বাড়ি ফেরার বাসে উঠতে যাচ্ছিলেন তিনি। কাছেই রবীন্দ্রসদনের পাশ থেকে উলটোডাঙার খালি বাস ছাড়ে। কিন্তু হঠাৎ রমেশবাবুর খেয়াল হল এখান থেকে চিড়িয়াখানা মোটেই দূরে নয়, হাঁটাপথে বড়জোর পনেরো মিনিট।
চিড়িয়াখানার ভেতরে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে শেষবার গিয়েছিলেন রমেশবাবু তার মা বাবার সঙ্গে। সেসব অনেকদিন আগেকার কথা। এর মধ্যে একদিন নাতনিকে নিয়ে আসবেন ভেবেছিলেন তাও হয়ে ওঠেনি।
চিড়িয়াখানার দিকে এগোতে এগোতে রমেশচন্দ্র ভাবতে লাগলেন চিড়িয়াখানায় ব্যাঙের খাঁচা আছে কিনা। সারা দুনিয়ার হাজার রকম জীবজন্তু চিড়িয়াখানায় আছে আর ব্যাঙ থাকবে না, নিশ্চয়ই আছে।
চিড়িয়াখানায় পৌঁছে টিকিট কেটে ভিতরে ঢুকে রমেশবাবু কিছুক্ষণ ইতস্তত ঘুরলেন। তারপর একটা ম্যাপের সাইনবোর্ডের সামনে দাঁড়ালেন, তার মধ্যে বিভিন্ন রকম জীবজন্তুর খাঁচার পথ নির্দেশ দেওয়া আছে।
কিন্তু না। এর মধ্যে কোথাও ব্যাঙের খাঁচার কোনও অস্তিত্ব নেই। একটু বিভ্রান্ত বোধ করলেন রমেশবাবু। কিন্তু কী আর করবেন, কাকে জিজ্ঞাসা করা যায়। আর আঁতিপাঁতি করে খুঁজতেও ভরসা পাচ্ছেন না তেমন। বিশেষ করে একটু আগের ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল গার্ডেনের সেই অভিজ্ঞতা মোটেই মধুর নয়।
সাইনবোর্ডের সামনে থেকে ঘুরে দাঁড়াতেই রমেশচন্দ্রের চোখে পড়ল বিজলি গ্রিল। অনেকদিন আগে বিজলি গ্রিলের দেবু বারিক রমেশচন্দ্রের সঙ্গে এক স্কুলে কিছুদিন পড়েছিল। এখন হয়তো আর চিনতে পারবে না।
তা না পারুক। গুটি গুটি বিজলি গ্রিলে গিয়ে দাঁড়ালেন রমেশবাবু। দোকানটা তখন সদ্য খুলেছে, সামনে কাউন্টারের পাশে যে ভদ্রলোক তাঁকে প্রশ্ন করলেন, আচ্ছা, দেবু আছে, দেবু বারিক?
ভদ্রলোক বললেন, না দেবুবাবুকে তো এখন পাবেন না। কেন, বলুন তো?
একটু ইতস্তত করে রমেশবাবু বললেন, না তেমন কিছু নয়। আমি দেবুর ক্লাসফ্রেন্ড ছিলাম, একটা খবর জানতে চাইছিলাম।
ভদ্রলোক বললেন, কী খবর বলুন?
রমেশবাবু একটু দম নিয়ে, একটু চিন্তা করে বললেন, আচ্ছা, আপনাদের এই চিড়িয়াখানায় ব্যাঙের কোনও খাঁচা নেই।
কাউন্টারের ওপারের ভদ্রলোক হো হো করে হেসে উঠলেন, কিছুক্ষণ রমেশবাবুকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করলেন, তারপর বললেন, ব্যাঙের খাঁচা? ব্যাঙের? হাসালেন দাদা আপনি। কাক, কাঠবেড়ালি, ব্যাঙ, চড়ুই এদের আবার খাঁচা কী? তাহলে তো নেড়িকুকুর, পাতি বেড়াল, টিকটিকি আর শালিককেও খাঁচায় রাখতে হবে।ভদ্রলোক হো হো করে হাসতে লাগলেন।
কিঞ্চিৎ অপ্রতিভ হয়ে তবুও শেষরক্ষা হিসেবে রমেশবাবু বললেন, কিন্তু, মনে করুন, এমন কোনও লোক চিড়িয়াখানায় এসেছে যে জীবনে কখনও ব্যাঙ দেখেনি…
এমন কোনও লোক যে জীবনে কখনও ব্যাঙ দেখেনি!…
ভদ্রলোকের অট্টহাস্য উচ্চতর হল, তারপর কী ভেবে তিনি হাসি থামিয়ে রমেশবাবুকে বললেন, ব্যাঙের কোনও খাঁচা নেই বটে, তবে কেউ যদি সত্যি সত্যিই ব্যাঙ দেখতে চায়, সে সাপের খাঁচায় গেলে ব্যাঙ দেখতে পাবে।
রমেশবাবু এই সংবাদে উত্তেজিত হয়ে বললেন, কী রকম?
ভদ্রলোক ভারিক্কি চালে বললেন, সাপের খাদ্য হল ব্যাঙ। সব সাপকেই ব্যাঙ খেতে দেয়া হয়। এইতো এখনই দশটা-সাড়ে দশটার সময় সব খাঁচায় খাবার দেয়া হবে। আপনি সাপের খাঁচার ওখানে। গেলে দেখতে পাবেন খাঁচায় রাশিরাশি ব্যাঙ ছেড়ে দেয়া হচ্ছে।
খবরটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এমন নৃশংস ঘটনার সঙ্গে আদৌ জড়িত হতে চান না রমেশচন্দ্র।
তবু নিতান্ত ব্যাঙ দর্শনের মানসেই গুটিগুটি রেপটাইল হাউস তথা সর্পভবনের দিকে এগিয়ে গেলেন রমেশবাবু।
প্রতি মুহূর্তে রমেশবাবু ভয়ে, দ্বিধায় কাতর হচ্ছিলেন। হয়তো গিয়ে দেখবেন কাঁচের দেয়ালের ওপাশে সাপ গিলে খাচ্ছে একটার পর একটা ব্যাঙ। ব্যাঙ দেখার আনন্দের চেয়ে তাহলে যে ব্যাঙ নিধনের এই যন্ত্রণা অনেক বড় হয়ে যাবে।
রমেশবাবুর ভাগ্য ভাল।
সপ্তাহে একদিন মাত্র সাপেদের খাবার দেয়া হয়। এবং আজকের দিনটি সেই দিন নয়। গতকালই নাকি ছিল সাপেদের খাবার দেয়ার দিন।
সুতরাং সর্পভবনে গিয়ে নিতান্তই অল্পবিস্তর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বৃহদপি বৃহৎ সাপ এবং কয়েকটি মেছে ও গেছো কুমির দেখলেন রমেশচন্দ্র, কিন্তু একটিও ব্যাঙ দেখতে পেলেন না। তবে কোনও কোনও সাপের উত্তুঙ্গ এবং সচল পাকস্থলী দেখে বুঝতে পারলেন, ওরই অন্তরালে রয়েছে এক কিংবা একাধিক ব্যাঙ, যাদের জীবন্ত গিলে ফেলা হয়েছে।
.
বেলা প্রায় বারোটা বাজে।
ভগ্নমনোরথ রমেশবাবু খিদিরপুর বাজারের রাস্তায় চিড়িয়াখানার পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এলেন। বাইরে গনগন করছে রোদ, কে বলবে এটা কার্তিকের শেষ। আজ সকালেই উঠেছিল জোর উত্তুরে হাওয়া আর শীতল বৃষ্টি।
তিন নম্বর বাসস্ট্যান্ড খিদিরপুর বাজারের পাশেই। সেটায় চড়ে প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে গ্রে স্ট্রিট-সার্কুলার রোডের মোড়ে নেমে অনেকটা হেঁটে যখন হরি সেন স্ট্রিটের কাছে এসে পৌঁছলেন রমেশবাবু তখন প্রায় দেড়টা বাজে। সূর্য ঢলে পড়েছে, বড় বড় লম্বা ছায়া পড়েছে রাস্তায়।
এদিকে তার বাড়িতে হইচই পড়ে গেছে। থানায় ডায়েরি করা হয়েছে। লোকটা গেল কোথায়? চাকরি থেকে অবসর নিয়ে কি লোকটা বিবাগী হয়ে গেল। আস্ত লোকটা উধাও হয়ে গেল। শুধু বাড়ির লোক নয়, পাড়াসুদ্ধ লোক পর্যন্ত জড়িত হয়ে পড়েছে এই দুশ্চিন্তায়।
