গলির মোড়েই ব্যাকুল মুখে রমেশবাবুর ভাইপো দাঁড়িয়ে ছিল। সে রমেশবাবুকে দেখে চেঁচিয়ে উঠল, এই তো জ্যাঠা ফিরে এসেছে। তার চিৎকার শুনে গলির ভেতর থেকে অনেক লোক ছুটে বেরিয়ে এল।
রমেশবাবু বাড়িতে এসে শুনলেন তাঁর ছেলে, ভাই কারও আজ অফিস যাওয়া হয়নি। বাড়ির কারও নাওয়া খাওয়াও হয়নি। ভাই কিংবা ছেলে এখন কেউই আর বাড়ি নেই। দুজনেই তাঁকে খুঁজতে বেরিয়েছে। একজন দক্ষিণে গেছে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, অন্যজন গেছে উত্তরদিকে আর জি কর হাসপাতালে। বেলা তিনটে নাগাদ তারাও ফিরল। সবাই হইচই করতে লাগল, কী হয়েছিল? কোথায় গিয়েছিলে!
রমেশবাবু তাদের কী আর বলবেন। শুধু মুখে বললেন, না। এই এমনি একটু বেড়াতে বেরিয়েছিলাম।মনে মনে ভাবলেন, এদের যদি বলি ব্যাঙ খুঁজতে, ব্যাঙ দেখতে গিয়েছিলাম, তা হলে এরা হয়তো ধরে নেবে আমি পাগল হয়ে গেছি।
দুপুরের খাওয়া-দাওয়া মিটতে মিটতে বিকেল হয়ে গেল।
সারাদিনের পথশ্রম এবং ক্লান্তিতে অবেলায় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন রমেশবাবু।
যখন ঘুম ভাঙল তখন ঘোর সন্ধ্যা। ঘুম থেকে উঠে বিছানায় আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে তিনি শুনতে পেলেন তার নাতনি একটা ছড়ার বই খুলে আপনমনে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে পড়ছে, ৫২২
তাঁতির বাড়ি ব্যাঙের বাসা
কোলা ব্যাঙের ছা।
খায় দায় গান গায়
তাইরে নাইরে না।
বিছানায় বসেই নাতনিকে ডাকলেন রমেশবাবু, খুকু তোর ছড়ার বইটা একটু নিয়ে আয়তো দেখি।
দাদু সাধারণত খুকুকে কখনও এমনভাবে ডাকে না। আজ দাদুর ডাক শুনে পরম উৎসাহে খুকু ছড়ার বইটা নিয়ে দাদুর কাছে এল। বিছানা থেকে উঠে ঘরে আলো জ্বেলে খুকুকে সামনের কাঠের চেয়ারটায় বসিয়ে কলতলায় মুখ ধুতে গেলেন রমেশবাবু।
ফিরে এসে তাক থেকে চশমাটা নামিয়ে খুকুর ছড়ার বইটা খুলে ব্যাঙের ছবিটা তন্ময় হয়ে দেখতে লাগলেন তিনি।
ছড়ার বইটার প্রথম পাতাটা ছেঁড়া। বোঝা গেল না ছবিটা কে এঁকেছে, শিল্পীর নামটা পাওয়া গেল। রমেশবাবু নাতনিকে বললেন, দেখেছিস ব্যাঙের ছবিটা কী সুন্দর এঁকেছে।
খুকু বলল, এর চেয়ে অনেক ভাল ভাল ব্যাঙ আজ বিকেলে টিভিতে দেখিয়েছে। তাইতো ছড়াটা পড়ছিলাম।
ভেতরের ঘরে একটা ছোট সাদাকালো টিভি আছে। বিকেলে খুকু রাস্তায় খেলতে যাওয়ার জন্যে যখন বায়না করে তখন খুকুর মা তাকে টিভি খুলে বসিয়ে দেয়। দূরদর্শনে শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানের সময় সেটা। অনেকদিন অনুষ্ঠান খুবই খটমট লাগে খুকুর। আবার খুব মজাও হয় কখনও কখনও যেমন আজকেই হয়েছে, আজকের প্রোগ্রাম ছিল: মানুষের পরম বন্ধু ব্যাঙ।
০৪. তাইরে নাইরে না
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আর বাড়ির বাইরে গেলেন না রমেশবাবু। মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ভাইপোর কাছ থেকে জীববিজ্ঞানের বইটা চেয়ে নিয়ে উভচর প্রাণীর অধ্যায়টা খুব ভাল করে দেখলেন তিনি।
এবং সেখানেই একটা খবর পেলেন। খবরটা তার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। ঠান্ডা পড়ার সঙ্গে ব্যাঙ অদৃশ্য হয়ে যায়। খানাখন্দে, গর্তে লুকিয়ে পড়ে। সুতরাং আপাতত কয়েকমাস আর ব্যাঙের খোঁজে আনাচে কানাচে ঘোরাঘুরি করে বিশেষ লাভ নেই। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের মোড়ে একটা ভিডিও ক্লাব হয়েছে। অফিসে যাতায়াতের পথে রমেশবাবুর সেটা চোখে পড়েছে। বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে সেই ক্লাবে গিয়ে তিনি খোঁজ করলেন, গতকাল টিভিতে শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানে একটা ব্যাঙের প্রোগ্রাম হয়েছিল সেটা কি ভিডিওতে আবার দেখা সম্ভব।
ভিডিও পারলারের সুযোগ্য অ্যাসিস্ট্যান্ট কাম অপারেটর কাম মেকানিক মংলু প্রসাদ চতুর, অভিজ্ঞ ব্যক্তি। কলকাতা শহরে তার জীবিকার হাতেখড়ে হয়েছিল সুরেন ব্যানার্জি রোডে অশ্লীল বইয়ের দোকানে সেলসম্যানি করে।
মংলু প্রসাদ রমেশবাবুর কথায় কী বুঝল কে জানে। অশ্লীল সামগ্রীর খদ্দের সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতা যথেষ্ট, সে হঠাৎ রমেশবাবুর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে কী একটা কু প্রস্তাব দিল।
রমেশবাবু মংলুকে একটা থাপ্পড় লাগাতে যাচ্ছিলেন কিন্তু ক্রোধ দমন করে দ্রুত রাস্তায় বেরিয়ে এলেন।
বন্যপ্রাণী ও পশুপালন অধিকারের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রধান সহায়ক শ্রীযুক্ত রমেশচন্দ্র রায় আমার আপন মামাতো দাদা। পরস্পর খবর পেয়েছিলাম যে রিটায়ার করার পর তাঁর মস্তিষ্কবিকৃতি ঘটেছে।
এটা কোনও আশ্চর্য ব্যাপার নয়। সব অফিসেই বহু পাগল থাকে। যতদিন তারা অফিস করে বাড়ির লোকেরা, সেই সঙ্গে পাড়াপ্রতিবেশী জানতেই পারে না যে তারা পাগল। আর দশজনের মতোই তারা স্নান করে, ভাত খেয়ে অফিস যায়-দশটা পাঁচটা করে। কিন্তু অবসর নেওয়ার পরে তাদের স্বরূপ প্রকাশিত হয়, ধরা পড়ে যে তারা পাগল।
সে যা হোক সামাজিকতার খাতিরে একদিন রমেশদাকে দেখতে গেলাম। বিজয়ার পরে যাওয়া হয়নি।
বাইরের ঘরে খাটে বসে রমেশদা খসখস করে কী সব লিখছেন একটা জলচৌকির ওপর কাগজ রেখে। খাটভর্তি তাড়া তাড়া কাগজ, গাদা গাদা বই। সেসব বইয়ের মধ্যে হিতোপদেশ, জাতকের গল্প থেকে শুরু করে এমনকী গতযুগের ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের গ্রন্থাবলী মায় বুদ্ধদেব বসুর শ্রেষ্ঠ কবিতা অব্দি রয়েছে।
বিজয়ার বিলম্বিত প্রণাম ও কোলাকুলি সাঙ্গ হওয়ার পরে রমেশদা বললেন, খোকন, যখন বুঝতে পারলাম আগামী কয়েকমাসের মধ্যে, ওই সামনের বর্ষার আগে সশরীরে কোনও ব্যাঙ দেখার কোনও সম্ভাবনা নেই, তখন সারা দিন রাত যতক্ষণ সম্ভব টিভি দেখতে লাগলাম। দিল্লির মর্নিং প্রোগ্রাম, দুপুরের ইউ জি সি, সন্ধ্যায় ঢাকা, কলকাতা, এক নম্বর, দুই নম্বর চ্যানেল, দিল্লি ন্যাশনাল নেটওয়ার্ক সব তন্নতন্ন করে দেখতে লাগলাম যদি কোথাও একটা ব্যাঙের দৃশ্যও দেখতে পাই।
