ভদ্রলোক তার টেবিলের উপর চশমাটা পর পর তিনবার ঠুকলেন, তারপর বললেন,–আপনি অত্যন্ত মোটা, কুৎসিত ভুড়ি হয়েছে, সিঁড়ি দিয়ে উঠে কুকুরের মতো জিব বার করে হাফাচ্ছেন, তা ছাড়া আপনার গলার স্বর অতি বদখৎ, গাঁজা না খেলে মানুষের এত হেঁড়ে গলার স্বর হয় না।
তিনি আরও কী বলতে যাচ্ছিলেন, আমি হতভম্ব হয়ে প্রতিবাদ করলাম, আপনি কী রকম ডাক্তার, আমি অনেক উন্মাদ, রাগী দুর্দান্ত ডাক্তারের কথা শুনেছি, কিন্তু এ কী?
আমার অভিযোগ শেষ হওয়ার আগেই ভদ্রলোক বললে গেট আউট। অন্ধ কানা চোখে দেখতে পাও না, আমি হলাম ইনকাম ট্যাক্সের উকিল, বোকা বাইরে নেমপ্লেট না দেখে ঢুকে পড়েছ! যাও বেরোও, তোমার ডাক্তার ওই সিঁড়ির শেষ মাথায়, এই বলে উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে বের করতে করতে গজগজ করতে লাগলেন! কত কষ্ট করে দুবেলা ছতলায় উঠে বসে থাকি, তা মক্কেলের পাত্তা। নেই, রোগীর পর রোগী, এ এক আচ্ছা ঝামেলা বেধেছে!
অকারণে অপমানিত হয়ে বেরিয়ে এসে একটু এগিয়েই ডাক্তারের ঘর পেলাম। বাইরে স্পষ্ট নেমপ্লেট লাগানো রয়েছে, আমারই ভুল হয়েছে, প্রথমেই দেখে ঢোকা উচিত ছিল।
যা হোক, ডাক্তারের ঘরে গেলাম। দেখি বেশ কয়েকজন রোগী-রোগিণী বসে। ঘণ্টা দেড়েক পরে আমার ডাক এল। ডাক্তারসাহেব আমার সব কথা মন দিয়ে শুনলেন, নাড়ি দেখলেন, পেট টিপলেন, গলাখাঁকারি দিতে বললেন, অনেক গোপন কথা জিজ্ঞেস করলেন, তারপর বললেন, আপনার কিছু হয়নি, রাতে ঘুম একটু হালকা হচ্ছে তাই সারাদিন ক্লান্ত লাগছে। রাতে শোয়ার আগে এক গেলাস গরম দুধ আর দুটো বিস্কুট খেয়ে শোবেন। ওষুধ-টষুধ লাগবে বলে মনে হয় না।
খুব খুশি হয়ে বাড়ি ফিরে এলাম।
এসব প্রায় চার মাস আগেকার কথা। ডাক্তারসাহেবের পরামর্শ অনুসরণ করে মোটামুটি ভালই ছিলাম। কিন্তু আজ কিছুদিন হল আবার ক্লান্ত অবসন্ন বোধ করছি। একদিন হাঁটতে হাঁটতে অফিস ফেরত আবার চলে গেলাম পার্ক স্ট্রিটের সেই ডাক্তারসাহেবের চেম্বারে। আবার সেই লিফট আউট অফ অর্ডার, আবার পায়ে হেঁটে হাঁফাতে হাঁফাতে ছয়তলা। তবে এবার আর আয়করের উকিলের কাছে গিয়ে। অপমানিত হলাম না, ইচ্ছে থাকলেও উপায় ছিল না, কারণ দরজায় বিশাল তালা ঝুলছে।
সোজা চলে গেলাম ডাক্তারের ঘরে গিয়ে দেখি সেই ঘর, সেই পরিবেশ, রোগী-রোগিণীও রয়েছে যেমন আগে দেখেছিলাম। আগের বারের মতোই ঠিক দেড় ঘণ্টা পরে আমার ডাক পড়ল। কিন্তু চেম্বারের ভিতরে গিয়ে দেখলাম ডাক্তারের আসনে যিনি বসে আছেন, তিনি আগের ব্যক্তি নন। আমি দ্বিধাগ্রস্ত বললাম, আমি তো আপনার রোগী নই, যাঁকে দেখিয়েছিলাম তিনি কোথায়?
নতুন ডাক্তারসাহেব জানালেন আগের জন আবার ভিয়েনায় গিয়েছেন আর উনি সদ্য ভিয়েনা থেকে এসেছেন। উনি যখন যান ইনি আসেন, ইনি যখন যান তখন উনি আসেন। তিন মাস পর পর এই বাঁধাধরা রুটিন। কোনও অসুবিধে নেই, উনির মতো ইনিও সদ্য ভিয়েনা ফেরত আধুনিক চিকিৎসক, ওঁকে দেখানো আর এঁকে দেখানো আসলে একই কথা।
একটু অপ্রস্তুত হয়ে এঁকেও আমার বৃত্তান্ত বললাম। ইনিও সব কথা মন দিয়ে শুনলেন, নাড়ি দেখলেন, পেট টিপলেন, গলাখাঁকারি দিতে বললেন, অনেক গোপন কথা জিজ্ঞেস করলেন, তারপরে বললেন, আপনার কিছু হয়নি, রাতে ঘুম একটু কম হচ্ছে তাই সারাদিন ক্লান্ত লাগছে। রাতে শোয়ার আগে দু গেলাস জল খেয়ে শোবেন, ওষুধ-টষুধ লাগবে মনে হয় না।
আমি একটু ইতস্তত করে বললাম, ঠিক চার মাস আগে আপনার পূর্বসূরি, আগের ডাক্তারসাহেব এক গেলাস গরম দুধ আর দুটো বিস্কুট খেয়ে শুতে বলেছিলেন। আর আপনি বলছেন শুধু দু গেলাস জল খেতে!
আমার কথা শুনে নতুন ডাক্তারসাহেব একবিন্দুও বিচলিত হলেন না। বললেন, জানেন তো আধুনিক চিকিৎসা-বিজ্ঞান প্রতিদিন এগোচ্ছে, এই চার মাসে আগাগোড়া বদলে গেছে, বলে একটু মুচকিয়ে হেসে যেন খুব গোপন কথা বলছেন এইভাবে গলা নামিয়ে বললেন, এই জন্যেই তো প্রতি তিন মাস অন্তর আমরা বিদেশে গিয়ে নতুন খবর নিয়ে আসি, সেইভাবে চিকিৎসা করি।
আমি বিশ টাকা ভিজিট দিয়ে আস্তে আস্তে ছয়তলা ভেঙে নীচে এলাম।
বেগুন, মোচা এবং কাফকা
আগে বইয়ের, মানে বিলিতি বইয়ের দাম ছিল ভদ্রমতো৷ শুধু দামে কম ছিল তা নয়, দামটা ছিল মার্কিন দেশে প্রকাশিত হলে দেড়, দুই, বড়জোর তিন ডলার। খাস ব্রিটেনের বই হলে পাউন্ডে দাম। এক পাউন্ড, দুই পাউন্ড।
তা ছাড়া পাউন্ড, ডলারও এখনকার মতো এত মূল্যবান ছিল না। বেশিদিন আগের কথা নয়, মাত্র পনেরো বছর আগের কথা, সদ্য এম এ পরীক্ষা পাশ করে চাকরিতে ঢুকেছে অনাদি, মাসের প্রথমে প্রায় নিয়মিত দুয়েকটা বই কিনত সে। লাইটহাউসের উলটো দিকের দোকানগুলোয় একটু ঘুরে ফিরে দাম দর করলে গোটা চল্লিশ টাকায় একটা দু-আড়াই পাউন্ডের বা পাঁচ ডলার দামের বিলিতি পেপারব্যাক বা চটি হার্ড কভার কেনা যেত।
.
এখন আর দু-আড়াই পাউন্ড বা পাঁচ ডলার দামে এরকম বই পাওয়া যায় না। দশ পাউন্ড বা পনেরো ডলারের কাছাকাছি দাম।
এই দামের ব্যাপারটা বেশ মজার। বড় বড় জুতো কোম্পানির দাম যেরকম হয়, একশো ঊনআশি টাকা নব্বই পয়সা বা দুশো ঊনপঞ্চাশ টাকা পঁচানব্বই পয়সা, একেবারে ওই জাতীয় দাম। নয় পাউন্ড নব্বই পেন্স বা চৌদ্দ ডলার নব্বই সেন্ট।
