে একসঙ্গে আমার বাসায় আসে। এবং সালামের হাসির কথা গম্ভীর হয়ে শোনে, কিছুতেই হাসে না।
একদিন সালাম এসে বলে, চিরঞ্জীবের বাড়িতে দেশ থেকে ওর এক কাকা এসেছে। প্রত্যেকদিন দুবেলা তার সঙ্গে ঝগড়া হচ্ছে।
চিরঞ্জীব সঙ্গেই ছিল, সে একটু মোটাসোটা হাসিখুশি ধরনের লোক। দেখলাম তাকে বেশ কাহিল দেখাচ্ছে। বললাম, কী ব্যাপার? কীসের ঝগড়া কাকার সঙ্গে? ৪৪
চিরঞ্জীব বলল, আর বলবেন না দাদা। পারিবারিক বিষয়-সম্পত্তির ব্যাপার। কাকা খুব জ্বালাচ্ছে। সাতদিনে দু কেজি ওজন কমে গেছে আমার।
এরকম ক্ষেত্রে যা বলতে হয় তাই বললাম, কাকাকে বরদাস্ত করছ কেন?
চিরঞ্জীব কিছু বলার আগে সালাম বলল, দাদা জানেন তো, সব ব্যাপারেই একটা ভাল দিক আছে, একটা খারাপ দিক আছে।
ভাল দিক, খারাপ দিক, ভাল ব্যাপার, খারাপ ব্যাপার, ভাল খবর, খারাপ খবর এই রকম সব ভাল-খারাপ নিয়ে সালামের কারবার, এটা তার মুদ্রা দোষ।
কিন্তু চিরঞ্জীবের আজকের ব্যাপারটার মধ্যে সালাম সেই ভাল খারাপ টেনে আনায় একটু বিস্মিত হলাম, এর মধ্যে ভাল কী থাকতে পারে।
এই শনিবারীয় সান্ধ্য আচ্ছায় আর যাঁরা আসেন তারা প্রবীণ মান্যগণ্য লোক। সালাম আর চিরঞ্জীব থাকলে বিশেষ কথা বলার সুযোগ পান না। এবং প্রাজ্ঞের মতো চুপ করে থাকেন। এঁদেরই একজন রণদাপ্রসাদ বাবু একজন অবসরপ্রাপ্ত হাকিম। তিনিই মাঝে মধ্যে দুয়েকটা প্রশ্ন তোলেন, আজ তিনিই আমার মনের জিজ্ঞাসাটি ব্যক্ত করলেন, চিরঞ্জীববাবুর এই ব্যাপারের মধ্যে ভাল দিক। কী থাকতে পারে?
