জানি না, ভজগোবিন্দ সত্যই কলেরায় মরেছেন কিনা, সেটা তো বলাই দাসের অপপ্রচার নাও হতে পারে, হয়তো সত্যিই তাই–কিছু আশ্চর্য নয়।
কিন্তু তাতে আমার কী? জীবনে এই প্রথমবার মরাল কারেজ, সৎসাহসের অভাব হল না আমার। কোনও ইতিহাসের কোনও অধ্যায়েই এই অভূতপূর্ব আত্মবিসর্জনের কাহিনির কোনও স্থান নেই, কোনও তুলনাও নেই–একথা জেনেও আমি নবলালকে কথা দিলাম। সেই কথা এখনও রেখেছি। আর সৎসাহস থাকলে যে কোনও কাজেই কোনও ক্ষতি হয় না তার প্রমাণ আমি এখনও জীবিত। ভজগোবিন্দ ভোজনালয়ের কোনও আসনই কোনও মুহূর্তে ফঁকা যাচ্ছে না। হাজরার মোড়ে নতুন সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে, তাতে কবজিতে ঘড়ি-আঁকা একটি হাতের তর্জনী নির্দেশ রয়েছে, আসুন, পাইস হোটেল ভিতরে।
ভজহরি চাকলাদার
কী করিয়া কী হইল এখন গুছাইয়া লেখা সম্ভব নহে। তবে যাঁহারা আমাকে মহালয়ার দিন বিকালে গড়িয়াহাট মোড় হইতে ডবলডেকারে উঠাইয়া দিয়া নিশ্চিত ধরিয়া আছেন যে, আমি এখন রাঁচিতে মাতুলালয়ে মনোরম পরিবেশে শারদীয় অবকাশ অতিবাহিত করিতেছি তাহাদের অবগতির জন্যে জানাই রাঁচি পৌঁছাইতে পারি নাই, এমনকী কলকাতা ত্যাগ করিতেও পারি নাই। নারিকেলের দড়িতে বাঁধা বিছানা এবং পদ্মফুল-আঁকা উৎপলের বাড়ির চাকরের সুটকেস হারাইয়া এই শহরেরই একটি হাসপাতালে ইমারজেন্সি ওয়ার্ডে শুইয়া শুইয়া যাহারা ক্রাচ ব্যবহার করে তাহাদের পদধূলি কেহ পায় না, না এইরূপ বিষয়াদি ভাবিয়া সান্ত্বনা খুঁজিতেছি।
শ্যামল এবং ভাস্কর আমাকে যখন বাসে উঠাইয়া দিল তখন বিকাল পাঁচটা সতেরো, সাড়ে সাতটায় ট্রেন। সময় যথেষ্টই ছিল, কিন্তু রাস্তায় ভয়ংকর ভিড় এবং তদুপরি আমার ডবলডেকারটির ড্রাইভার বোধহয় পূর্বে ট্রামের ড্রাইভারি করিতেন, তাই তাহার ধারণা হইয়াছিল একই লাইনে ট্রামকে ওভারটেক করা সম্ভব নহে। তিনি একটি মন্দগতি ট্রামের পশ্চাদানুসরণ করিতেছিলেন। অবশ্য হলফ করিয়া বলিতে পারিব না যে, সেই ট্রামের জানলায় ঠিক আর কোনও আকর্ষণ ছিল না। শিয়ালদহের মোড়ে পৌনে সাতটা বাজিতে আমি সিট ছাড়িয়া উঠিয়া গিয়া ড্রাইভারের তারের জালের ভিতর দিয়া নাক গলাইয়া কহিলাম, দাদা, একটু দ্রুত করা কী সম্ভব? একটা গোরুকে পেট্রল খাওয়াইলে ইহা অপেক্ষা দ্রুত যাইত। দাদা একটু হাসিলেন, তাহার পর খাকি শার্টের আস্তিনে হাসিটুকু মুছিয়া নির্লিপ্তভাবে বলিলেন, কিন্তু আমি তো পেট্রল খাই নাই।
শুনিয়া নিশ্চিন্ত হইলাম; কিন্তু তখন আর সময় ছিল না। কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় মিনিট পনেরো-কুড়ি অতিবাহিত হইল, তখন বাস বড়বাজার পর্যন্ত আসে নাই। হাতে আর সময় নাই, টিয়া গেলে তবু ট্রেন ধরা যাইতে পারে কিন্তু এই বাসে অসম্ভব। অবশ্য বাস হইতে অবতরণ সে আরও অসম্ভব; কেন যে ট্রান্সপোর্ট-কর্তৃপক্ষ বাসগুলির প্রত্যেক জানলায় ফায়ার ব্রিগেডের দড়ির সিঁড়ির বন্দোবস্ত করেন না।
আমি বিছানা এবং সুটকেস লইয়া বাহির হইবার চেষ্টা করিলাম। করুণ কণ্ঠে একটু পথ একটু পথ প্রার্থনা করিলাম। সর্বত্রই রসিক যাত্রী থাকেন, তাহাদেরই কেহ ভিড়ের মধ্য হইতে প্রশ্ন করিলেন, এই ভিড়ে পথ আবার কী? আপনাকে গার্ড অফ অনার দিতে হইবে নাকি? সম্মুখে পাটরাদি হাতে আমারই মতো আরেকজন নামিবার চেষ্টায় ছিলেন। আমি যথাসাধ্য তাহার পদাঙ্ক। অনুসরণ করিতে লাগিলাম।
এই সময় একটি দুর্ঘটনা ঘটিল। পিছন হইতে ভীষণ চাপ পড়ায় আমি ক্রমশ সম্মুখে হেলিয়া পড়িতেছিলাম। লেডিস সিটের প্রান্তবর্তী হইবামাত্র একটি জোর ধাক্কায় হুমড়ি খাইয়া পড়িয়া গেলাম। লোকের শরীরে যাহাতে তা বা ধাক্কা না লাগে, সেই জন্য সুটকেস এবং বিছানা এতক্ষণ দুই হাতে মাথার উপর তুলিয়া আসিতেছিলাম, এইবার ওই দুইটি ছিটকাইয়া গেল। সম্মুখবর্তিনী দণ্ডায়মানা একটি যুবতীর পৃষ্ঠদেশ বিছানার সহিত আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা কর্কশ নারিকেল দড়ি লাঞ্ছিত হইয়া রক্ত ক্ষরিত হইতে লাগিল। তাঁহার পৃষ্ঠদেশ অতখানি উন্মুক্ত না থাকিলে যে পরিধেয় বস্ত্রের উপর দিয়াই ঘটনাটি ঘটিয়া যাইত, তাঁহার দেহে আঁচড়মাত্র পড়িত না, ইহা তাহাকে বুঝাইবার চেষ্টা বৃথা। কিন্তু সেই স্বল্পবাসিনী যদি স্বল্পভাষিণীও হইতেন, তবে আমার চতুর্দশপুরুষ সেইদিন কিঞ্চিৎ অন্যায় অভিযোগ হইতে অব্যাহতি পাইতেন, এইটুকু বলিতে পারি। সুটকেসটি কী হইয়াছিল বলিতে পারি না। যদি ধ্বনি দ্বারা অনুমান সঠিক হয় তবে উহা কোনও হ্রস্ব ব্যক্তির শিরোপরি অধঃপতিত হইয়াছিল। সেই ব্যক্তিটি কিন্তু টু শব্দটি করেন নাই; হয় বাকরোধ হইয়া গিয়াছিল কিংবা জন্ম হইতেই বোবা। অবশ্য এমনও হইতে পারে উক্ত যুবতীর রোমহর্ষক বাক্যাদি শ্রবণ করিয়া তিনি আর প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করিতে সাহসী হয়েন নাই।
ইতিমধ্যে কী এক অজ্ঞাত কারণে (আমার উৎক্ষিপ্ত মালপত্রাদি অবশ্য ইহার কারণ হইতে পারে) সমস্ত বাসের মধ্যে দারুণ গৃহবিপ্লব দেখা দিল। যাঁহারা ফুটবোর্ডে দাঁড়াইয়া ছিলেন তাঁহারা বাসের ভিতর দিকে চাপ দিতে লাগলেন এবং ভিতরে যাঁহারা ছিলেন তাঁহারা প্রত্যুত্তরে অধিকতর চাপ দিতে লাগিলেন। যাঁহারা কলিকাতার বাসে যাতায়াতে অভ্যস্ত তাঁহাদের অবশ্য এই ধরনের আন্দোলন সম্পর্কে কিছু ধারণা রহিয়াছে। এইরূপ নিঃশব্দ বিপ্লব পৃথিবীতে সচরাচর দেখা যায়। পরস্পর পরস্পরকে কনুইয়ের ধাক্কা দিতেছে এবং সহ্য করিতেছে। কিন্তু কাহারও মুখে কোনও শব্দ নাই। অবশেষে একটি প্রচণ্ড তরঙ্গাঘাতে চলন্ত বাস হইতে আরও জন পনেরো লোকের সহিত আমারও পতন হইল। ভাগ্য ভাল, বাসটি দ্রুত সঞ্চরমান ছিল না, ফলে পরস্পর পরস্পরের উপর হুমড়ি খাইয়া পড়িলে যতটুকু আঘাত লাগে তাহার অপেক্ষা কেহই বেশি আহত হইল না। উপরন্তু এই আকস্মিক ভাগ্য-বিপর্যয়ের ফলে বাস হইতে নামিবার সুবিধা হওয়ায় সকলেই অল্প-বিস্তর স্বস্তির নিশ্বাস ফেলিলেন, অন্তত তাহাই মনে হইল।
