জটিরামবাবার যত বয়েস ততবার নামজপ করতে হয়। সামনের বছর একশো বারো বার। তারপর একশো তেরোবার। এইভাবে ক্রমশ জটিরামবাবার বয়সের সঙ্গে সঙ্গে জপসংখ্যা বেড়ে যাবে। দম বন্ধ করে যারা এতবার জটিবাবা জটিবাবা করতে পারবে না তাদের জন্যে সহজ সমাধান আছে, জপসংখ্যার সম পরিমাণ টাকা জটিরামবাবার আশ্রমে দিয়ে এলেই সেখানে বিপদমোচন যজ্ঞ অবিলম্বে করে ভক্তকে উদ্ধার করা হয়।
তবে জটিরামবাবার চেয়ে মধুমিতার অনেক বেশি সর্বনাশ করেছেন মধুমিতার পিসি সর্বজয়া।
গত বছর অনাদিকে অফিসের কাজে মাস ছয়েক দিল্লিতে থাকতে হয়েছিল। তখন খালি বাড়িতে এসে মধুমিতার কাছে বিধবা সর্বজয়া থাকেন। তিনি মধুমিতার মনের কুসংস্কারের ঝোঁপঝাড়ে বেশ কয়েকটি বিষধর সাপ ছেড়ে দিয়েছেন।
হাঁচি-কাশি, মঘা-অশ্লেষা-ব্র্যহস্পর্শ থেকে শেয়াল বাঁ হাতি, ডান চোখ নাচা যা কিছু বিধি নিষেধ, ভয়ভীতি সম্ভব সর্বজয়া তার এক এনসাইক্লোপিডিয়া। তিনি শুধু এ সমস্ত জানেন তা নয়, রীতিমতো মানেন এবং ভাইঝিকেও রপ্ত করে দিয়ে গেছেন। সর্বজয়ার ছেড়ে যাওয়া বিষধর সাপগুলি আজকাল সময় পেলেই মধুমিতাকে দংশন করে এবং মধুমিতা আনাদ করে ওঠে।
ক্রমশ মধুমিতার এই আর্তনাদের ব্যাপারটা বেশ নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই তো গত রবিবার দুপুরে বাথরুম থেকে স্নান করে বেরিয়ে বারান্দায় রোদ্দুরে ভেজা হাওয়াই চটি জোড়া উলটিয়ে শুকোতে দিয়েছিল অনাদি। ব্যাপারটা যে কতখানি অমঙ্গলজনক সে বিষয়ে অনাদির কোনও ধারণা ছিল না। প্রত্যেক রবিবারই ও কাজটা সে করে থাকে, ঠিক এ সময়টায় মধুমিতার বারান্দায় যাওয়ার দরকার পড়ে না। তাই তার চোখে পড়েনি এর আগে। কিন্তু সেদিন একটা খারাপ দিন ছিল। দুদিন পরে পৌষমাস পড়ে যাচ্ছে, তার আগে ফুলঝাড়ু কিনতে হবে তাই ওই রবিবার বারবার সব কাজ ফেলে মধুমিতা বারান্দায় যাচ্ছিল রাস্তা দিয়ে কোনও ফুলঝাড়ওয়ালা যায় কি না দেখার জন্য। সেই সময়ে একবার বারান্দায় গিয়ে দেখে ওলটানো চটি, সঙ্গে সঙ্গে মধুমিতার আর্তনাদ, সর্পদংশনের আর্তনাদ।
আগে পাড়ার লোকেরা এরকম আর্তনাদ শুনলে রুদ্ধশ্বাসে ছুটে আসত। অনেকে সন্দেহের দৃষ্টিতে অনাদির দিকে তাকাত। কখনও কলিক পেন, কখনও লামবাগের টান এইসব বলে অনাদি মধুমিতার আর্তনাদের ব্যাখ্যা দিতে চেয়েছে। কেউ বিশ্বাস করেছে, কেউ করেনি। কিন্তু সবাই যে যার বোঝার বুঝে গেছে, এখন আর কেউ ছুটে আসে না।
তবু বিবাহিতা স্ত্রী বলে কথা। অনাদিকে একবার যেতেই হয়। আজও কাফকার জগৎ থেকে নিজেকে আপাতত বিচ্ছিন্ন করে অনাদি দ্রুতপায়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল। কিছুক্ষণ আগে রান্নাঘরের মেঝেতে বাজারের ব্যাগ নামিয়ে এসেছিল, নিশ্চয়ই তার মধ্যে কোনও অনাচার ধরা পড়েছে।
সত্যিই তাই।
সন্ত্রস্ত পদে রান্নাঘরের দরজায় পৌঁছে অনাদি দেখল মধুমিতা কপালে করাঘাত করছে মেঝেতে বসে। ব্যাগের তরকারি আলু, বেগুন, বরবটি, শিম, কড়াইশুটি গড়াগড়ি যাচ্ছে। সর্বোপরি অনেক কষ্টে, অনেক বেছে কিনে আনা একটা বড় মর্তমান কলার মোচা। একটু পরে অনেক চেষ্টা করে অনাদি মধুমিতার কাছ থেকে যা উদ্ধার করতে পারল তার মানে শনিবারে, মঙ্গলবারে কেউ মারা গেলে তার শবদেহের সঙ্গে মোচা দিতে হয়। সুতরাং শনিবারে মোচা নিয়ে আসার পরিণাম মর্মান্তিক। মাসখানেক আগে ঠিক একই ঘটনা ঘটেছিল।
হালকা নীল রঙের এক নম্বর ফুটবলের মতো সাইজের গোল গোল বেগুন অনাদির এক বন্ধু তাদের দেশের বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছিল অফিসে, পুরো এক থলে। তার থেকে দুটো তাকে দিয়ে বলেছিল, ভেজে কিংবা পুড়িয়ে খাবি।
সেদিন অফিস থেকে বাড়ি ফিরে অনাদি মধুমিতাকে বলেছিল, একটা বেগুন ভাজবে, অন্যটা পোড়াবে।
সেই কথা শুনে মধুমিতা কপাল চাপড়িয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল, সেদিন তার জন্মবার, সোমবার। জন্মবারে বেগুন পোড়ানো যায় না, পোড়ানোর পরিণতি ভয়াবহ হয়।
ঠিক কোন বারে কার জন্ম সেসব অনাদি মনে রাখতে পারে না। ফলে এ বাড়িতে এখন অনেক দিন। বেগুনপোড়া খাওয়া হয়নি৷
আজ মোচার ব্যাপারটা আরও গোলমেলে। তবু সেদিন বেগুন দুটোর যা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল আজ মোচার ব্যবস্থা তাই নিলে আপাতত আশুমৃত্যুর অমঙ্গল এড়ানো যায়।
অনাদিদের বাড়ির পিছনে একটি বিশাল নর্দমা-সঙ্গম আছে। দুপাড়ার দুটি বড় নর্দমা এসে এখানে মিলিত হয়েছে। নর্দমার গন্ধে পিছনের দিকে জানলা খোলা যায় না, ছাদে ওঠা যায় না।
কিন্তু এই সব বিপদের দিনে বাড়ির ছাদটা খুব উপকারে লাগে। আগেরবার বেগুন দুর্টির নর্দমাপ্রাপ্তি হয়েছিল। আজ রান্নাঘরের মেজে থেকে মোচাটা তুলে নিয়ে অনাদি সিঁড়ির দরজার শিকল খুলে ছাদে উঠে গেল।
এতক্ষণ অনাদির বাঁ হাতে কাফকার বইটা ধরা ছিল। মধুমিতার ক্রন্দন জড়িত নির্দেশে অপবিত্র মোচাটা নিতে হল বাঁ হাতে, এবার কাফকার বইটা রইল ডানহাতে।
ছাদে উঠে কার্নিশের পাশে দাঁড়িয়ে ঘটনার আকস্মিকতায় হতচকিত অনাদি বাঁ হাতের মোচাটা ছুঁড়তে গিয়ে হঠাৎ ডানহাতের কাফকার বইটি ছুঁড়ে দিল নর্দমার গভীরে।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ভুলটা টের পেল অনাদি। বাঁ হাতে আস্ত মর্তমান মোচাটা ধরা রয়েছে। ডান হাত শূন্য। নীচে নর্দমার কাদার গভীরে কয়েকটা বুদবুদ তুলে কাফকা ডুবে গেল।
বেশ-বেশ
দুশো-তিনশো শব্দের মধ্যে গল্প? একালের জটিল জীবনের কাহিনি এত অল্পে হবে না। বরং শতবর্ষ আগের একটা ঘটনায় যাই।
