সুহাসিনী ভ্রুক্ষেপ করেননি। প্রয়োজনীয় জিনিসের জন্যে তার মাথাব্যথা কম।
কিন্তু কিছু মাথাব্যথা পঙ্কজবাবুকে করতেই হয়।
আজকাল বাইরে বেরোনো প্রায় বন্ধই হয়ে গেছে। কিন্তু অফিসে তো যেতে হয়। জামাকাপড়, জুতোর সঙ্গীন অবস্থা। বছরে দুবার শ্বশুরবাড়ি থেকে পুজোয় এবং জামাইষষ্ঠীতে শার্টপিস, প্যান্টপিস দেয়। কিন্তু সেগুলো তৈরি করতে পয়সা লাগে। তা ছাড়া জুতো, কোট প্যান্ট।
বিয়ের আগের আর্থিক সচ্ছলতার দিনগুলি স্মরণ করে আজকাল প্রায়ই উদাসীন হয়ে যান রিক্ত, নিঃস্ব পঙ্কজবাবু।
তখন পঙ্কজবাবু দামি সিগারেট দৈনিক প্রায় বিশ-পঁচিশটা খেতেন। সপ্তাহে অন্তত দুদিন ক্লাবে বসে বন্ধুদের সঙ্গে দুয়েক পেগ হুইসকি। রবিবারে দুপুরবেলায় এক বোতল বিয়ার। বৎসরান্তে একপ্রস্থ নতুন স্যুট, একজোড়া ভাল জুতো। মাসের প্রথম দিকে চিনে হোটেলে ডিনার কিংবা পার্ক স্ট্রিটের রেস্তোরাঁয় তন্দুরি। একটু-আধটু ছুটি পেলে পুরী-দিঘা অথবা দার্জিলিং।
পঙ্কজবাবু দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে ভাবেন, সেই যে বিয়ের পরে মধুচন্দ্রিমায় কালিম্পং গিয়েছিলেন, তারপরে আর কলকাতার বাইরে বেরোনো হয়নি। শুধু অফিস আর বাড়ি, বাড়ি আর অফিস। ক্লাবে-রেস্তোরাঁয় পর্যন্ত যাওয়া হয়নি।
সাধারণত বউয়েরাই বাইরে যাওয়ার জন্যে, বাইরে খাওয়ার জন্যে জোরাজুরি করে কিন্তু এসব বিষয়ে শ্রীমতী সুহাসিনী নির্বিকার। তার শুধু অবান্তর জিনিস কেনার অফুরন্ত বাসনা।
সেই বাসনাই পঙ্কজবাবুকে ডুবিয়েছে। তিনি কখনও ভাবতে পারেননি কারফাটা শার্ট, ছেঁড়া মোজা, তাপ্লিমারা জুতো, ময়লা ইস্ত্রিহীন পুরনো কোট পরে অফিস যেতে হবে।
আজকাল সব রকম আর্থিক দুর্গতির জন্যে নিজেকে দুষছেন পঙ্কজবাবু। বারবার মনে মনে। বলছেন, না, বিয়ে করাটা মোটেই ঠিক হয়নি আমার।
এই রকম ভাবতে ভাবতে যেমন হয়, ক্রমশ বিবাহ-বিদ্বেষী হয়ে পড়েছেন তিনি। কোথাও কেউ বিয়ে করছে জানলেই তিনি ভাবী বরকে বিয়ে করা থেকে নিরস্ত করার চেষ্টা করেন।
এতে যে খুব কাজ হয় তা মোটেই নয়। কেউ বিয়ে করতে চাইলে, তারপর পাত্রী পেয়ে গেলে, তার বিয়ে ঠেকানো মুশকিল। তবু কেউ যাতে নতুন করে বিয়ে করে না পস্তায় সেই জন্যে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন পঙ্কজবাবু।
নানাভাবে বিয়ে ঠেকানোর চেষ্টা করেন তিনি। দুঃখের বিষয়, কখনও কখনও ভাংচিও দেন। খুব সূক্ষ্ম ভাংচি। অপরিচিতা পাত্রীর নামে কাল্পনিক নিন্দামন্দ নয়, পুরো বিয়ের ব্যাপারটাকেই তিনি ভাংচি দেওয়ার চেষ্টা করেন। বিবাহিত জীবন যে মোটেই সুখের জীবন নয়, এ কথা তিনি আকারে-প্রকারে হবু বরদের হৃদয়ঙ্গম করানোর চেষ্টা করবেন।
সেই বন্দোবস্তের ব্যাপারটা বলার জন্যই এই বিবাহঘটিত কাহিনি।
অবান্তর প্রসঙ্গ বহু হল। এবার মুল ঘটনা।
সেদিন অফিসে তার এক কনিষ্ঠ সহকর্মী জয়ন্ত, বয়েস বড়জোর পঁচিশ-ছাব্বিশ হবে, এসে পঙ্কজবাবুকে বলল, মি. চক্রবর্তী, সামনের মাসে আমি দুসপ্তাহ ছুটি নিচ্ছি। বড়সাহেব কিছু জিজ্ঞাসা করলে বলবেন, কোনও অসুবিধে হবে না।
সে আমি চালিয়ে নেব, পঙ্কজবাবু বললেন, কিন্তু ছুটি নিচ্ছ কেন?
একটু লজ্জিতভাবে জয়ন্ত বলল, আমি বিয়ে করছি।
বিয়ে! ইলেকট্রিক শক লাগার মতো চমকে উঠলেন পঙ্কজ। মনে মনে ভাবলেন আরেকটা মানুষের দুঃখের দিন ঘনিয়ে আসছে। মনোভাব প্রকাশিত না করে জিজ্ঞাসা করলেন, পাত্রী কেমন?
জয়ন্ত বলল, আমাদের অফিসেরই ডেসপ্যাচ দপ্তরের রমা পাল।
পঙ্কজ জিজ্ঞাসা করলেন, ভাব-ভালবাসা হয়েছে তার সঙ্গে?
জয়ন্ত বলল, ঠিক আমার সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠতা এখনও হয়নি। তবে আমার বন্ধু নবীন রমার সঙ্গে দুবছর প্রেম করেছে। নবীন বলেছে, রমা ভাল মেয়ে। ওর কথাতেই বিয়ে করছি।
জয়ন্তর কথা শুনে পঙ্কজ তাজ্জব হয়ে গেলেন। বিয়ের পরে জীবনের স্বাদ কেমন হয় একে টের পাওয়াতে হবে, এই রকম ভেবে নিয়ে তিনি জয়ন্তকে বললেন, কনগ্রাচুলেশন, এর পরে তো সময় পাব না, তুমিও ছুটিতে চলে যাবে, আজকেই সন্ধ্যায় তোমাকে আমি আইবুড়ো-ভাত খাওয়াব।
জয়ন্ত রাজি হয়ে গেল। ঠিক হল, অফিস ছুটির পর দুজনে একসঙ্গে পঙ্কজবাবুর বাড়িতে যাওয়া হবে।
পঙ্কজবাবু বাড়িতে ফোন করে সুহাসিনীকে জানালেন যে সন্ধ্যাবেলা একজন অতিথি আমাদের সঙ্গে খাবে।
এ কথা শুনে সুহাসিনী আকাশ থেকে পড়লেন, আমাদের বাড়িতে আজ সন্ধ্যাবেলায় অসম্ভব।
পঙ্কজ বললেন, কেন?
সুহাসিনী বললেন, ভাড়ার শূন্য। ফ্রিজেও কিছু নেই। আলুচচ্চড়ি আর রুটি ছাড়া কিছুই হবে না। তা ছাড়া সামনের দরজার পর্দা থেকে বিছানার বেডকভার সব ঘেঁড়া, ময়লা। ঘরভরতি গাদাগাদা জিনিস, খাওয়ার টেবিল পর্যন্ত পৌঁছতে গেলে সে-সব টপকাতে হবে। এদিকে মেয়েটার গা। গরম।…
পঙ্কজবাবু আর কথা বাড়াতে দিলেন না। বললেন, এতেই যথেষ্ট হবে।
এসব কাহিনি শেষ হয় না।
শুধু এটুকু না বললে দোষ হবে যে পঙ্কজবাবু যে আশা করেছিলেন যে এতেই যথেষ্ট হবে, তা হয়নি।
সেদিন জয়ন্ত পঙ্কজবাবুর বাড়িতে নৈশাহার করেছিল। বালতির এবং স্টিলের বাসনের পাহাড় ডিঙিয়ে, ময়লা টেবিলে পৌঁছে সে আলুর চচ্চড়ি দিয়ে রুটি রীতিমতো তারিফ করে খেয়েছিল। নোংরা ঘরদোর, ছেঁড়া পর্দা, ময়লা বিছানা কিছুই জয়ন্ত লক্ষ করে দেখেনি। যদিও রুটি দিয়ে আইবুড়ো-ভাত, তবুও আসন্ন বিয়ের মৌতাতে সে এতই মশগুল যে পঙ্কজবাবু কিছুতেই বিবাহিত জীবনের দুর্ভোগ বোঝাতে পারলেন না।
