বহু কষ্টে এই মাতুলালয়বিলাসী ভ্রাতৃযুগলের হাত ছাড়িয়ে বেরিয়ে এলাম। কিন্তু এর পরেও কোনও মুদির দোকানেই চিরতা পেলাম না, সবাই শুষ্ক কণ্ঠে কিংবা মাথা নেড়ে জবাব দিলেন, না, নেই।সুখের কথা সতেরোতম মুদি মহোদয় অতি মহানুভব, তিনি বললেন, চিরতা মুদির দোকানে পাবেন না। দশকর্মা ভাণ্ডারে খোঁজ করুন।
অত্যন্ত সন্দিগ্ধ চিত্তে দশকর্মা ভাণ্ডারে গেলাম। চিরকাল জানি এই সব ভাণ্ডারে বিয়ে, অন্নপ্রাশন বা পুজোর সামগ্রী পাওয়া যায়, চিরতার মতো তিক্ত জিনিস ওইসব মধুর অনুষ্ঠানের সামগ্রীর সঙ্গে কেন বিক্রি হবে এইসব কঠিন প্রশ্ন ভাল করে ভাবার আগেই প্রথম দশকর্মা ভাণ্ডারেই চিরতা পেয়ে গেলাম।
প্রয়োজনীয় কোনও বস্তু পেলে তা যদি তিতাও হয় তবু মানুষ যে কত খুশি হতে পারে আমার চোখ-মুখ দেখলে সেটা বোঝা যেত। একবারে অনেকটা চিরতা কিনে ফেললাম দোকানদারদের পরামর্শ নিয়ে, পুরো ছয় মাসের খোরাক।
কিন্তু বাড়ি ফিরে বিপত্তি হল। আমাদের প্রাচীনা পরিচারিকা ভূয়োদর্শিনী মহিলা, তিনি চিরতার ঠোঙা খুলে ভাল করে পরীক্ষা করে দেখে রায় দিলেন, এটা চিরতাই বটে কিন্তু আসল চিরতা নয়, রামচিরতা। এতে ঝঝ তেজ অনেক কম। বাবুকে সরল প্রকৃতির মানুষ দেখে দোকানদাররা ঠকিয়ে দিয়েছে।
তা ঠকাক, ঝাঁঝ-তেজে আমার দরকার নেই, চিরতা হলেই হল। সকালবেলা ভিজিয়ে খেতে পারলেই হল। প্রথমদিন এক গেলাস চিরতার জল খেয়ে ভোরবেলায় লম্বালম্বি কাটা কলাগাছের মতো অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলাম মেঝেতে। এই যদি কম তেজ হয়, রামচিরতাই যদি এরকম বঁঝালো হয়, কে জানে প্রকৃত চিরতা কীরকম! প্রকৃত চিরতা যে রকমই হোক আমার এই রামচিরতার জল এক গেলাস খাওয়ার পরে এক গেলাস নিমের পাতার রস শরবতের মতো মনে। হবে। প্রথমদিন জ্ঞান ফিরে আসার পর জিবের অসহ্য তিতা ভাব কাটানোর জন্যে একটা কাঁচা উচ্ছে চিবিয়ে খেলাম, মনে হল বাতাসা খাচ্ছি।
এইভাবে সপ্তাহ তিনেক চলে গেল। সকালে ঘুম থেকে উঠে এই সাংঘাতিক পানীয় এক গেলাস খেয়ে গুম মেরে পড়ে থাকি। শুভানুধ্যায়ীরা যে যা পরামর্শ দিয়েছিল সব মেনে চলি। পাতে কাঁচা নুন খাই না, রাতে শোয়ার সময় বহুকালের অভ্যাস পালটিয়ে মাথার কাছের জানলাটা বন্ধ করে শুই। কিন্তু শরীর ও মনে সেই পালিশ করা জুতোর মতো ঝকঝকে ভাবটা কিছুতেই ফিরে আসছে না।
এর মধ্যে আমাদের দেশের এক ভদ্রলোক আমার সঙ্গে সকালবেলা দেখা করতে এলেন। তিনি আমাদের পরিবারকে তিন পুরুষ ধরে চেনেন। তিনি যখন এলেন তখন তরল চিরতা পান করে যথারীতি কুঁদ হয়ে বসে আছি। আমি বহু কষ্টে তার সম্মুখীন হলাম। সেই স্বদেশি ভদ্রলোক আমার অবস্থা দেখে হায়-হায় করে করে উঠলেন। প্রথমে তার অহেতুক সন্দেহ হল, আমি বোধহয় গতরাতে খুব নেশা করেছি, এই ভরসকালে এখনও সেই ঘোরে আছি। কিন্তু কিছু পরে আমাকে ভালভাবে অবলোকন করে পারিবারিক মাদকবিরোধী ঐতিহ্য স্মরণ করে এবং সর্বোপরি আমার কথা শুনে তিনি বুঝলেন কোনও মাদক নয়, ওষুধ পান করেই আমার এ অবস্থা। তার উপরে তিনি যখন শুনলেন আমি খালি পেটে চিরতার জল খাচ্ছি, রীতিমতো আশঙ্কিত হয়ে পড়লেন। আমাকে জানালেন আমাদের পরিবারে এ ঘটনা আগেও ঘটেছে আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে। আশি বছর বয়সে আমার ঠাকুরদা যে হার্টফেল করে লোকান্তরিত হয়েছিলেন সেও ওই খালি পেটে চিরতার জুল খাওয়ার জন্যে। পরামর্শ দিলেন চিরতার জলে তত আপত্তি নেই, তবে খালি পেটে নয়, সঙ্গে দু ছটাক মিছরি খেতে হবে।
এখন আর দু ছটাক কোনও জিনিস পাওয়া যায় না। দৈনিক একশো গ্রাম করে মিছরি খেতে লাগলাম। মানে ষাট পয়সা দিনে, মাসে আঠারো টাকা খরচ বেড়ে গেল।
কিন্তু তেমন কোনও উপকার হল না। সেই চনমনে ঝকঝকে ভাবটা কিছুতেই ফিরে আসছে না। বাল্যকালে পরশুরামের চিকিৎসা সংকট গল্পটি পড়েছিলাম সেটা মনে করে খুব বেশি ডাক্তার বৈদ্যের কাছে যেতে ভরসা হল না।
কিন্তু একদিন একটা বোকামি করে বসলাম। কথায় কথায় পুরনো এক বন্ধুর কাছে খবর পেলাম, ভিয়েনা থেকে এক সদ্য-প্রত্যাগত ডাক্তার শারীরিক ও মানসিক দুর্দশার চমৎকার আধুনিক চিকিৎসা করেন। পার্ক স্ট্রিটের একটা বড় বাড়িতে ঠিকানা, ফি মাত্র কুড়ি টাকা।
পরের দিন সন্ধ্যায় ঠিকানা খুঁজে খুঁজে পার্ক স্ট্রিটের সেই বাড়িতে পৌঁছলাম। প্রাগৈতিহাসিক বাড়ি, বিশাল অন্ধকার অট্টালিকা। সাততলা বাড়ির ছয়তলায় ডাক্তার সাহেব বসেন, সিঁড়িতে আলো নেই। একটি মোগল আমলের লিফটে কাগজের নোটিশ লাগানো, লিফট আউট অফ অর্ডার। এই নোটিশটিও বহুদিনের পুরনো, কাগজ মলিন হয়ে গেছে, সিপাহি যুদ্ধের বা তারও আগের কালের বলে মনে হয়।
বহু কষ্টে হাঁফাতে হাঁফাতে ছয়তলায় উঠলাম। উঠেই সামনে ডাক্তার সাহেবের ঘরে আলো জ্বলছে, পর্দা তুলে ভিতরে ঢুকে গেলাম, দেখে ঠিক ডাক্তারের ঘর মনে হয় না। সেক্রেটারিয়েট টেবিলে এক মধ্যবয়সি ভদ্রলোক চশমা চোখে বসে রয়েছেন। আমি ঢুকতেই বললেন–বলুন আপনার কী অসুবিধে?
আমি আমার অসুখের আদ্যোপান্ত বলে গেলাম গড়গড় করে। ভদ্রলোক চোখ থেকে চশমা নামিয়ে কেমন গম্ভীর হয়ে সব শুনলেন। আমার বলা শেষ করে আমি বিনীতভাবে জিজ্ঞাসা করলাম, আমার কী হয়েছে মনে হয় আপনার?
