মকদমপুরের জমিদার খান মফিজউদ্দিন তালুকদার বাহাদুরের একটাই দোষ, সেই দোষটা মুদ্রাদোষ। তিনি কথায় কথায় বেশ-বেশ বলেন। কেউ হয়তো বলল, গ্রামে খুব ওলাওঠা হয়েছে। তিনি চিন্তিত মুখে বললেন, বেশ-বেশ। আবার খবর এল বাঁধ ভেঙে বর্ষার নদীর জল গ্রামের মধ্যে ঢুকছে, তিনি বললেন, বেশ-বেশ। এমনকী নিজের কাকিমার মৃত্যুসংবাদ শুনেও তিনি নাকি বলেছিলেন, বেশ-বেশ।
পাঠান ব্যবসায়ীরা তখনকার দিনে গ্রামে গ্রামে ঘোড়া নিয়ে ঘুরে বেড়াত বিক্রির জন্য। তারা খুবই চতুর ব্যবসায়ী, অনেক রকম খোঁজখবর রাখে। মফিজউদ্দিনের বেশ-বেশ মুদ্রাদোষের কথা জেনে তারা একটি টগবগে, সাদা আরবি ঘোড়াকে এক বছর ধরে তালিম দিয়েছে।
মফিজ সাহেব ঘোড়াটি দেখে খুবই উৎসাহিত। তারপরে যখন শুনলেন পিঠে উঠে তার প্রিয় বাক্য বেশ-বেশ বলে লাগাম টান দিলেই ঘোড়া ছুটতে থাকবে, তিনি এক লাফে ঘোড়ার ওপরে চেপে বেশ-বেশ বললেন। সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়া বিদ্যুৎবেগে ছুটতে লাগল।
পাঠান বিক্রেতা এতটা ভাবেনি। সে দ্রুত ধাবমান অশ্বের পিছনে চেঁচিয়ে বলল, ঘোড়া থামানোর জন্যে ব্যস ব্যস করবেন! অশ্বারোহী মফিজ ভুল শুনে ভাবলেন থামানোর জন্যেও বেশ-বেশ বলতে হবে।
অল্প কিছুদুর যাওয়ার পর ঘোড়া থামানোর জন্যে মফিজ সাহেব বেশ-বেশ বললেন। ঘোড়া আরও জোরে ছুটতে লাগল। লাগাম টেনে আবার তিনি ঘোড়াকে বললেন, বেশ-বেশ। ঘোড়া আরও দ্রুতগামী হল।
ইতিমধ্যে পাঠান ঘোড়াওলাদের একজন অন্য একটি ঘোড়া ছুটিয়ে মফিজ সাহেবের পাশাপাশি গিয়ে চলমান অশ্বোপরি মফিজ সাহেবকে জানাল, হুজুর, ঘোড়া থামানোর জন্যে ব্যস, ব্যস বলতে হবে।
ততক্ষণে ঘোড়া ছুটতে ছুটতে মকদমপুরের সীমানায় পরিখার কাছে এসে গেছে, এর পরেই চল্লিশ ফুট নীচে পদ্মবিল। শেষ মুহূর্তে ব্যস ব্যস বলে ঘোড়া থামালেন মফিজউদ্দিন। পরিখা প্রাচীরের ঠিক সামনে থমকে দাঁড়াল ঘোড়া। আশ্বস্ত হয়ে মুদ্রাদোষ বশত সহসা বেশ-বেশ বললেন মফিজ সাহেব। সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষিত অশ্ব পরিখা প্রাচীর লাফিয়ে আরোহীসহ ঝাঁপিয়ে পড়ল পদ্মবিলে।
সেবার অশ্ব ব্যবসায়ীদের একটি অশ্ব ক্ষতি হয়েছিল। আর মকদমপুরের অধিবাসীরা তাঁদের জমিদারকে হারিয়েছিলেন।
ব্যাঙ
প্রত্যেকদিন যেরকম হয়, আজও তাই হল। ভোরবেলা, খুব ভোরবেলা সাড়ে চারটে-পাঁচটা নাগাদ ঘুম ভেঙে গেল রমেশবাবুর।
অথচ এরকম কথা ছিল না।
গতকালই চাকরি থেকে রিটায়ার করেছেন রমেশবাবু, রমেশচন্দ্র রায়। পাকা তেত্রিশ বছর আটমাস এগারো দিন বন্যপ্রাণী ও পশুপালন অধিকারে এক নাগাড়ে চাকরি করেছেন তিনি। এর মধ্যে প্রথম কয়েকবছর নিম্নবর্গীয় এবং উচ্চবর্গীয় কেরানির পদে, তারপরে বাকি জীবন ছোট বড়বাবু এবং বড়। বড়বাবু হয়ে। বিপত্নীক রমেশবাবু তাঁদের সাবেকি পৈতৃক বাড়ির অর্থাৎ হাতিবাগানে হরি সেন স্ট্রিট এবং হেমেন্দ্র ঘোষ রোডের উত্তর-পশ্চিম মোড়ের দ্বিতীয় বাড়ির বাইরের ঘরে একাই থাকেন। বাড়ির মধ্যে ভাই-ভাইবউ, ছেলে-ছেলের বউ, ভাইপো, ভাইঝি একটা ছোট নাতনি ইত্যাদির বসবাস।
বছর দশেক আগে, স্ত্রী মারা যাওয়ার পরে পরেই বাড়ির মধ্য থেকে এই বাইরের ঘরে সরে আসেন রমেশবাবু। তারপর থেকেই সংসারের সঙ্গে তার একটু আলগা আলগা সম্পর্ক। মাসকাবারি সংসার খরচের টাকাটা ভাইবউয়ের হাতে তুলে দিয়ে তার শেষ। মাঝেমধ্যে ছোট নাতনিটা তাঁর কাছে এসে ঘুর ঘুর করে, খুব মিষ্টি হয়েছে মেয়েটা। মুখের উঁচটা ধরে ঠাকুমার মতো।
পরলোকগতা স্ত্রীর কথা স্মরণ হতে একটু উদাস হয়ে যান তিনি। কিন্তু নাতনিটাকে খুব পাত্তা দেন না। আর মায়া বাড়াতে চান না। এসব অবশ্য অবান্তর কথা। ব্যাঙের ঘটনার সঙ্গে খুব প্রাসঙ্গিক নয়। কিন্তু গল্পোপম ছোট গল্প লিখতে গেলে অনেক আশেপাশের কথা লিখতে হয়, সেটাই নাকি নিয়ম।
আসল কথা হল, বন্যপ্রাণী ও পশুপালন অধিকারের বড়বাবু রমেশচন্দ্র রায় গতকাল রিটায়ার করেছেন। তিনি মনে মনে স্থির করেছেন, এবার একটু বহির্মুখী হতে হবে। এতদিন বাড়ির ব্যাপারে আলগা দিয়েছেন, এবার অফিসও আলগা হয়ে গেল। এবার জিরানোর সময় এসেছে।
তবে শুধু জিরানো নয় সেই সঙ্গে বাইরের পৃথিবীটাকে, জগৎ সংসারকে একটু দেখতে হবে।
সেই নাইনটিন ফিফটি সিক্স, পৌনে তিন টাকায় এক সের মাংস, মিঠে পান তিন পয়সা, বাংলা পান দু পয়সা, একটা আইসক্রিম সোডা তিন আনা, পাইস হোটেলে ভাত-ডাল-ভাজা-তরকারি-মাছ দুবেলা তিরিশদিন মাসে সাড়ে আটাশ টাকা। রমেশচন্দ্রের মনে পড়ছে বাটা কোম্পানি সেই প্রথম হাওয়াই চটি বাজারে বার করল, দাম সাড়ে ছয় টাকা। দাম শুনে চমকে গিয়েছিলেন রমেশবাবু, তখন কলকাতা-ধানবাদ রেলগাড়িতে যাতায়াতি টিকিটের দাম সাত টাকা। এসব পুরনো কথা মনে করে দুঃখ করার লোক নন রমেশবাবু। তিনি সরকারি অফিসের বড়বাবু ছিলেন, রীতিমতো বাস্তববুদ্ধি সম্পন্ন লোক। তিনি জানেন, যেসব সময় গেছে সে আর ফিরে আসবে না তবে অন্য সময় আসছে, সামনে পড়ে রয়েছে অঢেল ফাঁকা সময়। সে সময়টার সদ্ব্যবহার করতে হবে।
এতদিন পর্যন্ত বড় কষ্টে, বড় পরিশ্রমে কেটেছে। অফিসে হাড়ভাঙা খাটুনি, বিশেষ কোনওদিন ছুটিছাটা নেওয়া হয়নি। সে যাওবা আগে নিয়েছেন, সেও সংসারের দরকারে, সে সময় পরিশ্রম হয়েছে। আরও বেশি।
