গত শ্রাবণ মাসে যথানির্দিষ্ট দিনে এক বাদল ঝরঝর গোধূলি লগ্নে জয়ন্তের সঙ্গে রমার বিয়ে হয়ে গেছে।
পঙ্কজবাবু অবশ্য জয়ন্তের বিয়েতে যাননি। উপহার কেনার পয়সা তার নেই।
বিবি এগারো বারো
বি বি ওয়ান ওয়ান ওয়ান টু
সাদাত কলেজ করটিয়ার প্রিন্সিপ্যাল ইব্রাহিম খান সাহেব খুব কড়া অধ্যক্ষ ছিলেন। তাঁরই আমলে সাদাত কলেজ ফাস্ট গ্রেড কলেজে উন্নীত হয়।
ফার্স্ট গ্রেড কলেজ মানে বি. এ ক্লাস পর্যন্ত। তার আগে সাদাত কলেজে আই. এ. পর্যন্ত পড়ানো হত। তখন কলকাতা ছাড়া সারা বঙ্গপ্রদেশে বি. এ. পর্যন্ত পড়ার কলেজ সামান্য সংখ্যক ছিল, বলা যায় আঙুলে গোনা যেত।
কলেজ ফার্স্ট গ্রেড হওয়ার পর প্রিন্সিপ্যাল ইব্রাহিম খান এম, এ, বি. এল আরও কড়াকড়ি শুরু করলেন। বি. এ. পরীক্ষার আগে প্রিটেস্টে আর টেস্টে যারা সব বিষয়ে পাশ করেনি তাদের তিনি ফাঁইনাল পরীক্ষার জন্যে নির্বাচন করতেন না। তার বক্তব্য ছিল, বি. এ. পরীক্ষা ছেলেখেলা নয়, এই পরীক্ষা প্রথম দিয়েছিলেন সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র, এই পরীক্ষা পাশ করলে গ্র্যাজুয়েট হয়, এই পরীক্ষার মান রক্ষা করতে হবে, যারা পরীক্ষা দিতে বসবে তারা যেন পরীক্ষার যোগ্য হয়।
প্রিন্সিপ্যাল সাহেবের এই রকম কড়াকড়ির যুগে মীরের বেতকা গ্রামের বকর ভাই, আবু বকর চৌধুরী পর পর তিনবার বি. এ পরীক্ষার টেস্টে ডিসঅ্যালাউ হলেন এবং অবশেষে লেখাপড়া ছেড়ে দিলেন।
বকর ভাই আমার কাকার সঙ্গে স্কুলে সহপাঠী ছিলেন। সহপাঠী এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কাকা ম্যাট্রিক পাশ করে ঢাকা জগন্নাথ কলেজে পড়তে গিয়েছিলেন। বকর ভাই করটিয়ায় সাদাত কলেজে।
বি. এ পরীক্ষায় বসতে না পারার দুঃখে বকর ভাই বাড়ি ছাড়লেন, কলকাতায় এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়িতে চলে এলেন ব্যবসা করতে, বিভিন্ন সরকারি অফিসে কী সব টুকটাক জিনিসপত্র সাপ্লাই করতেন। যুদ্ধের বাজারে হঠাৎ বড়লোক হয়ে উঠলেন বকর ভাই, কলকাতায় ক্লাইভ স্ট্রিটে নিজের আলাদা অফিস করলেন, মীরের বেতকায় গ্রামের বাড়িতে দোতলা পাকা দালান বানালেন, পুকুরের ঘাট বাঁধালেন, আটিয়ার পুরনো মসজিদ একবার নিজের পয়সায় আগাগোড়া চুনকাম করিয়ে দিলেন।
ক্লাইভ স্ট্রিটে যে অফিস করেছিলেন বকর ভাই তার নাম দিয়েছিলেন এ-বি-সি সাপ্লায়ার্স। এ-বি-সি হল আবু বকর চৌধুরীর নামের আদ্যক্ষর সমষ্টি।
ব্যবসা ভালই চলছিল বকর কাকার কিন্তু এর মধ্যে যুদ্ধ শেষ হল, ছেচল্লিশের ষোলোই আগস্টের দাঙ্গায় কলকাতা তছনছ হয়ে গেল, স্বাধীনতা এল, দেশ ভাগ হল, আমাদের দিকের দেশটা পাকিস্তান হয়ে গেল, কিন্তু বকর ভাই কলকাতায় রয়ে গেলেন। তার এ-বি-সি সাপ্লায়ার্স তখন আর তেমন চলছে। তবু অফিসটা ছিল, মাঝেমধ্যে ছুটিছাটায় বাড়ি যেতেন বকর ভাই, বাকি সময় কলকাতাতেই অফিস আগলাতেন। থাকতেন পার্কসার্কাসে, সেখান থেকে ট্রামে ডালহৌসি হয়ে ক্লাইভ স্ট্রিটের অফিস।
ততদিনে আমরাও অনেকেই কলকাতায় চলে এসেছি। বকর ভাই আমার কাকার বন্ধু ছিলেন, গ্রাম সুবাদে তাকে আমাদের বকর চাচা বলা উচিত, কিন্তু আর সকলে বকর ভাই ডাকত বলে আমরাও তাই ডাকতাম। সে যা হোক, বকর ভাই প্রায় নিয়মিতই আমাদের পুরনো কালীঘাটের বাড়িতে আসতেন।
বকর ভাইয়ের ওই এ-বি-সি সাপ্লায়ার্সের অফিসে একটা ফোন ছিল। তখন ঘরে ঘরে ফোনের এত ছড়াছড়ি ছিল না, একটা পাড়ায় দু-চারটে বাড়ির খোঁজ করলে ফোন দেখা যেত, এমনকী সব অফিসেও ফোন ছিল না।
বকর ভাইয়ের অফিসের ফোন নম্বর ছিল বড়বাজার এক হাজার একশো বারো, সংক্ষেপে ইংরেজিতে বি বি ওয়ান ওয়ান ওয়ান টু ( বি বি ১১১২)। তখনও এখনকার মতো অটোমেটিক ফোন। চালু হয়নি। ফোন তুলে এক্সচেঞ্জে নম্বর চাইতে হত।
ব্যবসাপত্র কলকাতায় ভাল চলছিল না। দিনকালও ভাল নয়। অবশেষে বকর ভাই ঠিক করলেন ব্যবসাপত্র গুটিয়ে দেশে ফিরে যাবেন।
চলে যাওয়ার আগের দিন আমাদের বাসায় এলেন হাতে একটা ভারী রেশনব্যাগ। অল্পবিস্তর কথাবার্তার পর ব্যাগের ভিতর থেকে বার করলেন একটা টেলিফোনের রিসিভার, কষ্টিপাথরের মতো কালো কুচকুচে সে একটা প্রমাণ সাইজের টেলিফোন যন্ত্র। আজকালকারগুলোর মতো খেলনা জিনিস নয়। রীতিমতো ভারী অন্তত দেড়সের, দুসের ওজন হবে। তার সঙ্গে কয়েক হাত লম্বা তার রয়েছে, সে তারও এক আঙুল মোটা, আজকালের তারের মতো ফিনফিনে নয়।
ফোনটার কথা বলার জায়গায় বেশ চওড়া করে ছড়ানো একটা চোঙার মতো জিনিস রয়েছে। কানে দেওয়ার জায়গাটাও বেশ বড়।
বকর ভাই বললেন, এ জিনিস আর একালে পাওয়া যাবে না। আসল বেল কোম্পানির সাবেকি জিনিস। অফিসের ফোনটা কাল থেকে কাটিয়ে দিয়েছি কিন্তু কোম্পানি থেকে এসে রিসিভারটা নিয়ে গেল না। এটা আর দেশে নিয়ে গিয়ে কী কাজ হবে। বর্ডারে কাস্টমসেও ধরতে পারে। তোমাদের কাছে রেখে যাচ্ছি। যদি কখনও ফিরে আসি, ফেরত নিতেও পারি, না হলে তোমাদেরই থাকবে।
ফোনটা রেখে বকর ভাই দেশে চলে গেলেন। পরে দেশ থেকে তার একটা সংক্ষিপ্ত পৌঁছ সংবাদ এসেছিল। কিন্তু তার সঙ্গে আর কখনও দেখা হয়নি। বকর ভাই চলে যেতে আমরা ভাল করে ফোনটা দেখলাম। সাদা কাগজ এঁটে কালো ফোনটার গায়ে লাগানো, তাতে লেখা,
