শাড়ি-গয়না কেনেন?
কিন্তু তা তো নয়। তা হলে তো চোখে পড়ত।
বাপের বাড়িতে সাহায্য করেন?
কিন্তু তাও তো নয়। পঙ্কজবাবু ভালই জানেন, সুহাসিনীর পিত্রালয়ের অবস্থা বেশ ভাল। পঙ্কজবাবুর শ্বশুর নামী ব্যাঙ্কে উচ্চপদস্থ অফিসার, শাশুড়ি ঠাকরুণ কলেজে অধ্যাপিকা। দুজনে মিলে অন্তত পঁচিশ-তিরিশ হাজার টাকা মাসে আয় করেন। দায়দায়িত্বও বিশেষ কিছু নেই। সুহাসিনীর এক দিদি আছেন, তিনি জামশেদপুরে থাকেন। তারও স্বামীর এঞ্জিনিয়ারিং জিনিসপত্তরের ব্যবসা, বেশ বড়লোক তারা।
তবে?
সুহাসিনী কেন স্বামীর টাকা চুরি করেন? তার এত কী দরকার টাকার?
প্রথম দিকে এ নিয়ে অনেক রকম চিন্তাভাবনা করেছেন পঙ্কজবাবু। ভেবেচিন্তে কোনও লাভ হয়নি, কোনও কূলকিনারা পাননি।
উলটোপালটা টাকা, বেশি বেশি টাকা কাঁদের দরকার পড়ে? যারা রেসের মাঠে যায়, যারা মদ খায় বা অন্য কোনও দামি নেশা করে তাদের খুব টাকার দরকার। কিন্তু সুহাসিনীর এসব দোষ নেই, থাকা সম্ভব নয়। একটু তাসের জুয়াখেলা শিখেছে, সেও পঙ্কজই শিখিয়েছেন।
তাহলে আর কী হতে পারে?
শাড়ি-গয়না, বিলাসসামগ্রী? কিন্তু নতুন বিয়ের পর মেয়েদের এত বেশি গয়নাগাঁটি, দামি শাড়ি, পারফিউম হঠাৎ হয়ে যায় যে বেশ কিছুদিন এ ব্যাপারে নবোঢ়ার মনে অনীহা ভাব থাকে। তা ছাড়া এজাতীয় বিলাসিতার প্রতি সুহাসিনীর যে খুব আকর্ষণ আছে সেটা পঙ্কজবাবুর কখনওই মনে হয়নি।
তা হলে?
অল্প কিছুদিনের মধ্যে ব্যাপারটা পঙ্কজবাবু টের পেলেন।
একদিন লক্ষ করলেন বাড়িতে প্লাস্টিকের বালতি বড় বেশি হয়ে গেছে। লাল, নীল, হলুদ কতরকমের যে বালতি-বাথরুমেই পাঁচটা, বাথরুমের বাইরে দরজার সামনে দুটো, রান্নাঘরে আট-দশটা, অধিকাংশ জলের জন্যে, যদিও ট্যাপ রয়েছে, দুয়েকটায় অবশ্য চাল-গম রাখা আছে। এ ছাড়া খাটের নীচে সারি সারি নতুন বালতি।
এত বালতি দিয়ে কী হবে? এত বালতি সুহাসিনী পেলেন কোথায়? নিশ্চয় কিনেছেন! কিন্তু কিনলেন কেন?
সুহাসিনীকে প্রশ্ন করায় তিনি বললেন, একটা বালতিও কিনিনি। সব বিনে পয়সায় পেয়েছি।
বিনে পয়সায়? বালতি? পঙ্কজবাবু অবাক। দাঁতব্য ঔষধালয় হয়, দাঁতব্য লঙ্গরখানা হয়, কিন্তু দাঁতব্য বালতি-বিলি হয় একথা ভাবা কঠিন।
ব্যাপারটা সুহাসিনীই খোলসা করলেন। প্রতি পাঁচ কেজি প্যাকেটের গুঁড়ো সাবানের একটা নতুন ব্র্যান্ডের সঙ্গে একটা করে বালতি ফ্রি দিচ্ছে।
আঁতকে উঠলেন পঙ্কজবাবু, এত গুঁড়ো সাবান দিয়ে কী করব আমরা?
সুহাসিনীর পরিষ্কার জবাব, সাবান তো পচবে না। ইস্টুরে-পিঁপড়েতে খেয়ে নেবে না। সব চিলেকোঠা ঘরে জমিয়ে রেখেছি।
এইভাবে শতাধিক জাম্বো সাইজের টুথপেস্ট কিনে সমসংখ্যক ফ্রি টুথব্রাশ সংগ্রহ করেছেন সুহাসিনী। এ জীবনে আর বোধহয় টুথব্রাশ কেনার দরকার হবে না।
এই তালিকা দীর্ঘ করে লাভ নেই। শুধু আর একটার কথা বলছি। নুনের না মশলার কীসের যেন প্যাকেটের সঙ্গে এক পাতা বিন্দি অর্থাৎ মেয়েদের কপালের টিপ উপহার দিচ্ছে। বাড়িতে পাহাড়প্রমাণ, বারান্দায় চিলেকোঠায় ছাদ পর্যন্ত উঁচু নুন-মশলার প্যাকেট জমে গেছে আর যে পরিমাণ বিন্দি সংগৃহীত হয়েছে তা দিয়ে কলকাতা শহরের সব বয়েসের সব মেয়ের কপালে একটা করে টিপ পরানো যায়।
এর সঙ্গে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে দূরদর্শনের আপকা বাজার। এই দেখাচ্ছে রুটি বানানোর মেশিন, দাম মাত্র আড়াই হাজার টাকা। ঘর মোছার কল দেড় হাজার টাকা। কাগজ কুচি করার যন্ত্র তিন হাজার টাকা।
মাসে মাসে বাড়িতে নতুন নতুন যন্ত্র আসছে। হাঁটাচলা অসম্ভব হয়ে গেছে। টাকার ব্যাপারটা আর সামাল দিতে পারছেন না পঙ্কজবাবু। এদিকে সুহাসিনীর কেনাকাটা বেড়েই চলেছে।
দ্বিতীয় তরঙ্গ: পঙ্কজবাবুর প্রতিক্রিয়া
বিয়ের পরে বছর দুয়েক চলে গেছে, এর মধ্যে একটা সন্তান, মেয়ে হয়েছে পঙ্কজ-সুহাসিনীর।
কিন্তু সুহাসিনীর আর্থিক আচরণের মোটেই উন্নতি হয়নি, বরং অবনতি হয়েছে।
স্টেইনলেস স্টিলের থালাবাসনে বাড়ি ভরতি। এগুলো সুহাসিনী কিস্তিতে কেনেন। ভাগ্যিস আগের নুনের প্যাকেটগুলো গত বর্ষায় গলে জল হয়ে গিয়েছিল! ফলে সেখানে জায়গা বেরিয়েছে, সেই জায়গায় কিস্তিতে কেনা থালা-বাসন, ঘটি-বাটি রাখা হচ্ছে।
.
বাচ্চা হওয়ার পরে সংসারের খরচ অনেকটাই বেড়েছে। এদিকে জিনিসপত্রের দামও হু-হুঁ করে বেড়ে যাচ্ছে। সুহাসিনীর হাতটানও বেড়েছে। পঙ্কজবাবু আর সামাল দিতে পারছেন না।
সুহাসিনী অবশেষে বাজার খরচের টাকাও উলটোপালটা খরচ করা আরম্ভ করেছেন।
ফলে বাড়ির রান্না বান্নার হাল দাঁড়িয়েছে খুবই দুঃখজনক। দুপুরে ভাত-ডাল আর অর্ধেক ডিমের ঝোল। রাতে রুটি আর কুমড়োছক্কা কিংবা বেগুনভর্তা, বড়জোর সস্তার সময়ে আলু-পটল কিংবা আলু-ফুলকপির তরকারি। তবে অধিকাংশ রাতেই আলুচচ্চড়ি।
ঘরের পাপোশগুলো ছিঁড়ে গেছে। জানলা-দরজার পর্দাগুলোও ছিঁড়ে গেছে। তা ছাড়া সেগুলো ময়লা, এত ময়লা যে হাত দিলে আঠা আঠা লাগে। বিছানার চাদর, বালিশের ওয়াড়, স্নানের তোয়ালে ইত্যাদির ভয়াবহ অবস্থা। একদিন পঙ্কজবাবু সুহাসিনীকে ছেঁড়া তোশক আর ছেঁড়া বালিশ দেখিয়ে বলেছিলেন, ঠিক শ্মশানের বিছানার মতো দেখাচ্ছে।
