ডলারে, পাউন্ডে টাকার অঙ্কটা কম দেখালেও এখানকার দামে চার-পাঁচশো টাকার ধাক্কা। নিজের পয়সায় এরকম দামের একটা বই নো খুবই দুঃসাধ্য। বিশেষ করে অনাদির মতো মাস মাইনের সীমিত আয়ের সংসারী মানুষের পক্ষে। সে যা হোক বই পড়া তো বন্ধ করা যায় না। বই পড়ার নেশা সবচেয়ে মারাত্মক। পড়াশুনো করার নেশাকে যারা প্রশংসা করেন, হয় তারা বেকার বড়লোক অথবা কখনও এই নেশায় না মজে এই নেশার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তাঁরা মোটেই জানেন না যে বই সংগ্রহ করে, বই বেছে, বইপাড়ায় কী পরিমাণ অর্থনাশ, সময়নাশ হয়।
অবশ্য অর্থনাশের একটা সমাধান বার করেছে অনাদি৷ আংশিক সমাধান।
এসপ্ল্যানেডের একটা ইংরেজি বইয়ের দোকানে টাকা জমা দিয়ে নতুন বই ভাড়া করে এনে পড়া যায়। তবে খুব সাবধানে পড়তে হয়, সেলোফেন কাগজে মলাট দিয়ে বইয়ের নতুনত্ব বজায় রেখে যত্নে পড়তে হয়। তারপর বই ফেরত দিলে বইয়ের অবস্থা দেখে দোকানদার জমা টাকা থেকে কিছু টাকা ভাড়া হিসেবে কেটে রেখে বাকি টাকা ফেরত দেয়।
এভাবেই গত সপ্তাহে অনাদি টাটকা, আনকোরা কাফকার গল্প সংগ্রহ ভাড়া করে এনেছে। বইটির নতুন দাম চারশো টাকা, ভাড়া পড়বে চল্লিশ টাকা। তা লাগুক।
কাফকার এই সংকলনের অধিকাংশই অবশ্য অনাদির আগে বহুবার পড়া। সে কাফকার একজন অন্ধ ভক্ত। কাফকার কিছু কিছু বই তার নিজেরও আছে।
কিন্তু বর্তমান সংকলনটি অতুলনীয়। এর মধ্যে ইতিপূর্বে অগ্রন্থিত, এমনকী অসমাপ্ত এবং অপ্রকাশিত কয়েকটি গল্পাংশ রয়েছে।
কাফকার রচনায় যে কোনও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশে সেই অনিবার্য ভবিতব্যের ছায়া এবং রহস্যময়তা রয়েছে যা অনাদিকে এক সময়ে আবিষ্ট করে রাখত। এখনও আবিষ্ট করে।
আজ শনিবার। সকালবেলা বাজার সেরে এসে রান্নাঘরের মেঝেতে বাজারের থলে নামিয়ে রেখে কাফকার বইটা হাতে নিয়ে বারান্দায় এসে বসেছে অনাদি।
মধ্য শীতের হালকা মধুর রোদ বারান্দায় ছড়িয়ে আছে। সেই রোদে গা এলিয়ে একটা পাতলা চাদর মুড়ি দিয়ে গল্পসংগ্রহের পাতা ওলটাচ্ছে অনাদি। হাতের কাছেই আজ সকালের খবরের কাগজ পড়ে রয়েছে। এখনও সে সেটা হাতে ছোঁয়নি। এমনকী পত্রিকার শনিবাসরে গদাধর রায়ের যে অখাদ্য ধারাবাহিক লেখাটায় সে রুটিন করে চোখ বুলিয়ে নেয়, তাতেও দৃষ্টিপাত করেনি।
সে এখন লোভীর মতো কাফকার বইটার পাতা ওলটাচ্ছে, এখানে ওখানে চোখ বুলোচ্ছে তবে মোটেই পড়ছে না, সেই সুকুমার রায়ের ছড়ার মতো, ঠোঙা ভরতি বাদামভাজা, ভাঙছে কিন্তু খাচ্ছে না। আসলে অনাদি এখন বইটা পড়বে না। সামনের সপ্তাহে সে বউ, মেয়েকে নিয়ে বেড়াতে যাবে পণ্ডিচেরিতে। সেখানে হোটেলের বারান্দায় সমুদ্রের দিকে মুখ করে বসে তারিয়ে তারিয়ে বইটা পড়বে। নতুন গল্পাংশগুলি যা রয়েছে তা তো পড়বেই, পুরনো গল্পগুলোও আবার পড়বে। কাফকার গল্প কখনও পুরনো হয় না অনাদির কাছে, কাফকার রহস্যময় জটিল জগৎ তার কাছে সব সময়েই এক গোলোকধাঁধা, যার অনুপম নির্মাণশৈলী, শব্দবন্ধন তাকে আকর্ষণ করে, চেনা ঘটনা, চেনা মানুষ আবার নতুন করে চেনায়।
লোভাতুর দৃষ্টিতে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে বইটির পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা ওলটাতে ওলটাতে কখনও কখনও অসতর্কভাবেই অনাদির মন আটকিয়ে যাচ্ছিল পূর্বে অপঠিত কোনও রচনাংশে।
অনাদির কাফকাঁপাঠের আবেশ সহসা ভেঙে গেল একটি আর্ত চিৎকারে। চিৎকারটি এসেছে রান্নাঘর থেকে। অন্য কেউ হলে এই রকম আর্তনাদ শুনলে প্রথমেই ধরে নিত বোধহয় খুন-টুন হয়েছে।
কিন্তু অনাদি পুরনো ভুক্তভোগী, সে ভালই জানে এই আর্তনাদ মধুমিতার, মানে তার স্ত্রীর। সময়ে-অসময়ে এরকম চিৎকার করে ওঠা মধুমিতার অভ্যেস। সামান্য কারণেই সে এমন করে। আগে কদাচিৎ করত। আজকাল ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে।
মধুমিতা অঙ্কের ভাল ছাত্রী। একটি ভাল স্কুলের অঙ্কের শিক্ষিকা। আধুনিকা, বুদ্ধিমতী। সকালে ইংরেজি খবরের কাগজ পড়ে, ছুটির দিনের সন্ধ্যায় স্বামী কন্যার সঙ্গে চিনে হোটেলে খেতে ভালবাসে, জীবনানন্দ-সতীনাথ ভাদুড়ির ভক্ত, টিউবলাইট খারাপ হয়ে গেলে নিজে চেয়ারের ওপরে উঠে নতুন টিউব লাগায়।
কিন্তু উত্তরাধিকার সূত্রেই হোক, অথবা স্কুলের সহকর্মিণীদের সাহচর্যেই হোক মধুমিতা ক্রমশ একটি সংস্কারের ডিপো হয়ে পড়েছে।
বিয়ের পর পর ঘটনাটা তেমন বোঝা যায়নি। বাঁ হাতের মধ্যমায় অবশ্য একটা রুপো বাঁধানো পলার আংটি ছিল। অল্পদিন পরে, ফুলশয্যার দু-চারদিনের মধ্যে অনাদি আবিষ্কার করল যে মধুমিতার গলার হারের যে লকেট তার মধ্যে রয়েছে প্রসাদি বেলপাতা, তার ওপরে নীল কাঁচের মধ্যে রয়েছে একটি রঙিন ফটো জটিরামবাবার। শোয়ার আগে প্রতিদিনই মধুমিতা গলার হার খুলে রাখত। সে ওই জটিরামবাবার প্রতি শ্রদ্ধাবশত।
ধীরে ধীরে অনাদি মধুমিতার কাছে জানতে পারে জটিরামবাবার বয়েস একশো এগারো। তার শরীরে জামা কাপড় কিছু নেই। শুধু ওই জটা আর দাড়ি গোঁফ, এই সব দিয়েই তিনি শরীর ঢেকে রাখেন, শীতাতপ এবং লজ্জা নিবারণ করেন। শুধু মধুমিতাই নয়, তার ইস্কুলের অনেক দিদিমণি, এমনকী সেক্রেটারি, বড়বাবু সবাই জটিরামবাবার কাছে দীক্ষা নিয়েছে। এমনকী অভিভাবক-অভিভাবিকারাও অনেকে। যেকোনও বিপদে পড়লে দম বন্ধ করে একশো এগারোবার জটিবাবা, জটিবাবা মনে মনে ফটাফট জপ করলে সে বিপদ থেকে উদ্ধার হওয়া যাবে।
