অনেকদিন পরে এসব জিনিস চোখে পড়ল রমেশবাবুর। তার কেমন যেন মনে হল জীবনটা বড় বৃথা গিয়েছে। অন্তত এখনও একটা কিছু করা দরকার। সামনের দিকে হাঁটতে লাগলেন তিনি।
০৩. তাঁতির বাড়ি ব্যাঙের বাসা
হাঁটতে হাঁটতে কলেজ স্ট্রিটের মোড় পর্যন্ত এসে গেলেন রমেশবাবু। অনেকরকম এলোমেলো চিন্তা করছেন তিনি, এ বয়েসে নতুন করে কী-ই বা করবেন? কী-ই বা করতে পারেন? কবিতা লেখা, গান করা এসব কোনওদিনই তার ধাতে আসে না। আর তা ছাড়া, সেটা এ বয়েসে আরম্ভ করাও খুব হাস্যকর দেখাবে। অনেকে দেখা যায় রিটায়ার করে রাজনীতি করতে নামে। সমাজসেবার অজুহাতে এ দল কি ও সঙেঘ নাম লেখায়। না সে সমস্তও রমেশবাবুর দ্বারা হবে না। ধর্মকর্মেও তেমন আস্থা বা মন নেই তাঁর।
কিন্তু কিছু একটা তো করতে হবেই। জীবনটাকে একটু বাজিয়ে দেখা, একটু চেখে দেখা, এই তো শেষ সুযোগ। এরপর ক্রমশ বুড়ো, অথর্ব হয়ে যাবেন। তার আগে…..
এদিকে ভোরবেলার সেই পুরনো পাখার ঘোঁঙর ঘোঁ, ঘোঁঙর ঘোঁ ডাকটা এখনও তাঁর কানে লেগে রয়েছে। মাথার মধ্যে ঘুরছে। সত্যিই সামান্য একটা ব্যাঙের ডাক কতকাল তিনি শোনেননি। একটা ব্যাঙ চোখে পর্যন্ত দেখেননি।
তিনি এতকাল চাকরি করেছেন বন্যপ্রাণী ও পশুপালন অধিকারে। সেখানে সাপ কুমির, বাঘ-সিংহ, গোরু-ছাগল এমনকী হাঁস-মুরগি পর্যন্ত কত রকম সব কত নোট তাকে লিখতে হয়েছে, চিঠি ড্রাফট করতে হয়েছে।
কিন্তু ব্যাঙ, না ব্যাঙের কথা ফাইলপত্রে কখনও উঠেছে বলে মনে পড়ছে না। অনেকদিন আগে বিদেশে ব্যাঙ রপ্তানি প্রসঙ্গে একটা নথি তাঁর কাছে এসেছিল, সেটাও তিনি দেখে শুনে বাণিজ্য দপ্তরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
এরই মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে গোলদীঘি, মেডিক্যাল কলেজ পার হয়ে বউবাজারের মোড়ে চলে এসেছেন রমেশবাবু।
ব্যাঙের ব্যাপারটা মাথার মধ্যে ঘুরছে আর ঘুরছে। ঘোঁঙর ঘোঁ, ঘোঙর ঘোঁ।
অবশেষে বউবাজারে ভীমনাগের সন্দেশের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে রমেশবাবু ঠিক করলেন তা হলে ব্যাঙ দিয়েই নতুন জীবনটা শুরু হোক। অনেকদিন পরে আজ কোথাও গিয়ে একটা ব্যাঙ দেখে আসি।
কাছে পিঠের মধ্যে সেই প্রাচীন গড়ের মাঠ রয়েছে। আজ সকালে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। নিশ্চয়ই সেখানে অনেক ব্যাঙ দেখতে পাওয়া যাবে। হয়তো ডাকও শোনা যাবে।
রাস্তা ক্রশ করে উলটো দিকের ফুটপাথে চলে এলেন রমেশবাবু। সেখানে বাসস্টপে গিয়ে একটা টু বি দোতলা বাসে চেপে বসলেন তিনি।
সকালবেলায় বাসে তেমন ভিড় নেই। এখন প্রায় সাড়ে সাতটা বাজে। আর ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ট্রামে বাসে ভিড় বাড়তে থাকবে। এর মধ্যেই ময়দান থেকে ঘুরে আসবেন তিনি।
থিয়েটার রোডের মোড়ে বাস থেকে নেমে বিড়লা তারামণ্ডলের ওপাশ থেকে সরাসরি ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে ঢুকলেন।
সকালবেলায় বৃষ্টির জলে এখনও ছপছপ করছে মাঠটা। এখনও কিছু কিছু লেট ভ্রমণকারী মাঠে মুক্ত বায়ু সেবন করছে। মাউন্ট পুলিশের গোটা দশ-পনেরো অশ্বারোহী চক্রাকারে পাক খাচ্ছে। বোধহয় তাদের ট্রেনিং হচ্ছে।
অনেক আশা নিয়ে এসেছিলেন রমেশবাবু। কিন্তু পুরো মাঠটা তন্ন তন্ন করে খুঁজেও একটা ব্যাঙ দেখতে পেলেন না। বোধহয় ঘোড়ার উপদ্রবে ব্যাঙেরা লুকিয়েছে৷
কিন্তু লুকোবে কোথায়?
মাঠটা কোনাকুনি ক্রশ করে যেখানে মোহনবাগান ক্লাবের ঘেরা মাঠের পেছনে ফোর্টের গা ঘেঁষে একটা নয়ানজুলি রয়েছে সেখানে উঁকি দিলেন রমেশবাবু। বৃষ্টির জলের স্রোত তরতর করে বয়ে যাচ্ছে ড্রেনটা দিয়ে সেখানে উঁকি দিয়ে দেখলেন রমেশবাবু, কিন্তু ব্যাঙের কোনও চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না।
একজন সদাশয় প্রকৃতির স্বাস্থ্যবান মধ্যবয়সি ভদ্রলোক, পরনে ট্রাকস্যুট, চেহারাটা কেমন চেনাচেনা, প্রচুর ঘেমেছেন, মাঠের মধ্য দিয়ে আসছিলেন। ওপাশের রাস্তার ওপরে তার গাড়িটা রয়েছে, সেটায় উঠতে যাবেন তিনি, রমেশবাবুকে উবু হয়ে ড্রেনে উঁকি দিতে দেখে এগিয়ে এলেন, সহৃদয় কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন, কিছু হারিয়েছে আপনার?
গলার স্বর শুনে এবং চেহারার আদল দেখে রমেশবাবুর খেয়াল হল টিভি-তে দেখেছেন এঁকে, ইনি হলেন পি কে। পি কে ব্যানার্জি-ফুটবলের নামজাদা কোচ, অতীতের দিকপাল ফুটবল প্লেয়ার।
কী আর বলবেন রমেশবাবু, থতমত খেয়ে বোকার মতো বলে বসলেন, ব্যাঙ, ব্যাঙ খুঁজছিলাম।
পি কে সহানুভূতির স্বরে বললেন, ব্যাঙ কি আর পাবেন এসব জায়গায়। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে দেখুন, সেখানে প্রচুর আছে। এখনও দুচারটে থাকতে পারে।
তারপর একটু থেমে নিজের গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে পি কে বললেন, আমি তো আমার ছেলেদের ব্যাঙ ধরে খেতে বলি। প্রোটিন আছে, সুস্বাদু। কিন্তু কে কার কথা শোনে? শুধু টোস্ট আর ওমলেট খেয়ে কি ফুটবল খেলা হয়। এইভাবেই বাঙালি গেল।
পি কে চলেগেলেন। প্রায় এক কিলোমিটার উজিয়ে অতঃপর রমেশবাবু যখন ভিক্টোরিয়া উদ্যানে প্রবেশ করলেন, তখন রোদ্দুর বেশ চড়ে গেছে। দুচার জোড়া প্রেমিক-প্রেমিকা ছাড়া ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল প্রায় শুন্য। সকালবেলার সেই হিমভাব বাতাসে নেই, বরং রীতিমতো গরম লাগছে, ঘাম হচ্ছে।
পি কের পরামর্শ কিন্তু কাজে লাগল না। ভিক্টোরিয়ার আনাচে কানাচে অনেক ঘোরাঘুরি করে পুকুরগুলোর পাড়ে এখানে ওখানে উঁকিঝুঁকি দিয়ে একটিও ব্যাঙ নজরে এল না রমেশবাবুর। বরং বেশি অনুসন্ধিৎসু হতে গিয়ে গাছের আড়ালে, ঝোঁপের ভিতরে প্রেমিক যুগলদের অবিশ্বাস্য সব অশালীন দৃশ্য তার চোখে পড়ল। এখন মানে মানে এখান থেকে বেরিয়ে পড়তে পারলেই রক্ষা। উত্তরের দিকের গেট দিয়ে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে প্রবেশ করেছিলেন রমেশবাবু, অবশেষে ঘর্মাক্ত, ক্লান্ত, নিরাশ অবস্থায় উত্তরের গেট দিয়ে লোয়ার সার্কুলার রোডের শেষ প্রান্তে এস এস কে এম হাসপাতালের মুখে বেরিয়ে এলেন।
