আমরা বেছে বুছে একটা হালকা গোলাপি রঙের ফোন পছন্দ করলাম। কিন্তু অসুবিধে হল পিসিমাকে নিয়ে, বর্তমান আটচল্লিশ এগারো বারোর আরাধনা ইতিমধ্যেই পিসিমা শুরু করে দিয়েছেন। সেই ফুল, বেলপাতা, চন্দন, সিঁদুর, বাতাসা নকুলদানার প্রসাদ সবই চলছে।
পিসিমাকে অনেক কষ্টে বোঝানো হল, এটাও আটচল্লিশ এগারো বারো, শুধু রংটাই যা আলাদা।
গোলাপি টেলিফোনটা বসল আমাদের বাড়িতে এবং একটু উন্নতিও দেখা গেল।
না। ডায়াল টোন নয়। শুধু টিংটিং শব্দ বেরোতে লাগল। আগের মতো কিছুক্ষণ পরপর তিনবার টিংটিং নয়। সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা সারা রাত শুধু টিংটিং, টিংটিং।
প্রথমে মৃদুভাবেই আরম্ভ হয়েছিল ওই টিংটিং ধ্বনি, কিন্তু ক্রমশ সেটা উচ্চ থেকে উচ্চতর গ্রামে উঠতে লাগল। দু-চারদিন পরে আমরা বুঝতে পারলাম টেলিফোনটা রিসিভার থেকে তুলে নামিয়ে রাখলে আর টিং টিং করে না।
আমাদের পিসিমা কিন্তু সুযোগটার সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছিলেন। সন্ধ্যারতির পর খঞ্জনি বাজিয়ে পিসিমা মিনিট পনেরো হরিবোল হরিবোল করতেন। বাঁ হাতে বাত হওয়ায় তখন খঞ্জনিটা বাজাতে কষ্ট হত।
গোলাপি টেলিফোনটা পিসিমার খঞ্জনি বাজানোর কষ্ট লাঘব করল। সন্ধ্যাবেলায় পনেরো মিনিটের জন্যে রিসিভারটা যুক্ত করে দেওয়া হত, সঙ্গে সঙ্গে চমৎকার টিং-টিং শব্দ বেরোত আর তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পিসিমা হরিবোল হরিবোল সংকীর্তন করতে লাগলেন।
ভালই চলছিল ব্যাপারটা, হঠাৎ এর মধ্যে ফোন আসা আরম্ভ হল। টিং টিং নয় ওই টিং টিংয়ের মধ্যেই সত্যিকারের ফোন বাজার ক্রিং ক্রিং শব্দ।
প্রথম ফোনটা এল জাপান কিংবা মাদ্রাজ থেকে। লোকটা কী যে বলল কিছুই বুঝতে পারলাম না। ছুটে গিয়ে ফোনটা প্রথমে বিজন ধরেছিল, একটু পরে আমার হাতে দিয়ে বলল, কিছু বুঝতে পারছি না লোকটা জাপানি ভাষায় কথা বলছে। আমার কিন্তু ফোনটা ধরে মনে হল তামিল ভাষায় কথা বলছে, মাদ্রাজ কিংবা শ্রীলঙ্কা থেকে নিশ্চয়।
আরও নানা রকম ফোন শেষ রাতে, মধ্য রাতে, মধ্য দুপুরে আসতে লাগল। আমরা কিন্তু ফোন করতে পারতাম না, তবে ধরতাম।
দাদা বুঝতে পেরেছিল। দাদা বলল, এসব ফোন আসছে ইউনাইটেড নেশন থেকে। তোরা কেউ ধরবি না। আমার সঙ্গে পরামর্শ চাইছে।
ফোন বাজলেই দাদা ধরে ইংরেজিতে জবাব দিত, নো, নো, ফিলিপাইনসে আর গম নয়, ইয়েস ইয়েস পাকিস্তান তিনটে ছোট আণবিক বোমা বানানোর চেষ্টা করছে, ইয়েস ইয়েস। সুইডিশ ব্যাঙ্ক, নো নো নো অ্যাকাউন্ট, ইত্যাদি ইত্যাদি।
এই সবের পরিণতি কী হতে পারে তা আমরা মোটেই বুঝতে পারিনি।
হঠাৎ একদিন খুব ভোরবেলায় আটচল্লিশ এগারো বারোর মধ্য থেকে সাইরেনের ভোঁও-ও শব্দে আমাদের সকলের ঘুম ভাঙল।
বাইরের ঘরে ছুটে গিয়ে দেখি টেবিলের উপরে, টেলিফোনের রিসিভারটা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নাচছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই রিসিভারটার দু প্রান্ত দিয়ে নীল ধোঁয়া বেরোতে লাগল, কী রকম একটা প্ল্যাস্টিক পোড়ার গন্ধ। তারপরে দুম করে একটা শব্দ হল। টেলিফোনটা ঘন নীল ধোঁয়ার মধ্যে আড়াল হয়ে গেল। সব জানলা খুলে দিলাম, কিছুক্ষণ পরে জানলা দিয়ে ওই নীল ধোঁয়া বেরিয়ে যেতে দেখি সব শূন্য, টেলিফোনটা নেই; মহাশূন্যে পরমব্রহ্মে লীন হয়ে গেছে।
কিন্তু সম্পূর্ণ লীন বোধহয় হল না। সন্ধ্যাবেলায় পিসিমার সঙ্গে আমরাও স্পষ্ট খঞ্জনির ধ্বনি শুনতে পেতাম, পিসিমা তালে তালে হরিবোল গাইতেন।
বোধহয় টেলিফোনটা ভূত হয়ে গিয়েছিল। এর পর থেকে একটা টেলিফোনের ছায়া সারাদিন আমাদের বাড়িময় ঘুরে বেড়াত। কখনও অবিচ্ছিন্ন মৃদু টিং টিং শোনা যেত, কখনও অবিশ্বাস্য ক্রিং ক্রিং শুনে আমরা চমকে উঠতাম, অন্যমনস্কভাবে ফোনটা ধরতে যেতাম। ধরতে না পারলেও বেশ শুনতে পেতাম, হ্যালো, হ্যালো, কে যেন জাপানি না মাদ্রাজি ভাষায় কী বলছে।
আমরা বুঝতে পারতাম যে টেলিফোনটা আমাদের বাসাতেই রয়েছে, আমরাই শুধু সেটাকে দেখতে পাচ্ছি না।
কালীঘাটের বাড়ি থেকে আমরা বহুকাল চলে এসেছি। দাদা, কুড়ানির মা বিগত।
তবে পিসিমা আছেন। হঠাৎ কখনও কখনও বিবি এগারো বারোর কথা বলেন। তখনই আমাদের আটচল্লিশ এগারো বারোর ভৌতিক স্মৃতি মনে পড়ে। ভয়ে গা শিউরে ওঠে।
জানিনা কালীঘাটের সে বাসায় এখন কারা আছে, আটচল্লিশ এগারো বারোর বিদেহী আত্মা এখনও সে বাড়িতে ঘুরে বেড়ায় কি না তাও জানি না।
বিমান কাহিনি
সার্থকনামা মানুষ বিমানচন্দ্র। তাঁর পদবি এই ক্ষুদ্র কাহিনিতে প্রয়োজনীয় নয়। শুধু বিমানচন্দ্র লিখলেই চলবে। বিমানচন্দ্রের বয়েস, মাত্র দু-এক বছর আগে, পঞ্চাশের কোঠায় এসে পৌঁছেছে। চর্বিহীন, সুন্দর সুগঠিত দেহ। তাকে যুবক না বললেও বৃদ্ধ, এমনকী প্রৌঢ় বলাও সঙ্গত হবে না। একটিও চুল পাকেনি, একটিও দাঁত নড়েনি। ঋজু, দীর্ঘ শরীর।
বিমানচন্দ্র জন্মেছিলেন সেই চল্লিশের দশকের গোড়ায় কলকাতার শহরতলিতে জাপানি বোমার বছরে। কলকাতার আকাশে তথাকথিত শত্রুপক্ষের, মিত্রপক্ষের বিমানের ক্ষিপ্র আনাগোনা। সাইরেন, ট্রেঞ্চ। দু-চারটি বোমা, দু-দশটি মৃত্যু। খবরের কাগজের পাতায় পাতায় বিমানযুদ্ধের রোমাঞ্চকর কাহিনি। ভীত, সন্ত্রস্ত নাগরিকেরা শহর থেকে শহরতলিতে পালাচ্ছে, শহরতলি থেকে গ্রামে। ভয় যতটা ছিল, ভয়ের কারণ ততটা ছিল না। জাপানি বিমানের বোমাবর্ষণে কলকাতায় সবসুদ্ধ যত লোক মারা গিয়েছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি লোক মারা যায় যেকোনও সময় নৌকোডুবিতে বা বাস দুর্ঘটনায়। এমনকী কখনও কখনও কলেরা বা টাইফয়েডে প্রতি সপ্তাহে তার চেয়ে বেশি লোক মারা যেত তখনকার কলকাতায়।
