এর মধ্যে অবশ্য একবার গ্র্যান্ড হোটেলে গিয়েছিলাম। শুনেছিলাম সেখানে ব্যাঙের মাংস বিক্রি হয়, যদি মাংসে রূপান্তরিত হওয়ার আগে ব্যাঙের মরদেহটা দেখতে পাই এই আশায়। কিন্তু সেখানে গিয়ে শুনলাম, ব্যাঙের মাংসের কোনও চাহিদা নেই, মেনু থেকে ওই পদ বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আমি সহানুভূতির সঙ্গে প্রশ্ন করলাম, এত যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দূরদর্শন পর্যবেক্ষণ করলেন, সংবাদের পর সংবাদ, সিরিয়ালের পর সিরিয়াল কোথাও কোনওদিন একটা ব্যাঙ নজরে এল না।
খুব গম্ভীর হয়ে রমেশদা বললেন, না। একেবারেই না।তারপর আরও গম্ভীর হয়ে বললেন, আমি নিজেই এই সমস্যার সমাধান করে ফেলেছি।
রমেশদার আত্মপ্রত্যয় দেখে আমি অবাক হয়ে কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম, তারপর প্রশ্ন করলাম, কী রকম?
এইবার মুচকি হেসে রমেশদা বললেন, টিভি দেখে দেখে সিরিয়াল করার ব্যাপারটা আমি ধরে ফেলেছি। আমি নিজেই একটা সিরিয়াল করছি, যুগে যুগে ব্যাঙ।
আমি প্রতিধ্বনি করলাম, যুগে যুগে ব্যাঙ!
রমেশদা বললেন, অবাক হচ্ছিস কেন? এই সব বই থেকে একেকটা স্টোরি নিচ্ছি। তেরোটা স্টোরি হবে। সাতটা করে ফেলেছি। হিতোপদেশের ধর্মপ্রাণ ব্যাঙ, কুয়ো আর সাগরের ব্যাঙ, ব্যাঙ জন্মে জাতক, ত্রৈলোক্যনাথের কঙ্কাবতীর হিট-মিট-ফ্যাট ব্যাঙ সাহেব এমনকী বুদ্ধদেব বসুর ব্যাঙের কবিতাটা নিয়ে একটা বাইশ মিনিটের চিত্রনাট্য লিখে ফেলেছি।
তারপর একটু দম নিয়ে রমেশদা আমাকে বললেন, শুনবি একটু?
আমি অথৈ জলে পড়তে যাচ্ছিলাম। কিন্তু রমেশদাই রক্ষা করলেন, বোধহয় একটু মায়া হল আমার ওপর, বললেন, না থাক। তোরও সময় নষ্ট হবে, আমারও সময় নষ্ট হবে। পর্দায় তো দেখতে পাবিই। এই বর্ষাতেই শুটিং শুরু করব। ভাবছি যদি ভিসা পাসপোর্ট করে উঠতে পারি বাংলাদেশে কুষ্টিয়ায় গিয়ে হরিনাথপুর গাঁয়ে শুটিং করতে যাব। বাবা, কত রকম ব্যাঙ যে সেখানে দেখেছিলাম ছোটবেলায়।
রমেশদাকে বাইরের ঘরে রেখে আমি বাড়ির মধ্যে ঢুকলাম।
অনেকদিন পরে এসেছি, সকলের সঙ্গেই দেখা করে যাই।
রমেশদা আবার মন দিয়ে সিরিয়াল লেখায় হাত লাগালেন।
০৫. সংযোজন
বোঝাই যাচ্ছে, এই গল্প শেষ হতে এখনও অনেক বাকি। সে জন্যে অন্তত আগামী বর্ষা পর্যন্ত অপেক্ষা। করতে হবে।
শুধু আপাতত দাড়ি টানার আগে অনেকদিন আগের এক নাক-উঁচু কবির এক বহুবিখ্যাত, বহুপঠিত কবিতার শেষ পঙক্তিটি অকারণেই স্মরণ করছি,
ব্লটিং পেপার
এই গরমে কেউ কাশী যায়?
যায়। অবশ্যই যায়। কাশী অর্থাৎ বেনারস যাওয়ার রেলের কামরাগুলো কি ফাঁকা থাকে? থাকে না। ভিড়ে গিজ গিজ করে। যেকোনও রেলের অফিসে সিট রিজার্ভ করতে গেলেই ব্যাপারটা টের পাওয়া যাবে।
প্রমথেশও টের পেয়েছিল। এবং টের পেয়ে খুশি হয়েছিল এই কারণে যে সে ছাড়াও এই ভরা গরমে আরও ঢের ঢের লোক আছে কাশী যাওয়ার। এরা সবাই কি আর কাজে-কর্মে, প্রয়োজনে কাশী যাচ্ছে, কেউ কেউ নিশ্চয়ই বেড়াতেও যাচ্ছে।
প্রমথেশ বেড়াতেই যাচ্ছে। বলা বাহুল্য, সে একটু খ্যাপাটে ধরনের লোক। সংসারী মানুষ, অনতিযুবতী স্ত্রী, দুই কিশোরী কন্যা। একটি মাঝারি মাপের চাকরি। কাজকর্ম, সংসারধর্ম পালন ইত্যাদি প্রমথেশ প্রায় ঠিকঠাকই করে কিন্তু তার অন্তর্গত রক্তের ভিতরে একটা খ্যাপামি আছে। সে এক শৃঙ্খলাবদ্ধ যাযাবর। সব সময়ে তার মন উচাটন, কোথায় যাই, কোথায় যাই? একনাগাড়ে দুই সপ্তাহের বেশি ঘরে তার মন বসে না। কিন্তু সব সময়ে বেরোনো সম্ভব হয় না। তবে মাস দুয়েকের মাথায় সে চঞ্চল হয়ে ওঠে, বাইরে বেরোতেই হবে।
প্রমথেশের স্ত্রী ভাস্বতী। সে সব সময় সামলায়। প্রমথেশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তার হুটহাট বেরোনো সম্ভব হয় না। দুই মেয়ে আছে, তাদের ইস্কুল আছে। বাড়িতে চাদা নামে একটা সাদা
বেড়াল আছে, সে সারাদিন ভাস্বতীর পায়ে পায়ে ঘোরে। কোথাও বাইরে গেলে সেই বেড়ালের দেখাশোনা, খাওয়া-দাওয়ার বন্দোবস্ত করে যেতে হয়। এইরকম অজস্র ঝামেলা।
দুয়েক মাস অন্তর প্রমথেশ একাই বেরিয়ে পড়ে। কখনও কাছে-পিঠে দিঘায় বা মুকুটমণিপুরে। কখনও বা পুরী-দার্জিলিং। পয়সা ও সময় থাকলে দিল্লি, মুম্বই, মাদ্রাজ, কন্যাকুমারী। একবার নেপাল এবং আরেকবার বাংলাদেশেও গিয়েছিল। তবে প্রমথেশ স্বার্থপর নয়। যেখানেই যাক বাড়ির সকলের জন্য, এমনকী চাদা বেড়ালের জন্য কিছু না কিছু নিয়ে আসে। বেরিয়ে ফেরার সময় মিষ্টি নিয়ে আসার একটা রীতি আছে, সে রীতিটাও বেশ মান্য করে চলে প্রমথেশ।
কাশী থেকে আসার সময় এক হাঁড়ি পাড়া নিয়ে এসেছে প্রমথেশ। ভাস্বতীর জন্যে শাড়ি এনেছে, বেশ দামি শাড়ি। মেয়ে দুটির জন্যে শালোয়ার-কামিজ। আর চাঁদা বেড়ালের জন্যে একটা কাঠের ইঁদুর, সেই ইঁদুরের ঘাড়টা হাওয়া লাগলেই নড়ে।
আজ ট্রেনটা প্রায় ঠিক সময়েই এসেছে। হাওড়া স্টেশনে একটা শেয়ার ট্যাক্সিতে কিঞ্চিৎ অর্থদণ্ড দিয়ে প্রমথেশ সকাল সকালই বাড়ি এসে পৌঁছেছে। এখন খাওয়ার টেবিলে সে পাড়ার হাঁড়িটা সামনে নিয়ে বসেছে।
এক মুঠো মানে বেশ কয়েকটা পাড়া বের করে সামনের প্লেটে রাখল প্রমথেশ। পায়ের নীচে চাদা বেড়াল ঘুরঘুর করছিল। তাকে একটা পাড়া দিল। চাঁদা প্যাড়াটা কুটকুট করে সঁতে কেটে খেতে লাগল।
