অধ্যাপক বুঝলেন এরা কলকাতার ছেলে, জন্মেও ব্যাঙ দেখেনি, তাই তিনি শুদ্ধ ভাষায় বোঝানোর চেষ্টা করলেন, বেঙ বুঝলে না? বেঙ হল ভ্যাক।
.
শয্যাত্যাগ করে উঠে কলঘরের দিকে যেতে যেতে আজ অনেকদিন পরে এই বাজে গল্পটা মনে পড়ল রমেশচন্দ্রের। সেই সঙ্গে হঠাৎ তার খেয়াল হল আজ প্রায় বিশ-পঁচিশ বছর বা তারও বেশি সময় তিনি কোনও ব্যাঙ দেখেননি।
এই হাতিবাগান-শ্যামবাজারি কলকাতায় ব্যাঙ আর কোথা থেকে আসবে। কলকাতার বাইরে বিশেষ বেরোনো হয় না। মধ্যে দুবার পুরী আর একবার দিল্লিতে গিয়েছিলেন। কিন্তু যতদূর মনে পড়ছে। সেসব জায়গাতেও কোনও ব্যাঙ দেখেননি।
ব্যাঙ সত্যি দেখতে কেমন মনে করার চেষ্টা করলেন রমেশবাবু। মনে পড়ছে, ভালই মনে পড়ছে। সেই ছোটবেলায় যুদ্ধের সময়ে বোমার ভয়ে কলকাতা থেকে পালিয়ে এই হরি সেন স্ট্রিটের বাড়িতে তালা দিয়ে তাদের বাড়িসুদ্ধ সবাইকে তার বাবা কুষ্টিয়ার একটা গ্রামে দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়িতে রেখে এসেছিলেন। নিজে ফিরে এসে একটা মেসে উঠেছিলেন, তারও ছিল সরকারি চাকরি। চাকরির জন্যেই ফিরে আসতে হয়েছিল তাঁকে।
প্রায় পঞ্চাশ বছর আগের কথা এসব। কিন্তু কুষ্টিয়ার সেই ছোট জোলো গ্রাম হরিনাথপুরের স্মৃতি এখনও অম্লান রয়ে গেছে রমেশবাবুর মনে।
বাবা! কতরকম যে ব্যাঙ ছিল হরিনাথপুরে!
নামগুলো এখনও মনে আছে। সোনা ব্যাঙ, কোলা ব্যাঙ, কুনো ব্যাঙ, চুনো ব্যাঙ, রাজা ব্যাঙ, বাবু ব্যাঙ।
নামগুলো মনে রয়েছে কিন্তু সবরকম ব্যাঙের চেহারা এখন আর মনে নেই। শুধু মনে আছে সোনা ব্যাঙের গায়ে সত্যি একটা সোনালি আভা ছিল, বিশেষ করে চোখের নীচে আর গলার কাছে, বৃষ্টির দিনের রোদ সোনা ব্যাঙের গায়ে পড়লে ঝলমল করে উঠত তাদের শরীর।
আর বাবু ব্যাঙের কথাও মনে আছে।
কেন যে সেগুলোকে বাবু উপাধি দেওয়া হয়েছিল সেই অল্প বয়েসে ধরতে পারেননি রমেশচন্দ্র। এখন, এতকাল পরে চেহারাটার আভাস মনে আসছে তার, গোবদা গোবদা পা, লম্বা নাক, গোল চোখের মণির চারধারে কৃষ্ণবলয় ঠিক যেন পণ্ডিতি চশমা। বারান্দা দিয়ে কলকাতার দিকে যেতে যেতে রমেশবাবু পঁয়তাল্লিশ বছর পরে আজ বুঝতে পারলেন কেন ওই ব্যাঙগুলোকে বাবু বিশেষণে ভূষিত করা হয়েছিল।
.
মাত্র পাঁচ মিনিট আগেই হরি সেন স্ট্রিটের ব্যাঙের ডাকের রহস্যটা উত্তীর্ণ হয়েছেন রমেশবাবু।
ব্যাঙটা ঘরেও ডাকছে না, বাইরেও ডাকছে না। গত একশো বছর কিংবা দেড়শো বছর হরি সেন স্ট্রিটে, হরি সেন স্ট্রিটের আশপাশে কোথাও কোনও ব্যাঙ ডাকেনি। অথবা আরও হয়তো আগে থেকে। সেই যে বছর মারাঠা ডিচ খোঁড়া হয়, আদি কলকাতা আর চড়কডাঙা, জেলেপাড়া, কলুটোলা, হাতিবাগান আর শ্যামবাজার-চিৎপুরের সব ব্যাঙ নাকি পালিয়ে গিয়ে মারাঠা ডিচে আশ্রয় নেয়। তারপরে আর সদর শহরে একটাও ব্যাঙ দেখা যায়নি।
বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে যে ব্যাঙের ঘোঁঙর ঘোঁ ঘোঁঙর ঘোঁ ডাক শুনেছিলেন রমেশবাবু একটু পরেই বুঝতে পেরেছিলেন সেটা বেরুচ্ছে পুরনো ওই চার ব্লেডের ডি সি পাখার ভেতর থেকে। বহুদিন অয়েল করা হয়নি। কোনওরকম মেরামতিও হয়নি–পাখাটা আর চলতে পারছে না। ওই রকম করুণ আর্তনাদ করে প্রতিবাদ জানাচ্ছে কিংবা সদ্য অবসরপ্রাপ্ত রমেশবাবুর কাছে সে অবসর প্রার্থনা করছে। তারও তো অনেকদিন হয়ে গেল।
রমেশবাবুর চেয়ে বেশিই।
আস্তে উঠে রমেশবাবু ঘরের দেয়ালের কাছে গিয়ে পাখার সুইচটা অফ করে দিলেন। ঘোঁঙর ঘোঁ শব্দটা বন্ধ হয়ে গেল।
বাইরে বৃষ্টিটাও প্রায় থেমে এসেছে। এখন আর বৃষ্টির আওয়াজে সেই শোঁ শোঁ ভাবটা নেই। ঝিরঝির করে অল্প বৃষ্টি হচ্ছে। উত্তর থেকে একটু ঠান্ডা হাওয়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এ বছর শীতটা একটু তাড়াতাড়ি এসে গেল। এই বৃষ্টিটাই এনে দিল।
কলতলা থেকে ফিরে এসে রমেশবাবুর চা খাওয়ার কথা খেয়াল হল। অন্যদিন হলে এতক্ষণ কাজের মেয়েটা চা দিয়ে যেত কিন্তু তিনি নিজেই কাল বারণ করে দিয়েছেন এত সকালে চা দিতে। একটু পরে বৃষ্টিটা থামতে রমেশবাবু ছাতাটা নিয়ে রাস্তায় বেরলেন কাছে পিঠে কোনও একটা ফুটপাথের দোকানে এক কাপ চা খেয়ে নেবেন।
অফিস বা বাড়ির বাইরে বহুকাল কোনও দোকান-টোকানে চা খাননি রমেশচন্দ্র। পাড়ার মোড়ের দুদিকে দুটো চায়ের দোকান রয়েছে। কেমন যেন সংকোচ হল রমেশবাবুর সেসব দোকানে চা খেতে। পুরনো পাড়া, আশপাশে অনেক চেনাজানা লোক। রাস্তায় কোথাও কোথাও এরই মধ্যে জল জমে। গিয়েছে, কাদাও যথেষ্ট। কোনও রকমে ধুতিজুতো বাঁচিয়ে সামনের দিকে কলেজ স্ট্রিটের বরাবর ট্রামরাস্তা ধরে ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলেন রমেশবাবু।
বিবেকানন্দ রোড পার হয়ে ঠনঠনের কালীমন্দিরের উলটোদিকে একটা রাস্তার চায়ের দোকানে কাঠের বেঞ্চিতে বসে একটা সস্তার কেক আর পরপর দু কাপ চা খেলেন তিনি।
চা খাওয়া হয়ে যেতে দোকানের পয়সা মিটিয়ে হাতের হাতঘড়িতে রমেশবাবু দেখলেন সবে সোয়া ছয়টা বাজে। অফিস নেই, বাড়ি ফেরার তাড়া নেই। হাতে অঢেল সময়। এদিকে বৃষ্টি থেমে গেছে, মেঘও বিদায় নিয়েছে। গলিখুঁজির ফাঁক দিয়ে সূর্যের হালকা আলো রাস্তায় এসে পড়ছে। এই ভোরবেলাতেই ফুটপাথের গর্তের ঘোলাজলে দুটো কাক মাথা ডুবিয়ে স্নান করছে।
