রমেশবাবু ঠিক করেছিলেন অবসরের পরের দিন থেকেই জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ বদলিয়ে ফেলবেন। আজ সকালে সাড়ে সাতটার আগে কিছুতেই ঘুম থেকে উঠবেন না। কিন্তু আজও সেই সাত সকালে ঘুম ভেঙে গেল।
রমেশবাবু তবু বিছানা আঁকড়িয়ে পড়ে রইলেন, জানলা দিয়ে বাইরে থেকে ফিকে আলো আসছিল, গায়ে একটা পাতলা চাদর ছিল, সেটা দিয়ে মুখ ঢেকে নিলেন এবং যে কোনও কারণেই হোক এই অবস্থায় তাঁর একটু হালকা তন্দ্রার মতো ভাব এল। কিন্তু বেশিক্ষণ নয় মাত্র দশ-পনেরো মিনিট পরেই তিনি পুরো জেগে উঠলেন।
এতদিনের অভ্যেস একদিনে কি যাবে? তন্দ্রা কেটে যেতে রমেশবাবুর প্রথমেই মনে পড়ল, আজকে সাড়ে সাতটা পর্যন্ত বিছানায় শুয়ে থাকার কথা তার। বাড়ির কাজের মেয়েটা প্রত্যেকদিন সকাল পাঁচটা থেকে সাড়ে পাঁচটার মধ্যে তাকে এক কাপ চা আর দুটো ক্রিম ক্র্যাকার বিস্কুট দেয়। কাল রাতেই তিনি ভ্রাতুস্পুত্রবধূকে বলে দিয়েছেন, বউমা, কাল থেকে এত সকালে আমাকে চা দিতে বারণ কোরো। আমি বেলায় উঠে নিজেই চেয়ে নিয়ে চা খাব।
কিন্তু অন্যদিনের মতো আজও একই সময়ে, কিংবা হয়তো একটু আগেই ঘুম ভেঙে গেছে। রমেশচন্দ্রের। তারপরে তন্দ্রাও মাত্র মিনিট দশেকের। যদিও এটা কার্তিক মাস। হাওয়ায় একটা হিমেল ভাব, শেষরাতে একটু ঠান্ডা থাকা উচিত। কিন্তু ঘুম ভাঙতে রমেশচন্দ্র বুঝতে পারলেন গরম লাগছে, কপালে, পিঠে একটু ঘাম। কানের লতির নীচে একটু উষ্ণভাব। যে চাদরটা দিয়ে মুখ ঢেকে আলো এড়াচ্ছিলেন, সেটা একটা পাতলা মুগার চাদর। সেটা এবার সরিয়ে দিলেন রমেশচন্দ্র। একটু স্বস্তি হল।
হরি সেন স্ট্রিটের এই একতলার উত্তর-পশ্চিম মুখের বাইরের ঘরটা চিরদিনই খুব গুমোট। বারো ফুট গলি, চারপাশে সব দোতলা-তিনতলা বাড়ি হাওয়া আসবে কোত্থেকে?
হয়তো এই সব কারণেই কলকাতা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কর্পোরেশন, যাকে সময় লাঘবের জন্যে ব্যস্তলোকেরা বলেন সিইএসসি, যাঁদের প্রথম বিদ্যুৎ গছাতে পেরেছিলেন তাদের মধ্যে হরি সেন স্ট্রিটের নাগরিকেরা অন্যতম।
কাঠের চার ব্লেডের একটা আদ্যিকালের ডি সি পাখা এ ঘরে রয়েছে, সেটার বয়েস ষাট-সত্তর হওয়া মোটেই আশ্চর্য নয়। রমেশবাবু নিজে জন্ম থেকেই সেটা দেখছেন।
আকাশে বোধহয় খুব মেঘ করেছে। চারদিকে কেমন একটা চাপা ভাব। এ ঘরের পাখাটা পারতপক্ষে রমেশবাবু ব্যবহার করেন না। কিন্তু আজ কী মনে হল, তিনি বিছানা থেকে উঠে পাখাটা চালিয়ে দিলেন।
পুরনো পাখাটা প্রায় দিন পনেরো বন্ধ ছিল। পরশুদিন জগদ্ধাত্রী পুজো গেছে। প্রত্যেক বছরই নিয়ম করে কালীপুজোরপরে পাখাটা চালানো বন্ধ করে দেন রমেশবাবু। এবারেও তাই করেছেন।
আজ এই সকালে পাখাটার সুইচ অন করে দিতে পাখাটা কিন্তু স্টার্ট নিল না। অনেক সময় এরকম হয়, পুরনো পাখা কিছুদিন বন্ধ থাকলে চালু হতে সময় নেয়।
এ রোগের চিকিৎসা রমেশবাবুর জানা আছে। ঘরের কোনায় দেয়ালের সঙ্গে ঠেস দেওয়া একটা বেতের লাঠি আছে, সেই লাঠিটা নিয়ে পাখার ব্লেডে লাগিয়ে জোরে একটা ধাক্কা দিলেন তিনি।
পাখাটা আস্তে আস্তে ঘুরতে লাগল। ঠান্ডা হাওয়ায় আরাম পেলেন রমেশবাবু, আবার বিছানায় ফিরে গিয়ে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লেন।
এবার সত্যিসত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুম ভাঙল ব্যাঙের ডাকে আর বৃষ্টির শব্দে।
একটু ঠান্ডাও লাগছিল। বিছানার ওপর উঠে বসলেন রমেশবাবু। সারা রাতের গুমোট কেটে গিয়ে এই ভোরবেলায় প্রবল বৃষ্টি নেমেছে। বৃষ্টির তোড়ের শোঁ শোঁ শব্দ তারই মধ্যে ঘোঁঙর ঘোঁ ঘোঁঙর ঘোঁ ব্যাঙের ডাক স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।
ঘুমের ঘোর কেটে যেতে রমেশবাবু খেয়াল করলেন কার্তিক মাসে কলকাতায় এমন বৃষ্টি কিছুটা অস্বাভাবিক হলেও একেবারে অসম্ভব নয়। কোনও কোনও বছর এরকম হয়।
কিন্তু ব্যাঙ? এই গহন শহরে হরি সেন স্ট্রিটে ব্যাঙ এল কোথায়। কোনওদিন তো এ অঞ্চলে ব্যাঙ দেখেননি রমেশবাবু।
কিন্তু মনে হচ্ছে খুব কাছেই ডাকছে ব্যাঙটা।
রমেশবাবু প্রথমে ঘরের মধ্যে, তারপর জানলা দিয়ে ঘরের বাইরে চোখ মেলে ব্যাঙটাকে খুঁজতে লাগলেন।
০২. একটি প্রক্ষিপ্ত প্রসঙ্গ: ব্যাঙ কী ও কেন?
গল্পটা পুরনো। কিন্তু ব্যাঙ নামের কাহিনিতে গল্পটা না লিখে উপায় নেই।
বিপিন পাল কলেজে বাংলা পড়াতেন এক ভদ্রলোক। অধ্যাপকের পৈতৃক বাটি ময়মনসিংহে, মাতুলালয় বাখরগঞ্জে।
[কী বলছেন, কী?
বিপিন পালের নামে কোথাও কোনও কলেজ নেই? সুরেন ব্যানার্জি থেকে হীরালাল পাল পর্যন্ত সকলের নামে কলেজ আছে কিন্তু মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় বিপিন পাল অ্যাবসেন্ট, অনুপস্থিত। বিপিন পাল বাদ?
ভাবা যায়?]
সে যাক। ধরে নিচ্ছি, বিপিন পালের নামে না থাকলেও অন্য কোনও নামের একটা কলেজে এক বাংলার অধ্যাপক ছিলেন, যার উচ্চারণে দেশজ টান ছিল যথেষ্ট প্রবল।
তিনি বৈষ্ণব কবিতা পড়াচ্ছিলেন, সেই যেখানে বর্ষার কথা আছে, মত্ত দাদুরীর কথা আছে। ছাত্রেরা স্বভাবতই দাদুরী মানে কী জানতে চাইল।
অধ্যাপক মহোদয় বললেন, সে কী তোমরা দাদুরী মানেও জান না। দাদুর মানে হল বেঙ, দাদুরী মানে হল মহিলা বেঙ।
ছাত্রদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো বুঝল ব্যাপারটা, কিন্তু অনেকেই তখন মজা পেয়ে গেছে, তারা সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠল, বেঙ কী স্যার?
