১) সর্দার মস্ত সিং দিল্লি থেকে চণ্ডিগড় বিমানে গিয়ে অভিযোগ করেছেন যে, বিমানের মধ্যে আবহচাপ অত্যন্ত বেশি ছিল। তিনি যে পাগড়ি মাথায় দিয়ে দিল্লি থেকে টানটান প্লেনে উঠেছিলেন, সেই পাগড়ি ঢিলে হয়ে, তাঁর অনিচ্ছা সত্ত্বেও, চণ্ডিগড় বিমানবন্দরে তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে তাকে রিসিভ করতে আসা তার নবযৌবনা, অবিবাহিতা শ্যালিকার পদপ্রান্তে পড়ে যায়।
২) একজন দিল্লি প্রবাসী বাঙালি লেখক দিল্লি থেকে তাঁর সদ্যরচিত উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি কলকাতায় প্রকাশের কাছে নিয়ে আসছিলেন, পাণ্ডুলিপিটি একটি খামের মধ্যে ছিল। খুব সাবধানে, অতি সন্তর্পণে কলকাতা বিমানবন্দর থেকে বেরোনোর সময়, সেই অমূল্য পাণ্ডুলিপিটি ছিনতাই হয়।
অবশ্য এই ধরনের অধিকাংশ কেসই বিমা ক্ষতিপূরণের আওতায় আসে না। কিন্তু এই সব বিচিত্র ক্ষতিপূরণের কেসের তদন্তের সূত্রে বিমানবাবুকেও সারা দেশে অনবরত ঘুরপাক খেতে হয়।
বিমানবাবু নিজেও একজন ভুক্তভোগী হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন বিমানভ্রমণের। তাঁর অবশ্য জিনিসপত্তর হারায় না। সে বিষয়ে তিনি খুব সাবধান। ছোট একটা বহনযোগ্য হাতব্যাগে কিছু জামাকাপড়, তোয়ালে, দাড়ি কামানোর জিনিস, টুথব্রাশ নিয়ে তিনি যাতায়াত করেন, সেটা সঙ্গেই রাখেন।
দীর্ঘকাল বিদেশে থাকায় একটু খুঁতখুঁতে স্বভাব হয়েছে বিমানবাবুর। তিনি সর্বদাই সচেতন থাকেন যে এ দেশটা বিলেত বা আমেরিকা নয়, কিন্তু সবসময় সামলিয়ে উঠতে পারেন না।
এ দেশে যাঁরা নিয়মিত বিমানযাত্রী, তাদের অভিজ্ঞতা থেকে বিমানচন্দ্রের অভিজ্ঞতা মোটেই স্বতন্ত্র নয়, কিন্তু এখনও তিনি মানিয়ে উঠতে পারেননি।
বিমান চলাচল সম্পর্কে যেগুলো সাধারণ অভিযোগ–যেমন ঠিক সময়ে ছাড়ে না, পাইলট সাহেব আসেননি কিংবা কলকবজা খারাপ, রানওয়েতে শকুন নেমেছে, লাটসাহেবের শ্যালিকা এখনও এসে পৌঁছয়নি, বিমানে বোমা রাখা আছে, বোর্ডিং পাশের তুলনায় যাত্রীর সংখ্যা একজন কম, কুড়িবাইশটি নারকেল ভরতি একটি চটের বস্তার মালিক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বাস্তব-অবাস্তব নানারকম অজুহাত।
আর অজুহাতই বা কে দিচ্ছে। বিমান ছাড়ছে না, ছাড়বে না। যাচ্ছে না, যাবে না।
বিমানে ওঠার পর বিমান না ছাড়লে আরও কষ্ট। গরম, ঘাম, তৃষ্ণা, গলা শুকিয়ে ওঠা, নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া দমবন্ধ ভাব। এ রকম অবস্থায় একবার সিট থেকে উঠে বিমানচন্দ্র সামনের পর্দাঘেরা জায়গাটায় গিয়েছিলেন এক গ্লাস জল কিংবা একটা কোল্ড ড্রিঙ্কের অনুসন্ধানে। কিন্তু পর্দা সরাতেই যে দৃশ্যটি তার নজরে আসে, তাতে কিছু না চেয়েই তড়িদাহতের মতো তিনি সিটে দ্রুত ফিরে আসেন। অবশ্য সেই দৃশ্যকাব্যের পাত্র-পাত্রীরাও বিমানবাবুর এই অনধিকার প্রবেশে কম চমকিত হয়নি।
বিভিন্ন বিমানবন্দরে বিভিন্ন রকমের শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা হয়েছে বিমানচন্দ্রের। কিন্তু গত সপ্তাহে পাটনায় যা হয়েছে তার কোনও তুলনা নেই।
বিমানবাবুকে গৌহাটি এয়ারপোর্টে প্লেনের মধ্যে হাজার হাজার মশায় কামড়ে ছালাফালা করে দিয়েছে। মাদ্রাজে প্লেনে ওঠার সময় সিঁড়ি ভেঙে পড়ে হাঁটু মচকিয়েছেন। একবার বাগডোগরায় প্লেন থেকে নামামাত্র একটা শুয়োর কোথা থেকে এসে তাকে আক্রমণ করে। শুয়োরটার বোধহয় মাথা খারাপ ছিল। কিংবা কাকে, কেন সে আক্রমণ করছে সেটা সে জানত না। বিমানবাবুর ভাগ্য ভাল, দাঁত দিয়ে ফুলপ্যান্টের নীচের দিকটা কামড়ে ধরে শুয়োরটা একবার মাথা উঁচু করে বিমানবাবুকে দেখেই কামড় ছেড়ে দিয়ে যেদিক থেকে এসেছিল, সেদিকে দৌড়ে পালিয়ে যায়।
দুর্ভোগের ফিরিস্তি বাড়িয়ে লাভ নেই। কিন্তু পাটনায় যা ঘটল, সেটা অকল্পনীয়। বিমানচন্দ্র প্লেনে উঠে সিটে বসার আগে মাথার ওপরের বাঙ্কে একটা আমের ছোট ঝুড়ি রাখতে গেছেন। পাটনায় এই সময়ে ভাল আম পাওয়া যায়, তাই কিনেছিলেন। ঝুড়িটা বাঙ্কের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছেন, সেই সময়ে একটা ফোঁস করে শব্দ হল তার সঙ্গে তাঁর হাতে কী একটা কামড়িয়ে না আঁচড়িয়ে দিল।
ঘাবড়িয়ে গিয়েছিলেন বিমানবাবু। সর্বনাশ! সাপে কামড়াল নাকি? এই সময়ে মিউ মিউ আওয়াজ শুনে বুঝতে পারলেন এবং দেখতেও পেলেন ওই মালপত্র রাখার জায়গায় মেনি বিড়াল বাচ্চা দিয়েছে। বাচ্চাগুলো খুব ছোট নয়, চোখ ফোঁটার স্টেজ পার হয়ে এসেছে। তার মানে বেশ কিছুদিন হল বেড়ালটা এখানে আছে। আরও অনেক প্যাসেঞ্জারকে হয়তো আঁচড়ে কামড়ে দিয়েছে।
দিল্লিতে ফিরে এসে পরদিন অফিসে গিয়ে প্রথমেই একটা খুব কড়া চিঠি লিখলেন সংশ্লিষ্ট প্লেন কোম্পানির প্রধান কর্মকর্তাকে। এরকম তদারকির অভাব, এরকম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা একটি বিমান কোম্পানির কাছে আশা করা যায় না। যেকোনও দিন এদের বিমানে যেকোনও রকম দুর্ঘটনা ঘটলে সেটা আশ্চর্যের কিছু হবে না। এইরকম সব কঠিন কঠিন বাক্য।
চিঠিটা রাগের মাথায় লিখেছিলেন বিমানচন্দ্র, ধরেই নিয়েছিলেন কেউ উত্তর দেবে না। কিন্তু আশ্চর্যের কথা, সেই বিমান কোম্পানির খোদ প্রধান কর্মকর্তা নিজে সই করে চিঠি দিয়েছিলেন।
চিঠি পড়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন বিমানচন্দ্র। এতটা তিনি আশা করেননি। পত্রের প্রথমেইকর্মকর্তা ক্ষমা প্রার্থনা করে বলেছেন যে, তাদের কোম্পানিকে চিঠি লিখে ব্যাপারটা জানানোর জন্য তারা অতিশয় কৃতজ্ঞ বোধ করছেন।
