কিন্তু ভাস্বতী ভাবেনি হাঁড়ির মধ্যে পাড়া আছে, সে ধরে নিয়েছিল এটা রাবড়ির হাঁড়ি। সুতরাং পাড়া দেখে সে স্বগতোক্তি করল, ভেবেছিলাম রাবড়ি বুঝি।
অনুচ্চ কথাটা কিন্তু প্রমথেশের কানে গেল এবং সেই মুহূর্তে একটা গভীর অনুশোচনা তার মনের মধ্যে দেখা দিল।
এক সময় পিসিমা-জেঠিমার সঙ্গে, তার আগে ঠাকুমার সঙ্গে এবং এই সেদিন পর্যন্ত বাবা-মার সঙ্গে, যতদিন তারা বেঁচে ছিলেন, বারবার গয়া-কাশী-বৃন্দাবন গিয়েছে প্রমথেশ তার অবিবাহিত বয়সে। কু-ঝিক-ঝিক রেলগাড়ি। রঙিন স্টেশন, বিচিত্র খাদ্য ও পসরা, এসবের মধ্যে কাশীর প্রধান আকর্ষণই ছিল রাবড়ি। ঘন রাবড়ি দিয়ে হাতে গরম বড় বড় ফুলকো লালরুটি তার চেয়ে সুখাদ্য জগৎসংসারে কোথাও নেই।
ভাস্বতী রাবড়ির কথা জিজ্ঞেস করা মাত্র সরল ও সৎ প্রমথেশ থমকে গেল। সত্যিই তো এত কটা দিন কাশীতে থাকলাম, রাবড়ির কথা মনে পড়ল না।
এবার কাশীতে একদিনও রাবড়ি খায়নি প্রমথেশ, তার কোনও দোষ নেই। এক সময়ে কাশীর আকাশ-বাতাস ম-ম করত রাবড়ির উষ্ণ সৌরভে। ঘন দুধের মাদক ঘ্রাণ ভাসত বাতাসে। সন্ধ্যার পরে লোকেরা মন্দির থেকে ফেরার পথে ভাঁড় ভরতি রাবড়ি আর হাতে গড়া রুটি নিয়ে যেত। তাই দিয়ে নৈশাহার হয়ে যেত রীতিমতো চেটেপুটে।
এবার প্রমথেশ গিয়ে উঠেছিল এক টুরিস্ট লজে। দুবেলা খেয়েছে সেখানে। সেই ভাত-ডাল, রুটি-মাংস, সবজি এসব জায়গায় যেমন হয় আর কি। রাবড়ি কেন, কোনও মিষ্টিই খাওয়া হয়নি। রাস্তাঘাটেও মিষ্টির দোকান নজরে আসেনি। তার বদলে সারি সারি ভুজাওয়ালার দোকান।
আসার দিন স্টেশনের কাছের পুরনো মিষ্টির দোকানটা থেকে হঠাৎ খেয়াল করে এই পাড়াগুলো কিনে এনেছে প্রমথেশ। যতদূর মনে পড়ছে, সে দোকানেও রাবড়ি দেখেনি, দেখলে নিশ্চয়ই কিনে আনার কথা মনে হত।
এখন ভাস্বতী রাবড়ির কথা উল্লেখ করায় প্রমথেশ বলল, দ্যাখো, কী আশ্চর্য কাণ্ড! এবার কাশীতে কোথাও রাবড়ি দেখলাম না।
ভাস্বতী প্রশ্ন করল, তুমি খুঁজেছিলে?
প্রমথেশ বলল, না খুঁজিনি। কিন্তু ওখানে তো ষাঁড়, সন্ন্যাসী আর রাবড়ির জন্যে খোঁজাখুঁজি দরকার পড়ত না। প্রথম দুটো এখনও আছে কিন্তু রাবড়িটা গেছে।
তারপর একটু থেমে প্রমথেশ বলল, কাশী থেকে রাবড়ি আনিনি তাই কী হয়েছে, আমি বড়বাজারে সত্যনারায়ণ পার্কের কাছে একটা দোকান চিনি, দুর্দান্ত রাবড়ি বানায়, কাশীর রাবড়ির থেকে কোনও অংশে কম নয়।
ভাস্বতী বলল, সে দোকানের রাবড়ি শেষ কবে খেয়েছ? অন্তত পনেরো বছর আগে। সে দোকান এখনও আছে তো?
ভাস্বতীর আশঙ্কাই সত্যি হল।
একদিন বিকেলবেলা অফিস ছুটির পর প্রমথেশ বড়বাজারে সেই রাবড়ির দোকানের খোঁজে গেল। বড়বাজারের রাস্তাঘাটের সঙ্গে সুপরিচয় না থাকলে সেখানে হাজারো গলিঘুজির মধ্যে কোনও কিছু খুঁজে বের করা কঠিন। রাস্তায় কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা করলে বলতে পারে না বা বলতে চায় না। সেই সব দুর্ভেদ্য গলির মধ্যে ট্যাক্সি, রিকশ কিছু নিয়েই ঢোকা কঠিন। পায়ে হেঁটে, ভিড়ের মধ্যে ধস্তাধস্তি করে সেই পুরনো রাবড়ির দোকানটা খুঁজল প্রমথেশ। কিন্তু পেল না।
রাস্তাঘাট, দোকানপাটের চেহারা খুব একটা পালটায়নি। ঠিক জায়গাতেই প্রমথেশ শেষ পর্যন্ত পৌঁছেছিল, কিন্তু সেই প্রাচীন দোকানটা আর নেই। সেখানে ঝলমল করছে এক ভুজাওয়ালার দোকান। আজকাল যেমন হয়েছে সব পাড়ায় পাড়ায়, চানাচুরের চেন স্টোর, মার্কিনি বাণিজ্যের কালোয়াড়ি সংস্করণ।
ক্লান্ত, গলদঘর্ম হয়ে বাসায় ফিরে ব্যর্থ প্রমথেশ ভাস্বতাঁকে কিছু বলল না। তবে মনে মনে স্থির করল, কাশীর রাবড়ির মতো উচ্চমানের না হলেও সাধারণ মানের রাবড়ি কোনও মিষ্টান্ন ভাণ্ডার থেকে আনতে হবে। ভাস্বতী তো আর দৈনিক রাবড়ি খায় না। বলতে গেলে দু-চার বছরেও একদিন খায় না, সে সাধারণ রাবড়ি খেয়েই খুশি হবে।
কিন্তু রাবড়ি কেনা এত সোজা ব্যাপার নয়। পাড়ার আশেপাশে সমস্ত মিষ্টির দোকানে খোঁজ করল প্রমথেশ। কোথাও রাবড়ি পাওয়া যায় না। সন্দেহ হল, কোনও কোনও দোকানদারের প্রশ্নসূচক এবং বিস্ময়বোধক কথায়, নতুন যুগের মিষ্টিওয়ালারা অনেকে রাবড়ির নামই শোনেনি।
বাসায় এসে এ কথা বলতে ভাস্বতী বলল, বলছ, কাশীতেই রাবড়ি দেখলে না। কলকাতায় দেখতে পাবে, আশা কর কী করে?
প্রমথেশের চেষ্টা কিন্তু কমল না। সে হাল ছাড়ার পাত্র নয়। রাস্তাঘাটে, বাজারে যেখানেই বড় মিষ্টির দোকান দেখতে পায় সে গিয়ে রাবড়ির খোঁজ করে। কিন্তু কোথাও রাবড়ি নেই।
অফিসে এসে সহকর্মীদের সঙ্গে এ ব্যাপারে আলোচনা করল প্রমথেশ।
সব অফিসেই দু-চারজন সবজান্তা লোক থাকে। তারা মেয়ের গানের মাস্টারের খোঁজ থেকে কোথায় জন্ডিসের মালা পাওয়া যায়, কোন ঘোড়া এই শনিবারের রেসে অবশ্যই জিতবে–সব কিছুর হদিশ দিতে পারে।
প্রমথেশের কথা শুনে বলাইবাবু বললেন, রাবড়ি পাবে তুমি ভবানীপুরে জগুবাবুর বাজারের পিছনের রাস্তায়। বলাইবাবু কালীঘাটের বাসিন্দা, তার পক্ষে এটা অবশ্য জানা সম্ভব।
একজন আবার বড়বাজারের কথা বললেন। কিন্তু প্রমথেশ আর বড়বাজারে যাবে না। একবার গিয়ে যথেষ্ট নাজেহাল হওয়া গেছে। ন্যাড়া বেলতলায় কবার যায়?
