সে যা হোক। একটা ব্যাপার খুবই পরিষ্কার ছিল যে পিসিমার বিবি এগারো বারো ওরফে বিবি ওয়ান ওয়ান ওয়ান টু-কে সে একদম সমীহ করত না, তার দেবত্বে বিশ্বাস করত না। মোট কথা বি বি এগারো বারোর প্রতি তার কোনও ভক্তি শ্রদ্ধা ছিল না।
আমাদের বাড়িতে যেদিন টেলিফোন এল সেদিন দুপুরে শূন্যবাড়িতে কী হয়েছিল জানি না, কিন্তু সন্ধ্যাবেলা বাড়ি ফিরে এসে দেখি পিসিমা খুব চেঁচামেচি করছেন।
কুড়ানির মাকে জিজ্ঞাসা করতে সে বলল, দুপুরে ফোনের লোকেরা এসে নতুন ফোন বসিয়ে দিয়ে পুরনো ফোন নিয়ে চলে গেছে।
পিসিমা কালীমন্দির থেকে ফিরে আসার পরে সে এসব কথা পিসিমাকে কিছুই বলেনি, বলার প্রয়োজন বোধ করেনি, এখন সন্ধ্যাবেলায়, এই একটু আগে পিসিমা আরতি দিতে গিয়ে দেখেন বিবি এগারো বারো নেই, তার জায়গায় একটা তন্বী, আধুনিকা, ছিমছাম নতুন যুগের দূরভাষ যন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
আমরাও ব্যাপারটায় খুব চটে গেলাম। নতুন ফোনের জন্যে টাকা দিয়েছি, নতুন ফোন আসবে, ঠিক কথা, কিন্তু সেই জন্যে পুরনো ফোনটা, যেটার কোনও কানেকশন নেই, যেটা টেলিফোন কোম্পানি আমাদের দেয়নি, সেটা টেলিফোনের লোকেরা নিয়ে যাবে কেন?
আমরা ঠিক করলাম পরদিন টেলিফোন অফিসে গিয়ে বিবি এগারো বারোকে উদ্ধার করব। কিন্তু পিসিমা তাতে রাজি হলেন না, বললেন, বিবি এগারো বারো নাম আর মুখে এনোনা। ওটা এঁটো হয়ে গেছে, ওটাকে আর ঘরে আনা যাবে না।
ব্যাপারটা আমরা ভাল বুঝলাম না। পিসিমা বললেন, দেবতা অপবিত্র হয়ে গেলে বিসর্জন দিতে হয়। ওটাকে উদ্ধার করে আমরা যেন গঙ্গায় ফেলে দিই।
গোলমালে বাড়িতে নতুন ফোন আসার আনন্দটাই মাটি হতে বসেছিল। আমরা এবার নতুন ফোনটাকে দেখতে লাগলাম। রিসিভারটা তুলে দেখলাম ডায়াল টোন নেই, মৃত। তার মানে রিসিভারটা দিয়ে গেছে এখন কানেকশন দেয়নি।
ফোনটার গায়ে একটা টিকেট ঝোলানো আছে, দেখা গেল তাতে ফোনের নম্বরটা লেখা রয়েছে। সেটা পড়েই দাদা চেঁচিয়ে উঠল, কী আশ্চর্য, এটাও এগারো বারো দেখছি।
অবাক হয়ে আমরা সবাই উঁকি দিয়ে দেখলাম টিকিটের গায়ে ফোনের নম্বর দেয়া রয়েছে ৪৮ ১১১২, ফোর এইট ওয়ান ওয়ান ওয়ান টু।
আশ্চর্য মিল, অসম্ভব যোগাযোগ। এবং তখনই আমরা বুঝতে পারলাম নম্বরের এই সাদৃশ্যের জন্যেই পুরনো ফোনের বদলে নতুন ফোন আসছে, এই কথা ভেবেই টেলিফোন অফিসের লোকেরা পুরনো বাতিল ফোনযন্ত্রটা অর্থাৎ আমাদের বিবি এগারো বারোকে নিয়ে গেছে। তার বদলে বসিয়ে দিয়ে গেছে আটচল্লিশ এগারো বারো।
এর পরে আমরা প্রায় প্রতিদিন টেলিফোন অফিসে যাতায়াত করলাম। দুটো কারণ, (এক) বিবি এগারো বারোকে উদ্ধার করার জন্যে, (দুই) আটচল্লিশ এগারো বারোয় প্রাণ সঞ্চার করার জন্যে।
দুটোর কোনওটারই কিন্তু কোনও সুরাহা হল না।
বিবি এগারো বারো গুদামে জমা পড়ে গিয়েছিল। অনেকগুলো গুদাম ঘর তার মধ্যে শত শত মৃত টেলিফোনের শবদেহ, বর্তমানে বা ভবিষ্যতে সেগুলো কার কী কাজে লাগবে সেটা কেউই জানে না।
দু-চারদিন চেষ্টা করার পরই বোঝা গেল গুদাম থেকে বিবি এগারো বারোকে পুনরুদ্ধার করা অসম্ভব। তা ছাড়া টেলিফোন অফিসের কাউন্টারের দিদিমণি ইতিমধ্যে নানারকম বিপজ্জনক প্রশ্ন করতে শুরু করেছেন।
আমাদের কানেকশন ছিল না তবু রিসিভার পেলাম কোথা থেকে, ওই বাতিল পুরনো রিসিভার আমাদের কী কাজে লাগবে, রিসিভারটার নম্বর মিলিয়ে দেখতে হবে ওটা চোরাই রিসিভার কি না। এই সব খারাপ প্রশ্ন।
আমি তখন অল্প কিছুদিন ল কলেজে যাতায়াত আরম্ভ করেছি। ফৌজদারি দণ্ডবিধির রিসিভার অফ স্টোলেন প্রপার্টিস কথাটির সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। রিসিভার অফ স্টোলেন রিসিভার হলে কী হতে পারে, ভয় পেয়ে পিছিয়ে এলাম। বিবি এগারো বারোর আশা ছেড়ে দিলাম।
কিন্তু আটচল্লিশ এগারো বারো, ওই ফোর এইট ওয়ান ওয়ান ওয়ান টু ফোনটাও চালু হল না। প্রত্যেক দিনই শুনি পরের দিনই কানেকশন পাওয়া যাবে। বৃষ্টিতে রাস্তায় জল জমে কেবল ডুবে গিয়েছে, জল শুকোলেই লাইন ঠিক হবে। যার লাইন দেয়ার কথা, সেই যন্ত্রীর চিকেন পক্স হয়েছে। অথবা, তিনি শ্রীরামপুর থেকে আসেন এখন রেল অবরোধ চলছে বলে আসতে পারছেন না।
একেকদিন একেকসময় একেকরকম অজুহাত। অনেক সময় বিরক্তি ও উষ্মা প্রকাশ।
আমরা প্রায় হাল ছেড়েই দিয়েছিলাম।
হঠাৎই চার সপ্তাহের মাথায় একদিন সকাল আটটা বত্রিশ মিনিট একুশ সেকেন্ডে, সময়টা আমরা ডায়েরিতে নোট করে রাখি টেলিফোন কর্তৃপক্ষকে জানানোর জন্যে, টেলিফোনটা পরপর তিনবার টিং টিং করে বেজে উঠল। হইচই পড়ে গেল আমাদের বাড়িতে, কিন্তু ফোনটা তুলে কোনও ডায়ালটোন পাওয়া গেল না।
এর পরেও কিছুক্ষণ পরপর ওই রকম তিনবার টিং টিং হতে লাগল। আমরা বিশদ বিবরণ এবং সময়-টময় জানিয়ে টেলিফোন অফিসে চিঠি দিলাম।
দিন পনেরো পরে টেলিফোন দপ্তর থেকে জানা গেল আমাদের রিসিভারটা খারাপ হয়ে গেছে ওটা বদলাতে হবে।
রিসিভারটা ভালই বা ছিল কবে যে খারাপ হয়ে গেল, তা বুঝতে পারলাম না। কিন্তু কী করে খারাপ রিসিভারের কথাটা জানাজানি হয়ে গেল। দলে দলে লোক টেলিফোন কোম্পানি থেকে আসছি বলে আমাদের বাড়িতে এসে কড়া নাড়তে লাগল এবং লোভনীয় সব রঙের রিসিভার দেখাতে লাগল, মাত্র একশো টাকার বিনিময়েই যেকোনও একটা পাওয়া যাবে।
