তবে তালতলার হরেন চক্রবর্তী বললেন, আমাদের পাড়ার কাছেই জানবাজারে রাবড়ি পাওয়া যায়। রানি রাসমণির বাড়ির উলটো দিকে দুটো পুরনো দিনের হিন্দুস্থানি দোকান এখনও পাশাপাশি আছে।
প্রমথেশ ঠিক করল জানবাজারেই আগে যাবে। অফিস থেকে হাঁটা পথে মাইলখানেকের মধ্যে পড়ে।
জানবাজারে গিয়ে হরেন চক্রবর্তীর নির্দেশমতো দোকান দুটো খুঁজে বার করতে বিশেষ কোনও অসুবিধে হল না। কিন্তু এ দুটো তো মোটেই মিষ্টির দোকান নয়, বলা উচিত দুধের দোকান। বড় বড় উনুন গনগন করে জ্বলছে। তার ওপরে বিশাল লোহার কড়াইতে টগবগ করে ফুটছে দুধ। সামনে কাঠের বেঞ্চিতে বসে কাঁচের গেলাসে দুধ খাচ্ছে খদ্দেররা।
প্রমথেশ জিজ্ঞাসা করতে জানতে পারল, হ্যাঁ, রাবড়ি পাওয়া যাবে। তবে অর্ডার দিতে হবে।
স্বাভাবিকভাবেই এবার প্রমথেশ জিজ্ঞাসা করল, কতটা অর্ডার দিতে হবে এবং দাম কীরকম? জানা গেল, অন্তত দশ কেজি অর্ডার না দিলে রাবড়ি বানানো সম্ভব নয়। কেজি প্রতি দাম পড়বে তিনশো টাকা করে।
দশ কেজি রাবড়ি এবং তিনশো ইনটু দশ মানে তিন হাজার টাকা। প্রমথেশের মাথা ঘুরে গেল। সে দোকানের বেঞ্চিতে বসে এক গেলাস গরম দুধ পাঁচ টাকা দিয়ে কিনে ধীরে সুস্থে সাব্যস্ত হয়ে বাড়ি ফিরে এল।
কিন্তু প্রমথেশের মাথা থেকে রাবড়ির চিন্তাটা কিছুতেই গেল না। রাবড়ির মতো অমন স্বর্গীয় সুখাদ্য, সেটা কেন বাজার থেকে উবে গেল।
উত্তরটা কয়েকদিনের মধ্যেই অবশ্য পাওয়া গেল। আত্মীয়স্বজন, পাড়াপ্রতিবেশী, অফিসের সহকর্মী, পুরনো বন্ধু বহু লোকের সঙ্গেই প্রমথেশ এ নিয়ে আলোচনা করেছে।
প্রমথেশের প্রবীণ প্রতিবেশী গোবিন্দলাল ঘোষ একদা মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী ছিলেন। মিষ্টান্ন ব্যবসায়ের অনেক ফাঁকফোকর তার জানা আছে। ভদ্রলোক এখন একটি স্টেশনারি দোকান চালন।
এই গোবিন্দলালবাবু একটি চমকপ্রদ খবর দিলেন। রাবড়ি বাজার থেকে উঠে গেছে তার একমাত্র কারণ হল যে বাজারে এখন আর ব্লটিং পেপার পাওয়া যায় না। প্রথমে ফাউন্টেন পেন এবং তার পরে ডট কলমের এই যুগে ব্লটিং পেপারের আর প্রয়োজন নেই, কাগজের কোম্পানিগুলো আর ব্লটিং পেপার বানায় না।
সংবাদটা শোনার পর প্রথম ধাক্কাটা একটু সামলিয়ে নিয়ে প্রমথেশ গোবিন্দলালবাবুকে জিজ্ঞাসা করল, ব্লটিং পেপার? কিন্তু ব্লটিং পেপারের সঙ্গে রাবড়ির কী সম্পর্ক?
গোবিন্দলালবাবু আজ্ঞের মতো হাসলেন, বললেন, আপনার কি ধারণা যে রাবড়ি শুধু দুধ জ্বাল দিয়ে হয়? তাতে খরচা পোষাবে? রাবড়ি বানানোর সময় দুধ জ্বাল দিতে দিতে আস্তে আস্তে ব্লটিং পেপার ছিঁড়ে সেই দুধের মধ্যে দিতে হয়। তারপর যত ঘন হয়ে আসে চিনি দিয়ে সেই দুধ মাড়তে হয়।
প্রমথেশ বলল, কিন্তু আমি অল্প বয়েসে দেখেছি, দুধের কড়ার ওপরে বাঁশের চোঙা দিয়ে ফুঁ দিয়ে কারিগরেরা রাবড়ি বানাচ্ছে। সর জমছে, তারপর সেই সর হাতা দিয়ে ভেঙে আবার ফুঁ দিয়ে সর বানাচ্ছে।
গোবিন্দলালবাবু বললেন, ও সব লোকদেখানো ব্যাপার মশায়। আপনারা আজকাল যাকে বলেন বিজ্ঞাপন। ওপরের দিকে দুয়েক প্রস্থ সর হয়তো করা হয়, কিন্তু নব্বই ভাগই ব্লটিং পেপার।
গোবিন্দলালবাবুর কথাটা প্রমথেশ অবিশ্বাস করতে পারল না। তার কথার মধ্যে কার্যকারণ যোগ আছে।
সত্যিই তো বাজারে আজকাল ব্লটিং পেপার পাওয়া যায় না। সে নিজেই বহুদিন ব্লটিং পেপার দেখেনি।
প্রমথেশের আবছা মনে পড়ল, ছোট বয়সে সেই ইস্কুলে পড়ার সময়ে সে যেন শিখেছিল ব্লটিং পেপার কথাটা ভুল। ব্লটিং পেপার নয় হবে শুধু ব্লটিং। আজ কিন্তু বিলিতি ডিকশনারি খুলে দেখল ব্লটিং পেপার কথাটাই আছে, শুধু ব্লটিং নয়।
তাহলে এখন ডিকশনারিতেই শুধু ব্লটিং পেপার রয়েছে। পৃথিবী থেকে চিরকালের মতো সেই ব্লটিং পেপার, যাকে তারা বলত চোষ-কাগজ অদৃশ্য হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে বিদায় নিয়েছে রাবড়ি।
প্রমথেশ সেদিন রাতে শুয়ে পড়ার পর অনেকক্ষণ ধরে ব্যাপারটা নিয়ে তলিয়ে ভাবল। আজ কয়েকদিন ধরে ভাস্বতী এবং মেয়েরা লক্ষ করেছে, প্রমথেশ একটু অন্যমনস্ক। ভাস্বতীর ধারণা হয়েছিল সে হয়তো আবার বাইরে যাওয়ার কথা ভাবছে।
ভাস্বতী সেদিন রাতে প্রমথেশকে প্রশ্ন করল, আজকাল তুমি কী এত ভাবছ বল তো, দূরে কোথাও বাইরে যাবে নাকি?
প্রমথেশ বলল, না তা নয়। আমি ভাবছি ব্লটিং পেপারের কথা।
ভাস্বতী অবাক হল, ব্লটিং পেপার? ব্লটিং পেপার দিয়ে কী হবে তোমার?
প্রমথেশ বলল, জান আজকাল আর বাজারে ব্লটিং পেপার পাওয়া যায় না।
ভাস্বতী আরও আশ্চর্য হয়ে বলল, না পাওয়া গেলে আমাদের কী ক্ষতি হচ্ছে শুনি। ডট পেনে ব্লটিং পেপারের তো আর দরকার পড়ে না।
সেটা প্রমথেশ জানে। কিন্তু তার মনে পড়ছে কাছারি ঘরে মুহুরিবাবু বাজার থেকে একটা বড় ব্লটিং শিট কিনে এনে সেটাকে যত্ন করে ছুরি দিয়ে ছোট ছোট টুকরো করতেন। তার থেকে অধিকাংশ টুকরো কাছারি ঘরে রেখে তিনটে টুকরো তাদের তিন ভাইকে দিতেন। সেই চোষকাগজ পরম যত্নে ইস্কুলের খাতার মধ্যে রেখে দিত প্রমথেশরা। মাঝে মধ্যে সেটা চুরিও যেত।
অনেকদিন পরে পরীক্ষার হলের কথা মনে পড়ল প্রমথেশের। পরীক্ষার সময় খাতা আর প্রশ্নপত্রের সঙ্গে একচিলতে চোষকাগজও সরবরাহ করা হত। চারদিনের আটটা পরীক্ষায় আট চিলতে চোষ কাগজ জমে যেত। নির্মম পরীক্ষা পর্বের সেটাই ছিল একমাত্র আকর্ষণ। যত ছোটই হোক না কেন, আটটা চোষ-কাগজ, সেটা কম কথা নাকি, সাত রাজার ধন আট মানিক।
