আমি, আমি কে? আমি প্রশ্ন করিলাম, যদিও অনুরূপ বাক্যালাপোচিত শরীরের অবস্থা তখন নয়।
আমি ভজহরি চাকলাদার। এই নামে কোনও ব্যক্তির সঙ্গে পূর্ব পরিচয় আছে বলিয়া মনে করিতে পারিলাম না।
স্যার, সেই রাস্তায়!
এইবার কণ্ঠস্বর যেন কিঞ্চিৎ পরিচিত মনে হইল। পথিমধ্যে আর দুইজনে কোনও কথা হইল না। হাসপাতালে পৌঁছিয়া ভজহরি চাকলাদারকে দেখিলাম, সেই কলহপরায়ণ, শীর্ণ ২নং ব্যক্তি।
হাসপাতালে পাশাপাশি বেডে শুইয়া চাকলাদার মহাশয়ের সহিত আলাপ হইল। তিনি অমিতভাষী ব্যক্তি। তাঁহার সম্পূর্ণ বৃত্তান্ত যেমন বিচিত্র তেমনই জটিল।
জানা গেল তাহারা পূর্বে চাকলাদার ছিলেন না। পুরাপুরি মনসাদার ছিলেন, শতাব্দী দেড়েক পূর্বে গ্রাম-প্রতিনিধিদের কী এক চক্রান্তে তাহারা তাহাদের উত্তরাধিকারগত উপাধি হইতে বিচ্যুত হন। কিন্তু তাহা হইলে কী হইবে, এখনও ধমনীতে প্রবলপরাক্রান্ত মনসাদার বংশের রক্ত প্রবাহিত হইতেছে। তাহাদের এক পূর্বপুরুষ, কী নাম, বোধহয় বজ্রগর্জন মনসাদার দুইটি হাতির লেজে এমন গিট বাঁধিয়া দেন যে গিট কাটিয়া অপারেশন করিয়া (ষাট বৎসর পরে) তাঁহাদের জেলার প্রথম ভেটার্নারি সার্জেন সাহেব হস্তি দুইটিকে আলাদা করিয়া দেন। সেই গিট-বাঁধা লেজ দুইটি এতকাল তাঁহাদের ঘরে গৌরবের সঙ্গে বিরাজ করিত, কিন্তু কিছুদিন পূর্বে যেদিন রাত্রিতে গ্রামের মনসাঠাকুরটি বারোয়ারিতলা হইতে চুরি যায় সেই রাত্র হইতে গিটবদ্ধ লেজ দুইটি পাওয়া যাইতেছে। বিলাতে নাকি এইসব জিনিস আজকাল বহুমূল্যে বিক্রয় হয়, অবশ্য এই প্রসঙ্গে তাহার জ্ঞাতিভ্রাতা হাবুল চাকলাদারকেই যে তাঁহার সন্দেহ তাহাও জানাইলেন।
কলিকাতা হইতে বত্রিশ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে হুগলি জেলার কলাগ্রামে তাহাদের বাসস্থান। কলাগ্রাম যে আসলে চাকলাগ্রামেরই অপভ্রংশ তিনি তাহাও জ্ঞাতার্থে নিবেদন করিলেন।
অতদূর হইতে আসিয়া কী করিয়া কলিকাতায় বড়বাজারে মারামারিতে প্রবৃত্ত হইলেন, তাহাও বলিলেন। বহু ধরাধরি করিয়া এতদিনে জমিদারির কিঞ্চিৎ ক্ষতিপূরণ আদায় করিয়াছেন। স্ত্রীর বহুদিনের শখ একটি তাঁতের ভাল শাড়ি। সেই শখ পূরণ করিতে আসিয়াই বিপত্তি। গ্রামস্থ এক বিষয়ী ব্যক্তি পরামর্শ দিয়াছিলেন, বড়বাজারে গিয়া দেবেন্দ্রমঙ্গল বসাক অ্যান্ড কোং-তে ক্রয় করিতে। বহু খুঁজিয়া, সারাদিন ভিড়ে ঘুরিয়া ক্লান্ত ঘর্মাক্ত অবস্থায় দেবেন্দ্রমঙ্গলের দোকান আবিষ্কার করিলেন। যখন ভিতরে ঢুকিতে যাইবেন দেখিলেন সামনে সাইনবোর্ডে দোকানের নামের নীচে লেখা এই বাড়ির দোতলায় আমাদের কোনও ব্রাঞ্চ বা শাখা নাই।
ভজহরি চাকলাদার মহাশয়ের খটকা লাগিল। তিনি দোতলাতেই আগে যাইবেন স্থির করিলেন। তিনি উপরে তাকাইয়া দেখিলেন দোতলাতেও একই রকম সাইনবোর্ড, তবে তাহাতে লেখা, এই বাড়ির একতলায় আমাদের কোনও ব্রাঞ্চ বা শাখা নাই। কিছু স্থির করিবার পূর্বেই দুইদিক হইতে দুইটি লোক আসিয়া তাহার দুই হাতে দুইটি হ্যান্ডবিল খুঁজিয়া দিল। দুইটিরই ভাষা মারাত্মক, সারাংশ এইরকম:
ভদ্রমহোদয়গণ, সাবধান! দালালদের দ্বারা প্রতারিত হইবেন না। এই বাড়ির একতলায় (ভিন্ন হ্যান্ডবিলে দোতলায়) যাহারা তাঁতের শাড়ি বিক্রয় করিতেছে তাহা বৈধ নহে। পূজায় আনন্দের জন্য শাড়ি কিনিয়া জেল খাঁটিবেন না।
ততক্ষণে হ্যান্ডবিলদাতাদ্বয় হাতাহাতি শুরু করিয়া দিয়াছে। একতলা এবং দোতলা হইতে ক্রমাগত লোক নামিয়া আসিয়া যে যাহার পক্ষে সম্ভব যোগ দিয়াছে। ভজহরিবাবুকে লইয়া টানাটানি পড়িয়া গিল। এই পক্ষ টানিয়া তিন-সিঁড়ি উপরে লইয়া যায় আর সঙ্গে সঙ্গে অপর পক্ষের আর এক তাঁচকায় রাস্তায় ছিটকাইয়া পড়েন। জামার আস্তিন এবং কলার ছিঁড়িয়া গেল। জুতা হারাইয়া ফেলিলেন, টানাটানিতে হাত কিঞ্চিৎ লম্বা হইয়াছে বলিয়া তিনি মনে করেন।
তার পর কী হইল? আমি প্রশ্ন করিলাম।
প্রশ্নের উত্তরে ভজহরিবাবু ম্লান হাসিলেন, কী হইল, আমিও জানি না। একটু পরে দেখিলাম দেবেন্দ্রমঙ্গলের দোকানের সামনে আমি একটি অপরিচিত ব্যক্তির দুই পায়ের ফাঁকে আটকাইয়া আছি। তাহার পরের ঘটনা সবই আপনি জানেন।
আমিও ম্লান হাসিলাম।
আপাদমস্তক ব্যান্ডেজবাঁধা ভজহরিবাবু এবং আজানুমস্তক (পাঠক ভুল ধরিবেন না, এখন আমি পদচ্যুত) ব্যান্ডেজ-বাঁধা আমি দুইজনে এখন কড়িকাঠ শুনিতেছি।
ইনস্টলমেন্টে কোথায় ক্রাচ পাওয়া যায় কেহ কি খবর দিতে পারেন?
ভাগলপুরের পাঞ্জাবি
রেলগাড়ির কামরার জানলা দিয়ে অনেক দামদর করে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মের হকারের কাছ থেকে একটা চাদর কিনেছিলাম। মধ্য রাত, বোধহয় ভাগলপুর স্টেশন ছিল সেটা, বেশ কয়েক বছর আগেকার কথা।
ফিকে হলুদ রঙের। বেশ শক্ত বুনোট, লম্বায় চওড়ায় বেশ প্রমাণ সাইজের চাদর সেটা। বেশ একটা মুগা মুগা ভাব আছে, লোকাল জিনিস, দামও তেমন বেশি ছিল না।
অল্প শীতে বাড়ির মধ্যে বা পাড়ার মধ্যে গায়ে দেওয়ার জন্যে চমৎকার চাদর। এবং তাই ভেবেই কিনেছিলাম।
কিন্তু কলকাতায় এসে যে কী দুর্মতি হল অবশ্য কারণও একটা ছিল, তখন সবে মোটা হতে শুরু করেছি, পুরনো জামা-প্যান্ট, পাঞ্জাবিগুলো কেমন টাইট হচ্ছে, ফিট করছে না, সেই ভাগলপুরি চাদরটা দরজির দোকানে নিয়ে সেটা কেটে একটা পাঞ্জাবি বানাতে বললাম।
