ABC Suppliers
BB 1112
সেই থেকে বি বি এক এক এক দুই আমাদের সঙ্গে রয়ে গেল। বি বি মানে বড়বাজার, বড়বাজার এক্সচেঞ্জ, এখন যেমন ফোর ফাইভ ডবল টু তখন ছিল বড়বাজার, পার্ক সার্কাস এই রকম এক্সচেঞ্জের নাম ফোন নম্বরে। মাথা গোঁজার তাগিদে এই পোড়া বিদেশি শহরে বাক্স বিছানা ঘাড়ে করে কত যে ঘুরপাক খেলাম। বি বি এক এক এক দুই কিন্তু তদবধি আমাদের সঙ্গে রয়ে গেল।
ফোনের লাইন নেই, কানেকশন নেই শুধু একটা জলজ্যান্ত রিসিভার আমাদের বাড়িতে বাইরের ঘরে এ জিনিস দেখে অনেকে বিস্মিত হত। কেউ কেউ ভুল করে ফোন করতে গিয়ে জব্দও হয়েছে।
তবে এ জাতীয় ব্যাপার আমাদের বাড়িতে ঘটে থাকে। আমার দাদা একবার রেডিয়োর এরিয়েল জলের দরে পেয়ে কিনে এনেছিল তখন আমাদের কোনও রেডিয়ো নেই। বিজন আমার ছোট ভাই, চাঁদনি চক থেকে একটা অ্যান্টেনা কিনে আনল কারণ সেটা তার সামর্থ্যের মধ্যে, আর কিনে আনল এই আশায় যে আমি যদি টিভিটা কিনি, অ্যান্টেনা ব্যবহার করার জন্যেই কিনব। এরও পরে আমার স্ত্রী মিনতি গ্যাসের উনুন কিনেছিলেন গ্যাসের সিলিন্ডার আসার ঢের আগে।
ঘোড়ার আগে লাগাম জোগাড় করে পরে সেই লাগামের জন্যে ঘোড়ার পিছনে আমরা অনেক ছুটেছি। সুতরাং টেলিফোনের রিসিভারটার জন্যে এক সময় একটা কানেকশনের দরখাস্ত আমাদের করতে হল।
ততদিনে বি বি এক এক এক দুই আমাদের সংসারে, দেবত্ব অর্জন করেছে। কষ্টি পাথরের মতো, শালগ্রাম শিলা কিংবা শিবলিঙ্গের মতো কালো কুচকুচে বলেই তোক বা অন্য কারণেই হোক আমার পিসিমা তার অন্যান্য তেত্রিশ কোটি দেবদেবীর সঙ্গে জুড়ে দেন বি বি এক এক এক দুই। পিসিমা বলতেন বিবি এগারো বারো। তিথিপর্বে সিঁদুর, চন্দনের ফোঁটা পরানো হত, ফুল বেলপাতাও দেয়া হত বিবিকে। শেষের দিকে দেখেছি ছোট স্টেনলেস স্টিলের থালায় বাতাসা বা নকুলদানাও রাখা হত। পিসিমা বলতেন, বি বি এগারো বারো খুব জাগ্রত।
আমরা বলতাম, এখনও জাগ্রত নয়, তবে জাগ্রত করার চেষ্টা চলছে, অর্থাৎ কানেকশন আনার চেষ্টা হচ্ছে।
কিন্তু আমাদের গোড়ায় গলদ হয়েছিল। আমরা কেউ খেয়ালই করিনি যে এই আদ্যিকালের ভারী টেলিফোনটা এই অটোমেটিকের যুগে চলবে না। এই টেলিফোনে ডায়াল করার কোনও ব্যাপার নেই।
অবশেষে একদিন সর্বনাশটা ঘটল। আমরা কেউ বাসায় নেই, সেদিন উলটো রথ না কি যেন, পিসিমা গেছেন কালীঘাট মন্দিরে, এই রকম একটা দুপুরবেলায় টেলিফোনের লোকেরা এসে কানেকশন দিয়ে গেল আমাদের বাড়িতে।
তখন বাসায় একা কাজের লোক ছিল। তাকে আগেই ভাল করে বুঝিয়ে বলা ছিল যে বাইরের ঘরের টেবিলে বিবি এগারো বারোর পাশেই নতুন টেলিফোনটা বসবে। কারণ আমরা ধরেই নিয়েছিলাম যে দুপুরবেলায় যখন আমরা কাজেকর্মে বাড়ির বাইরে থাকব তখনই কানেকশন দিতে, লাইন বসাতে টেলিফোন অফিসের লোক আসবে। তাই আসে।
কিন্তু আমরা ভাবতে পারিনি যে পিসিমাও বাড়িতে থাকবেন না। পিসিমা বাড়িতে থাকলে তার আরাধ্য দেবতা বিবি এগারো বারো আমাদের হাতছাড়া হত না, হাতছাড়া হওয়া সম্ভব ছিল না।
০২. ফোর এইট ওয়ান ওয়ান ওয়ান টু
আটচল্লিশ এগারো বারোর বৃত্তান্ত আরম্ভ করার আগে বিবি এগারো বারো কী করে আমাদের হাতছাড়া হয়েছিল সে কথা অবশ্যই বলতে হবে। আসলে দুটো একই ব্যাপার।
সেই উলটোরথ নাকি ঝুলন পূর্ণিমা তা সে যাই হোক না কেন, এক ঝিরিঝির বরষার পুণ্য দিবসে টেলিফোন কোম্পানির লোকেরা আমাদের কালীঘাটের বাড়িতে টেলিফোন বসিয়ে গেল।
আমাদের বহুকালের অভিভাবিকা পুরনো কাজের লোক কুড়ানির মা তখন আমাদের দেখাশোনা করত। সে দেশ থেকে আমাদের কাছে এসেছিল, আমাদের কাছেই আমৃত্যু ছিল। তার কেউ ছিল কি না তার কোনও খবর আমরা রাখতাম না, সেও বোধহয় রাখত না। তার মৃত্যুর পরে কেওড়াতলা শ্মশানে দাদা তার মুখাগ্নি করেছিল।
কুড়ানির মার কথা কবে যেন অন্য কোথায় লিখেছিলাম এখানে শুধু একটা কথা বলে রাখি। কুড়ানির মার আসল নাম ছিল কুড়ানি, শুধুই কুড়ানি। কিন্তু বয়েস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে এত তাড়াতাড়ি বুড়ো হয়ে যায় যে স্বাভাবিক ভাবেই আমরা তাকে কুড়ানির মা বলে ডাকতে থাকি এবং সেও এতে মোটেই আপত্তি করেনি। শুধু একবার বলেছিল, আমি আবার মা ছিলাম কোন জন্মে?
কুড়ানির মা আমাদের সব জিনিসপত্র এমনকী স্মৃতি আগলে রাখত। হঠাৎ হঠাৎ বলে বসত, আজ তো বৈশাখ মাসের প্রথম রবিবার, আজ বিকেলে তো হরিপাগলার মেলা। কোথাকার কে হরিপাগলা, কবেকার এক গেঁয়ো মফসসল শহরের উপান্তে তার নামে মেলা বসত বাংলা সনের প্রথম রবিবারে, কুড়ানির মা ছাড়া সেসব স্মৃতি কেই বা মনে রেখেছিল?
কুড়ানির মা ছাড়া কেই বা দীপান্বিতা শ্যামাপুজোর আগের ভূত চতুর্দশীর সন্ধ্যায় হঠাৎ প্রদীপের সলতেগুলোয় বাতি জ্বালাতে জ্বালাতে বলে উঠত, এই সন্ধ্যায় বড়বাবা স্বর্গে গিয়েছিল,বড়বাবা মানে আমাদের ঠাকুরদা।
আমাদের মা বাবা তখন দেশে রয়েছেন, আমরা পিসিমার সঙ্গে কলকাতায়, কুড়ানির মা-ও দেশ থেকে এসেছে। সেও ছোটবেলা থেকেই আমাদের দেখছে।
এতদিন পরে মনে হয় আমাদের অভিভাবকত্ব নিয়ে আমাদের ভালমন্দ দেখাশোনার ব্যাপারে পিসিমার সঙ্গে বুঝি তাঁর অদৃশ্য একটা রেষারেষি ছিল।
