সে যাই হোক, সেই বিমানযুদ্ধের বছরে কলকাতায় যেদিন প্রথম বোমা পড়ল, তার পরদিন ঘুঘুডাঙায় পৈতৃক ভদ্রাসনে বিমানচন্দ্র জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর অবশ্য ভবানীপুরে মাতুলালয়ে জন্মানোর কথা ছিল। কিন্তু জাপানি বিমানের আক্রমণের ভয়ে বিমানচন্দ্রের পিতামহ, পুত্রবধূকে তার পিত্রালয়ে পাঠাননি। পাঠিয়েও কোনও লাভ ছিল না। কিছুদিন আগে তারা, অর্থাৎ বিমানচন্দ্রের মাতুল বংশীয়েরা, ভবানীপুরের বাসাবাড়ি তালাবন্ধ করে খুলনায় তাদের গ্রামের বাড়িতে পালিয়ে গিয়েছিলেন।
এইরকম পরিস্থিতিতে বিমানচন্দ্রের জন্ম। স্বাভাবিকভাবেই তার পিতামহ তাঁর বিমান নামকরণ করেন। বিমানচন্দ্র ভাল ছাত্র ছিলেন। পরে বিদেশে গিয়ে পড়াশোনা করেছেন। সেখান থেকেই বিদেশি কোম্পানিতে চাকরি সংগ্রহ করেন। চাকরিসূত্রে বিমান বহুদিন বিদেশে ছিলেন। সম্প্রতি খোলামেলা অর্থনীতির হাওয়ার সুবাদে তিনি দেশে ফিরে এসেছেন। তার কোম্পানি দিল্লিতে একটি শাখা স্থাপন করেছে। সেখানেই উচ্চপদে তিনি আসীন হয়েছেন।
বিমানবাবু যে কোম্পানিতে কাজ করেন, তাঁদের বিমার ব্যবসা। সেও সাধারণ বিমা বা জীবনবিমার কারবার নয়, বিমানবিমার কারবার।
বিমানপথে যাত্রী, মালপত্র সব কিছুরই বিমা করা হয়ে থাকে। বিমান দুর্ঘটনা হলে কারও যদি মৃত্যু হয়, তার জন্যে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় নিকটজনকে। শারীরিক ক্ষতি, অঙ্গহানি ইত্যাদি হলেও ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায়। এ ছাড়াও বিমানযাত্রীর মালপত্র হারিয়ে গেলে তার জন্যেও যাত্রীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়।
বিমানচন্দ্রের কাজ হল তদন্ত করা। এই রকম প্রতিটি ক্ষেত্রে যাত্রীটির আঘাত কতটা গুরুতর কিংবা জিনিসপত্র খোয়া গেলে সত্যিই খোয়া গেছে কি না, নাকি মিথ্যে করে ক্ষতিপূরণ চাওয়া হচ্ছে। আর সত্যিই যদি খোয়া গিয়ে থাকে, সেইসব জিনিসের মূল্যমান কত–বিমানচন্দ্রকে অকুস্থলে গিয়ে সরেজমিন তদন্ত করে কোম্পানিকে রিপোর্ট দিতে হয়। আর সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে তার কোম্পানি ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করে।
রীতিমতো কঠিন কাজ। বিমানচন্দ্রকে অনবরতই ছোটাছুটি করতে হয় ভারতবর্ষের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।
আজকাল বিমান দুর্ঘটনা খুব বিশেষ একটা হয় না। কিন্তু মালপত্র খোয়া যাওয়ার ব্যাপারটা হামেশাই ঘটছে। দিল্লিতে ব্রেকফাস্ট, কলকাতায় লাঞ্চ আর লাগেজ মাদ্রাজে, বিমানযাত্রীদের এরকম ঝামেলা প্রায়ই পোহাতে হয়। অবশ্য অনেক ক্ষেত্রে দু-চারদিন পরে মালপত্র যথাস্থানে ফিরে আসে। তখন ঝামেলা মিটে যায়। বহুক্ষেত্রেই ঝামেলা এত সহজে মেটে না, অনেক সময় মাল ফেরত পেয়ে যাত্রী বলে, আমার সুটকেসটা পেয়েছি, কিন্তু ভেতরের জিনিসপত্র কিছু নেই।
এসব ক্ষেত্রে বিমানকে ছুটতে হয়। যথাস্থানে পৌঁছে যাত্রীকে খুঁজে বার করেন, তার কাছে জানতে চান, সুটকেসের মধ্যে কী কী জিনিস ছিল?
যাত্রী তখন বলেন, জামাকাপড় ছিল, অফিসের কাগজপত্র ছিল, পঞ্চাশ হাজার টাকা ছিল, সাঁইবাবার ফটো ছিল, আমার শ্বশুরমশায়ের বাঁধানো দাঁতজোড়া ছিল।
বিভ্রান্তের মতো বিমান জিজ্ঞাসা করেন, আপনার শ্বশুরমশায়ের বাঁধানো দাঁত প্লেনে করে নিয়ে যাচ্ছিলেন কেন?
অদমিত প্যাসেঞ্জার সাহেব জবাব দেন, আমার শ্বশুরমশায় আগে পাটনায় পোস্টেড ছিলেন কিনা। সেখানেই দাঁত বাঁধিয়েছিলেন। আমি পাটনায় আসছি শুনে দাঁতজোড়া আমাকে দিয়ে বললেন, তার পুরনো ডেন্টিস্টকে দিয়ে সেটা মেরামত করিয়ে নিয়ে আসতে। এখন বলুন তো শ্বশুরবাড়িতে মুখ দেখাই কী করে, আমার এই বেইজ্জতির খেসারত আপনি দেবেন? উদাহরণ বাড়িয়ে লাভ নেই। বোম্বাই-মাদ্রাজ ফ্লাইটের বাথরুমে এক চিত্রতারকার উইগ চুরি গিয়েছিল। কী করে গিয়েছিল বলা কঠিন। কিন্তু সেই সুন্দরীকে ন্যাড়ামাথা ঢাকতে স্কার্ট তুলে ঘোমটা দিতে হয়েছিল। এভাবে কোনও সিনেমায় অবতীর্ণ হলে দর্শকসাধারণ লুফে নিতেন, কিন্তু বিমানের ভিতরে সে এক হাস্যকর অবস্থা। সবার দৃষ্টি তার দিকে। অবশেষে খবরের কাগজ দিয়ে টুপি বানিয়ে বিমান থেকে অবতরণ করেন। আর দুঃখের কথা এই যে, তার সঙ্গেই সুটকেসের মধ্যে আরও পাঁচটি উইগ ছিল কিন্তু সেগুলো ছিল বিমানের খোলের মধ্যে এবং মাদ্রাজে নামার ঘণ্টাখানেক বাদে যখন সুটকেসটা পেলেন, সেটার মধ্যে থেকে উইগসমেত অন্যান্য সব জিনিস হাওয়া হয়ে গেছে। বিমানচন্দ্র আযৌবন বিদেশে ছিলেন। সেই উনিশ বছর বয়সে বি. এসসি. পরীক্ষায় রসায়নশাস্ত্রে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে তিনি মার্কিন দেশে স্কলারশিপ নিয়ে গিয়েছিলেন। তারপর কালেভদ্রে ছুটি-ছাটায় দেশে, মানে কলকাতায় এসেছেন। এতদিন পরে আবার স্বদেশে দিল্লিতে ফিরে এসে তিনি কিঞ্চিৎ ইতস্তত বোধ করছেন। দু-চারদিনের জন্যে অল্পবয়সের কলকাতায়ও তিনি গিয়েছিলেন। কিন্তু কোথায় যেন, কী যেন মিলছে না। এমনকী নতুন কলকাতা তাঁর সেই পুরনো কলকাতার চেয়ে ভাল কি খারাপ, সেটাও বিমানচন্দ্র বুঝতে পারলেন না। মনে মনে মেনে নিলেন হয়, হয়, জীবনে এরকম হয়, হয়ে থাকে।
কিন্তু তিনি মেনে নিতে পারছেন না বিমানবিমা সম্পর্কিত তার অভিজ্ঞতাগুলো।
বিমানচন্দ্রের বিমানবিমা কোম্পানির খদ্দেরদের অভিযোগ হাজার রকম। দুটি উদাহরণ আগে। দেওয়া হয়েছে, দু-একটি উল্লেখযোগ্য
