চিন্তাশীল স্বামীকে একটু খুঁচিয়ে দেওয়ার জন্যে ভাস্বতী বলল, শুধু ব্লটিং পেপারের কথা ভাবছ। কেন? এখন কি আর বাজারে কালির বড়ি পাওয়া যায়। স্টিলের নিব, কলমের হ্যাঁন্ডেল? লোকের প্রয়োজনই পড়ে না। দোকানদাররাও আর বেচে না।
সেদিন রাতে কেমন আবছা আবছা ঘুম হল প্রমথেশের। স্মৃতি আর তন্দ্রা জড়ানো।
কোথায় গেল সেইসব দিন কালি, কলম আর ব্লটিং পেপারের। এই তো সেদিনের কথা, তার বালক বয়েসের কথা, খুব বেশি কাল তো হয়নি। প্রমথেশ সারারাত ধরে স্বপ্ন দেখল, সে দোয়াতে কালিতে চুবিয়ে রাবড়ি তৈরির গোপন প্রণালী নামে একটা রচনা লিখছে, ডান হাত দিয়ে নিব লাগানো কাঠের হ্যাঁন্ডেলের কলমে। আর বাঁ হাতে ধবধবে সাদা চোষকাগজে লেখার গায়ের অতিরিক্ত কালি চুষে নিচ্ছে।
স্বপ্নটা শেষ পর্যন্ত একটা গোলমেলে জায়গায় এসে পৌঁছে গেল, প্রমথেশ দেখল সে রাবড়ি ভরতি বড় গামলায় কলম চুবিয়ে তাই দিয়ে লিখছে। কিন্তু সাদা কাগজে সাদা রাবড়ির দাগ পড়ছে না।
এই সময় তার ঘুম ভেঙে গেল। সে ঘুম থেকে উঠে মনে মনে স্থির করল ব্লটিং পেপার এবং তৎসহ রাবড়ির ব্যাপারটার একটা হেস্তনেস্ত করতে হবে।
সেদিন থেকে পূর্ণোদ্যমে প্রমথেশ লেগে গেল ব্লটিং পেপারের অনুসন্ধানে, পাড়াগাঁয়ে যাকে গোরুখখাঁজা বলে একেবারে তাই আর কি। কিন্তু গোরু খোঁজার একটা দিগ্বিদিক আছে; আশপাশের দু-দশটা মাঠ, খেত, গৃহস্থপাড়া, বাঁশঝোঁপ, বড় জোর পঞ্চায়েতের খোঁয়াড় পর্যন্ত, কিন্তু অবলুপ্ত ব্লটিং পেপারের অনুসন্ধানের কোনও নির্দিষ্ট পন্থা থাকা সম্ভব নয়।
তবু প্রমথেশ চেষ্টার ত্রুটি করল না। সে প্রথমে ভেবে নিল, আগে কোথায় কোথায় ব্লটিং পেপার পাওয়া যেত। মুদিখানা, স্টেশনারি আর অফিসের কাগজপত্র, সাজ সরঞ্জামের দোকান।
বেছে বেছে পুরনো আর বড় দোকানগুলোয় খোঁজ করতে লাগল প্রমথেশ। যেদিন মানুষেরা শেষবারের মতো ব্লটিং পেপার কেনা বন্ধ করে দিল, সেদিন নিশ্চয় কোনও কোনও দোকানে কিছু স্টক অবশিষ্ট ছিল। সেই স্টকের অবশিষ্টাংশ, সে দুটো-চারটে-দশটা যাই হোক সেগুলো দোকানে নিশ্চয় আজও পড়ে আছে, দোকানদার কোনও জিনিস ফেলে দেওয়ার লোক নয়।
অবশ্য প্রমথেশ আবার এটাও বিবেচনা করল যে, মিষ্টান্ন বিক্রেতারা সেগুলো সে সময়ে কিনে নিয়ে যেতে পারে এবং ওই অবশিষ্ট ব্লটিং পেপারগুলো দিয়েই সংসারের শেষ রাবড়িটুকু প্রস্তুত হয়েছিল।
সে যা হোক, প্রমথেশ হন্যে হয়ে খোঁজ চালিয়ে যেতে লাগল। খিদিরপুর বাজার থেকে শ্যামবাজার পর্যন্ত, কত বিচিত্র সব দোকান সোলেমান ব্রাদার্স, মোক্ষদা ভাণ্ডার, ইম্পিরিয়াল স্টোর্স। বউবাজার, চৌরঙ্গি অঞ্চলে ভিক্টর অ্যান্ড কোম্পানি, জয়হিন্দ বিপণি।
নাম দেখে অনেক সময় বয়স বোঝা যায়, মানুষের যেমন দোকানেরও তাই। ভিক্টর মানে পঁয়তাল্লিশ সালে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে মিত্রশক্তির জয়ের পরে কোনও ইংরেজ ভক্তের দেওয়া নাম, ইম্পিরিয়াল–তারও দশ-বিশ কিংবা বেশি বছর আগেকার। জয়হিন্দ স্বাধীন ইত্যাদির জন্মসাল অনুমান করা কঠিন নয়। তবে এরই মধ্যে আদি ও অকৃত্রিম মোক্ষদা ভাণ্ডার বা গন্ধেশ্বরী স্টোর্স এমনকী সোলেমান ব্রাদার্সের বয়স ধরা কঠিন।
বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা হল প্রমথেশের। কেউ কেউ সংক্ষিপ্তভাবে নেই বলে বিদায় দিল। কেউ কেউ দোকানের আলমারি, কাগজের র্যাক খুঁজে বলল, ফুরিয়ে গেছে। কতদিন আগে ফুরিয়ে গেছে, আর কখনও পাওয়া যাবে কিনা সে বিষয়ে কোনও সদুত্তর দিতে পারল না। পারবেই বা কী করে?
গড়িয়াহাট বাজারের বড় মুদিখানা দোকানের এককড়িবাবু, পূর্ববঙ্গ থেকে আগত উদ্বাস্তু ব্যবসায়ী ব্লটিং পেপার শুনে কেমন ঝিম মেরে গেলেন। অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন, তারপর প্রায়। স্বগতোক্তির মতো বলতে লাগলেন, ব্লটিং, ব্লটিং পেপার। কতদিন পরে মনে করিয়ে দিলেন দাদা। সেই ক্ষীরের পুর ভরতি বড় বড় লাল পানতুয়া, কাতলামারি বিলের চিতল মাছ, খেরসাপাতি আম, পকেট ঘড়ি, ইস্টিমার… ভদ্রলোক চোখ বুজে বলে যাচ্ছিলেন। বিনা বাক্য ব্যয়ে নিঃশব্দে কেটে পড়ল প্রমথেশ।
অন্য একটা দোকান থেকে অবশ্য এত সহজে পার পেল না। সে দোকানের নীতিই হল খদ্দেরকে কখনও ফিরিয়ে না দেওয়া, নেই না বলা। শতাব্দী প্রাচীন জয় জয় মাতা গন্ধেশ্বরী ভাণ্ডার, শতাব্দীর থেকে এক দশক কম বয়সি দোকানের মালিক এখনও দোকানে দুবেলা ঘণ্টাখানেক করে বসেন। তিনি ব্লটিং পেপার শুনে বললেন, কয় শিট লাগবে। এতটা প্রমথেশ আশা করেনি। সে বলল, দুশিট হলেই হবে। দোকানি তখন একজন কর্মচারিকে ডেকে দুশিট ব্লটিং পেপার আনতে বললেন। কিন্তু ব্লটিং পেপার কোথায়? বৃদ্ধের বিশ্বাস কয়েকদিন আগেও ছিল। কিন্তু সেই কয়েকদিন তিরিশ বছর আগে চলে গেছে। অনেক খোঁজাখুঁজি হল, কিন্তু পাওয়া গেল না। দোকানের সামনে প্রমথেশকে আশায় আশায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল ঘণ্টাখানেক।
অন্য একটা সাত্ত্বিক দোকানে ব্লটিং পেপার চাইতে তারা ভাবল টয়লেট পেপার। দাঁত খিঁচিয়ে তারা বলল, ও সব নোংরা জিনিস আমরা বেচি না মশায়।
কষ্ট করলে কেষ্ট অবশ্যই মেলে। একদিন প্রমথেশের ভাগ্যেও ব্লটিং পেপার মিলে গেল। এবং সে কোনও দোকানে বা বাজারে নয়, তার নিজেরই অফিসে একটা পুরনো আলমারির মধ্যে।
