অফিসের পুরনো দলিলপত্র এই সাবেক কালের অতিকায় আলমারিটার মধ্যে থাকে। একটা তিরিশ বছর মেয়াদি লিজের আয়ু শেষ হয়ে এসেছে, সেই লিজ-ডিডটা আলমারির মধ্যে খুঁজছিল প্রমথেশ। ঠিক ওপরের তাকে দলিলটা সহজেই পেয়ে গেল প্রমথেশ, কিন্তু তার চেয়েও বেশি পাওনা হল যখন সে আবিষ্কার করল, দলিলের তূপের নীচে রয়েছে একগাদা ভঁজ করা ব্লটিং পেপার। বার করে গুনে দেখল প্রমথেশ, সবসুদ্ধ আটটা রয়েছে। বহুকাল আগে তুলে রাখা হয়েছে, তারপর আর ব্যবহারের প্রয়োজন পড়েনি। অফিসে সেই কবে কালি কলমের যুগ শেষ হয়ে গেছে।
তা এতগুলো ব্লটিং পেপারের এখন মোটেই প্রয়োজন নেই প্রমথেশের। একটা হলেই তার পক্ষে যথেষ্ট।
আলমারি থেকে লিজের দলিলটার সঙ্গে একটা ব্লটিং পেপারই বার করল প্রমথেশ। টেবিলে নিয়ে এসে সেটা একটু শুকল প্রমথেশ। তার মনে আছে, ব্লটিং পেপার ঠিক ঘ্রাণহীন ছিল না, কেমন একটা হালকা বোঁদা গন্ধ ছিল। সে গন্ধটা অবশ্য আজ সে পেল না। কেমন একটা পুরনো পুরনো গন্ধ, তা অন্তত পঁচিশ-ত্রিশ বছরের পুরনো তো বটেই। প্রমথেশের মনে পড়ে না সে এই অফিসে ঢোকার পরে ব্লটিং পেপারের ব্যবহার দেখেছে।
একটা আস্ত ব্লটিং পেপার অফিস থেকে নিয়ে যাওয়া চুরির পর্যায়ে পড়ে। ব্লটিং পেপারটা বেশ কুচিকুচি করে ছিঁড়ে সে একটা প্লাস্টিকের ঠোঙায় পুরে বাড়ি নিয়ে এল।
ভাস্বতী প্রমথেশের হাতে ঠোঙা দেখে ভেবেছে অফিস থেকে আসার পথে মোড়ের দোকান থেকে প্রমথেশ বোধহয় গরম সিঙাড়া কিনে এনেছে। কখনও কখনও সে এরকম আনে। কিন্তু আজ ঠোঙাটা হালকা দেখে সেটা খুলে কাগজের টুকরোগুলো দেখে অবাক হয়ে গেল ভাস্বতী। তারপর জিজ্ঞাসা করল, এগুলো কী?
প্রমথেশ বলল, ব্লটিং পেপারের টুকরো। বহু ভাগ্যে পেয়েছি।
ভাস্বতী অবাক হল, এগুলো কী কাজে লাগবে? এর জবাবে প্রমথেশ যখন বলল, এগুলো দিয়ে রাবড়ি তৈরি হবে, ভাস্বতী রীতিমতো ঘাবড়িয়ে গেল। সে ঠোঙার মধ্যে ব্লটিং পেপারের ঘেঁড়া টুকরোগুলো অভিনিবেশ সহকারে পর্যবেক্ষণ করতে করতে বলল, রাবড়ি? ব্লটিং পেপার দিয়ে রাবড়ি?
সেদিন সন্ধ্যায় চা খেতে খেতে প্রমথেশ ভাস্বতাঁকে রাবড়ির অন্তর্ধান রহস্য ব্যাখ্যা করল। ভাস্বতী সমস্ত কথা শুনে খুব একটা রোমাঞ্চিত হল এমন কথা বলা যাবে না, তবে বার কয়েক তাই নাকি, তাই নাকি বলল।
পরের রবিবার দিন সকালবেলা প্রমথেশ মাদার ডেয়ারির দোকানে লাইন দিয়ে চার লিটার দুধ কিনে আনল। অতটা দুধ এক সঙ্গে জ্বাল দেওয়া যায় এমন পাত্র এ বাড়িতে নেই। পাশাপাশি দুটো গ্যাসের উনুনে একটা গামলায় এবং একটা ডেকচিতে দুধ ভাগ করে জ্বাল দিতে লাগল প্রমথেশ, সামনে একটা থালায় কুচি করে ভেঁড়া ব্লটিং পেপার, তা ছাড়া কৌটো ভরতি চিনি, ছোট এলাচের গুঁড়ো–এইসব।
ভাস্বতী প্রথমে বিশেষ উৎসাহ দেখায়নি। কিন্তু দুধ টগবগ করে ফুটতে লাগল, সেও প্রমথেশের পাশে এসে দাঁড়াল। দুটি পাত্রে ধীরে ধীরে ব্লটিং পেপারের কুচি, চিনি আর এলাচ গুঁড়ো পরিমাণ মতো মিশিয়ে ঘন করে তৈরি হল পৃথিবীর শেষ রাবড়ি।
প্রমথেশ টেস্ট করতে যাচ্ছিল। কিন্তু তাকে থামিয়ে বলল, তুমি আগে খেয়ো না। গোবিন্দলালবাবুকে ডেকে আনো। উনি আগে খেয়ে দেখুন, গোবিন্দবাবুর কথা মতোই যখন করা হল, আগে উনি চেখে বলুন কেমন হয়েছে।
মিনিট পনেরো পরে গোবিন্দবাবুকে সঙ্গে নিয়ে প্রমথেশ বাসায় এল। তাকে বাইরের ঘরে বসিয়ে বলল, আজ আপনাকে এমন একটা জিনিস খাওয়াব যা আপনি ভাবতে পারেন না।
কৌতূহলী গোবিন্দবাবু জানতে চাইলেন জিনিসটা কী?
প্লেট ভরতি উষ্ণ রাবড়ি নিয়ে বাইরের ঘরে ঢুকতে ঢুকতে ভাস্বতী বলল, পৃথিবীর শেষ রাবড়ি।
গোবিন্দবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, রাবড়ি পেলেন কোথায়?
প্রমথেশ বলল, বাসায় ব্লটিং পেপার দিয়ে বানিয়েছি। গো
বিন্দবাবু আশঙ্কান্বিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ব্লটিং পেপার? ব্লটিং পেপার পেলেন কোথায়?
প্রমথেশ বলল, অফিসের একটা পুরনো আলমারির তাকে পেয়ে গেলাম। পুরনো চাল ভাতে বাড়ে। দেখছেন না পুরনো ব্লটিং পেপার দুধের মধ্যে কেমন ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। নিন, একটু টেস্ট করে দেখুন। আপনি খেয়ে তারিফ করলে তারপর আমরা খাব।
গোবিন্দলালবাবু রাবড়ির দিকে তাকিয়ে প্রমথেশের অনুরোধ শুনে দরদর করে ঘামছিলেন। অবশেষে তার হাত থেকে পৃথিবীর শেষ রাবড়ির প্রথম প্লেটটা মেঝেতে পড়ে গেল।
ভজগোবিন্দ ভোজনালয়
ভজগোবিন্দ ভোজনালয়ের আমি একজন বাঁধা খদ্দের। অবশ্য এতে আমার আপত্তি বা অসম্মানের কিছু নেই। এই ভোজনালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ভজগোবিন্দ জীবিত থাকলে যে কোনও উৎসাহী তার কাছ থেকে এই হোটেলের প্রাক্তন গ্রাহকদের একটি বিস্তৃত তালিকা শুনতে পারতেন। যাঁদের মধ্যে অনেকেই রীতিমতো খ্যাতনামা এখন। একসঙ্গে রাজভবনের কোনও ভোজসভাতেই বোধহয় এতগুলি কৃতবিদ্যা ব্যক্তির দর্শন অসম্ভব। ভজগোবিন্দবাবুর তালিকায় পূর্ণ আস্থা নিয়ে বিশ্লেষণ করলে দেখা যেত অন্তত দুজন পদ্মশ্রী, একডজন এম-এল-এ, এমপি এবং ততোধিক সাহিত্যিক, অধ্যাপক এবং চিত্রতারকা জীবনের কোনও না কোনও সময়ে এখানে বসে কিছু না কিছু গলাধঃকরণ করেছেন। ভজগোবিন্দবাবু মধ্যে মধ্যে আঙুল দিয়ে নির্দেশ করে দেখাতেন, ওই চেয়ারটায় বসতেন ভূতোবাবু–আহা, চিংড়ি মাছ দিয়ে নটেচচ্চড়ি তিনি কী যে ভালবাসতেন!অনুসন্ধান করলেই জানা যেত ভূতোবাবু কোনও কেউকেটা নন, বর্তমানে যাঁর ছবি ঘরে ঘরে পর্দায় পর্দায়, সেই বিখ্যাত চিত্রতারকার পরিত্যক্ত নাম ওটা।
