কিন্তু ততক্ষণে বিপরীত ফুটপাথে একটি প্রলয়ংকর কাণ্ড শুরু হইয়াছে। প্রথমে কিছু বোঝা গেল, একটি তাঁতের শাড়ির দোকানের সামনে হুলুস্থুল কাণ্ড। মনুষ্যমাত্রেই গোলমাল পাকাইতে এবং জমাইতে ভালবাসে। আমিও স্বাভাবিক অনুসন্ধিৎসায় অগ্রসর হইলাম। বহু পরিশ্রমে নিকটস্থ হইয়া দেখিলাম, দুইটি অসম আকৃতির ব্যক্তি প্রবলভাবে নড়িতেছে। একজন অতি শীর্ণ, বেঁটে, অপরজন গাট্টাগোট্টা, লম্বা-চওড়া ধরনের প্রথম ব্যক্তির তেজ এবং দ্বিতীয় ব্যক্তির বিক্রম বেশি বলিয়া মনে হইল। দ্বিতীয় ব্যক্তি প্রথম জনকে দুই পায়ের ফাঁকে ফেলিয়া পিষিয়া ধরিয়াছে এবং শীর্ণ ব্যক্তিটি এই অবস্থায় তড়িৎ গতিতে হস্ত, পদ এবং মুখ চালনা করিতেছে।
বেশিক্ষণ এই দৃশ্য দেখিতে হইল না। শীর্ণ ব্যক্তি ক্রমশ নিস্তেজ হইয়া আসিল; এই সময় একজন বলশালী দর্শক স্বতঃপ্রণোদিত হইয়া আগাইয়া গিয়া প্রথমোক্ত গাট্টাগোট্টা ব্যক্তিটিকে ধরিয়া এক ঝাপটা দিল এবং সঙ্গে সঙ্গে ২নং ব্যক্তি পায়ের ফাঁক দিয়া গলিয়া রাস্তার উপর দুম করিয়া পড়িয়া গেল। কিন্তু পদচ্যুত হইবামাত্র ২নং ব্যক্তির তেজ যেন আবার বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইল। সে এক লাফে উঠিয়া দাঁড়াইয়া ১নং ব্যক্তিকে পুনরায় দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করিতে লাগিল এবং সঙ্গে সঙ্গে ভীষণ আস্ফালন করিতে লাগিল। আমি এই ২নং ব্যক্তিটির নিকটেই দাঁড়াইয়া ছিলাম এবং অন্যান্য দর্শকের মতোই বুঝিতে পারিয়াছিলাম যে, ২নং ব্যক্তিটি বেশি লাফালাফি করিলে আবার প্রচণ্ড মার খাইবে। আমি কর্তব্যবোধবশত তাহাকেই দুই বাহুপাশে আবদ্ধ করিলাম। আমি যদিও খুব সবল নহি কিন্তু ২নং ব্যক্তি এতই দুর্বল যে, যেকোনও বালকও তাহাকে আটকাইতে সক্ষম।
১নং ব্যক্তিটি বলশালী ব্যক্তির বাহুপাশে আবদ্ধ হইয়া এতক্ষণ ফুসিয়া চলিয়াছে। আমি যে ব্যক্তিটিকে ধরিয়াছি সে দুর্দান্ত চিৎকার শুরু করিল। আমাকে এই মুহূর্তে ছাড়িয়া দিন, আমি উহাকে, ওই কৃষ্ণ কুকুরশাবকটিকে শেষ না করিয়া ছাড়িব না, ছাড়িয়া দিন বলিতেছি…
শীর্ণ ব্যক্তির গর্জনে আমার কর্ণপটাহ বিদীর্ণ হইবার উপক্রম হইল। এই সময় লক্ষ করিলাম যে নিশ্বাস লইবার অবসরে লোকটি চাপাস্বরে আমাকে কী যেন বলিতেছে, সে আরেকবার চিৎকার করিয়া তারপরে আমার পেটে কনুইয়ের খোঁচা দিয়া আবার ফিসফিস করিল। এইবার শুনিতে পাইলাম, অনুগ্রহ করিয়া ছাড়িয়া দিবেন না স্যার। ছাড়িয়া দিলে ওই ষণ্ড আমাকে মারিয়া ফেলিবে।
এইটুকু অনুরোধ জ্ঞাপন করিয়াই, শীর্ণ ব্যক্তি আবার প্রচণ্ড গর্জন করিতে লাগিল।
এই রকম মিনিট পাঁচেক চলিল, মধ্যে মধ্যে ভীষণ চিৎকার আস্ফালন এবং নিশ্বাস লইবার ছলে ক্ষীণ কণ্ঠে ছাড়িয়া না দিবার জন্য করুণ আকূতি। এই শীর্ণ অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিটির এইরূপ তেজ ও আত্মসম্মানবোধ দেখিয়া বিস্মিত হইলাম। রাজপথে অনুরূপ অবস্থায় সকলেই হয়তো এইরূপ করিয়া থাকে, কী জানি আমার পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। চতুর্দিকে জনতা, বিশেষত পথিক-ললনাদের দৃষ্টির সম্মুখে কে আর কাপুরুষতা প্রদর্শন করিতে চায়!
ইতিমধ্যে ১নং ব্যক্তিটি যে কী কৌশলে বলশালী রক্ষকের বন্ধন ছিন্ন করিয়া মুহূর্তের মধ্যে এক ঝাপটায় আমার বাহুপাশ হইতে এই ২নং ব্যক্তিটিকে ছিনাইয়া লইয়া গেল সে রহস্য ঈশ্বর জানেন তবে আমি রাস্তায় গড়াইয়া পড়িলাম।
কে একজন আমাকে টানিয়া তুলিলেন, দেখিলাম ১নং ব্যক্তিকে যিনি ধরিয়াছিলেন তিনিই আমাকে তুলিয়াছেন। তুলিয়াই প্রশ্ন করিলেন, মহাশয়ের বুঝি পথ-কলহ নিবারণের অভ্যাস নাই?
নিজের অজ্ঞতা স্বীকার করিলাম।
তিনি বলিলেন, ইহারা মারামারি করিবে সে তো ভাল কথা, তাহাতে আমাদের কী, আমরা শুধু দেখিব যাহারা মারামারি দেখিতে ভিড় করিয়াছে তাহারা যেন নিরাশ না হয়। সুতরাং আমাদের কী করিতে হইবে?
এমতাবস্থায় কী করিতে হয় জানা না থাকায় চুপ করিয়া রহিলাম।
তিনি বলিতে লাগিলেন, লক্ষ রাখিতে হইবে মারামারি বন্ধ না হইয়া যায়। যখন মারামারি চলিতে থাকিবে ধরিতে যাইবেন না, তাহাতে নিজেরও আহত হইবার সম্ভাবনা থাকে। যেইমাত্র থামিয়া আসিবে তখন দুইজনকেই ধরিতে হইবে, কিছুক্ষণ এইভাবে ছাড়াইয়া তাহাদের মুখোমুখি দাঁড় করাইয়া রাখুন, আবার আস্ফালন, গালিগালাজ হইতে হইতে যেই প্রবল উত্তেজিত হইল ছাড়িয়া দিন, আবার এক রাউন্ড, আবার আটকান, আবার সামনাসামনি দাঁড় করাইয়া রাখুন, আবার লাগ-লাগ-লাগ আরেক রাউন্ড। টাইমিং ঠিক করিতে পারিলে উপযুক্ত আম্পায়ার ঘণ্টার পর ঘণ্টা দর্শক-সাধারণকে নির্দোষ আনন্দ দান করিতে পারেন।
তাহার কথা শুনিয়া হতবুদ্ধি হইয়া গেলাম। তিনি হঠাৎ গাড়ি, গাড়ি অ্যাম্বুলেন্স গাড়ি করিয়া চিৎকার করিয়া উঠিলেন এবং আমি কিছু বুঝিবার পূর্বেই তিনি এক ধাক্কায় আমাকে ফেলিয়া দিলেন, আমি অ্যাম্বুলেন্স চাপা পড়িলাম।
যখন জ্ঞান হইল বুঝিলাম স্ট্রেচারে শুইয়া আছি, সম্ভবত অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যেই। চারদিক অন্ধকার, হাঁটুর নীচে প্রচণ্ড যন্ত্রণা। ইহারই মধ্যে কে যেন নীচের স্ট্রেচার হইতে আমাকে অল্প অল্প খোঁচাইতে শুরু করিয়াছে। আমি উঃ, উঃকরিতে লাগিলাম। নীচ হইতে কে বলিল, স্যার, আমিও আছি।
