পঙ্কজবাবু বললেন, সেটাও আমি লক্ষ করেছি।
তুমি আমাকে ধন্যবাদ দিলে না যে! সুহাসিনী অনুযোগ করলেন।
শুষ্ক কণ্ঠে পঙ্কজ বললেন, তার আগে তুমি আমাকে বলো কী ভাবে তুমি জানতে পারলে যে আমার কোটের পকেটে ফুটো আছে?
.
অবশ্য এই প্রথম নয়।
অন্যান্য অনেক গৃহিণীর মতো স্বামীর পকেট হাতড়ানো সুহাসিনীর হবি। শুধু হবি নয়, পকেট থেকে অর্থাগম যথেষ্ট হয়। স্বামী তার হাতখরচার জন্যে সামান্য দুদশ টাকা যেটুকু আলাদা করে রাখেন, সবটা তার ভোগে লাগে না। স্ত্রীর তার অধিকাংশই গায়েব করেন।
মাত্র দুবছর বিয়ে হয়েছে পঙ্কজ-সুহাসিনীর। প্রায় প্রথম থেকেই সুহাসিনীর হাতসাফাইয়ের দক্ষতা দেখে পঙ্কজ তাজ্জব হয়ে আছেন।
বিয়ের পরে পরেই একদিন সুহাসিনী পঙ্কজকে বললেন, ওগো আমার বিয়ের আংটিটা আঙুল থেকে খসে কোথায় পড়ে গেছে। সারা বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজেছি, কোথাও তো পাচ্ছি না।
পঙ্কজ হাসতে হাসতে বলেছিলেন, তোমার আংটিটা আমার কোটের পকেটে পেয়েছি। এই বলে টেবিলের ড্রয়ার খুলে আংটিটা বার করে পরমযত্নে সুহাসিনীর অনামিকায় পরিয়ে দিলেন।
দুজনায় এ নিয়ে খুব হাসাহাসি করলেন, অজ্ঞতার ভান করে সুহাসিনী পঙ্কজকে বললেন, আচ্ছা আমার আংটিটা তোমার পকেটে গেল কী করে?
পঙ্কজ ভালই জানেন কী ভাবে সুহাসিনীর আংটিটা তার পকেটে গিয়েছিল। পকেট হাতড়াবার সময় নিশ্চয় খসে পড়েছিল। কিন্তু তার এই অনুমান তিনি নববধূর কাছে ফাঁস করলেন না। তখনও তিনি নববিবাহের অনুরাগে বিহ্বল। তিনি সত্যজিৎ রায়ের সোনার কেল্লা সিনেমার খলচরিত্রের মতো বললেন, ম্যাজিক।
পঙ্কজ বললেন বটে ম্যাজিক, কিন্তু ব্যাপারটা ক্রমশ বিপজ্জনক হয়ে উঠল। রীতিমতো আর্থিক দুরবস্থা দেখা দিল পঙ্কজবাবুর জীবনে। ট্যাক্সি থেকে নেমে ট্যাক্সির ভাড়া দিতে যাবেন, দেখেন পকেটে টাকা নেই। বাজারে বা দোকানে জিনিস কিনে দাম দিতে গিয়ে দেখেন মানিব্যাগে টাকা নেই। অথবা যত টাকা থাকার কথা তা নেই।
বেশ কয়েকবার অপদস্থ হওয়ার পর অবশেষে পঙ্কজ একটা বুদ্ধি বার করলেন। বুদ্ধিটা অবশ্য তার নিজস্ব নয়, এই কৌশলটা তিনি একটা হাসির গল্পে পড়েছিলেন।
সেই গল্প অনুযায়ী তিনি সুহাসিনীকে তাস খেলা শেখাতে লাগলেন। ঠিক তাস খেলা নয়, তাসের জুয়া।
কৌশলটা এই যে বউ টাকাপয়সা যা কিছু সরাবে, জুয়া খেলায় হারিয়ে বউয়ের কাছ থেকে সেটা উদ্ধার করা হবে।
ভালই হচ্ছিল ব্যাপারটা। সুহাসিনী পঙ্কজের পকেট থেকে টাকাকড়ি যা কিছু সরান, কয়েকদিনের মধ্যে সে টাকা জুয়ায় হারিয়ে সুহাসিনীর কাছ থেকে বার করে নেন পঙ্কজবাবু। সন্ধ্যাটা বউয়ের সঙ্গে তাস খেলেই কেটে যায়। সন্ধ্যাবেলায় আগে নিয়মিত ক্লাবে যেতেন পঙ্কজবাবু। কিন্তু বিয়ের পরে দুটো কারণে ক্লাবে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়।
প্রথম কারণটি হল, নববিবাহের পর বউয়ের প্রতি অনুরাগবশত সন্ধ্যাবেলা অফিস থেকে ফিরে আর বাড়ি থেকে বেরোতে ইচ্ছে করত না।
অবশ্য দ্বিতীয় কারণটিই হল মুখ্য। পাঠক-পাঠিকারা নিশ্চয় সে কারণটি অনুমান করতে পারছেন। কারণটি হল অর্থাভাব। ক্লাবে গিয়ে খরচ করার মতো কোনও অর্থই পঙ্কজবাবুর পকেটে থাকত না। কোথাও লুকিয়ে রাখার জো-ও ছিল না। সুহাসিনীর অতি শ্যেনদৃষ্টি যেখানেই টাকাপয়সা থাক তাঁর হস্তগত হবেই।
এদিকে সংসার-খরচের, দৈনিক বাজার, মাসকাবারি খরচ এসবের জন্যে যে টাকা প্রয়োজন হয় সে টাকা, সেই সঙ্গে দুশো টাকা হাতখরচ পঙ্কজবাবু মাসের প্রথমে মাইনে পেয়েই সুহাসিনীকে দিয়ে দেন। এই টাকাগুলো কিন্তু সুহাসিনী রীতিমতো হিসেব করে গোছগাছ করে খরচ করেন। বড় জোর, এই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির দিনে মাসের শেষে আরও দুএকশো টাকা তিনি স্বামীর কাছে দাবি করেন।
পঙ্কজবাবু সেটা দিয়েও দেন। কিন্তু সুহাসিনী পঙ্কজবাবুর ব্যক্তিগত হাতখরচের টাকা সুযোগ পেলেই সরিয়ে ফেলেন। পঙ্কজবাবুর নিজের সাধ-আহ্লাদের জন্যে কোনও পয়সাই প্রায় থাকে না।
সুহাসিনীকে তাসের জুয়া খেলা শেখানোর পর সুহাসিনী বেশ হারতেন। চুরি-যাওয়া প্রায় সমস্ত টাকাই উসুল হয়ে যেত।
কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই বুদ্ধিমতী সুহাসিনী জুয়াখেলাতেও বেশ রপ্ত হয়ে গেলেন। তখন কোথায় সুহাসিনীকে পঙ্কজবাবু হারিয়ে হৃত-অর্থ পুনরুদ্ধার করবেন, তা তো নয়ই, বরং পঙ্কজবাবুই হারতে লাগলেন।
ফলে সুহাসিনীর আয় আরও বাড়তে লাগল। একদিকে পকেট-সাফাইয়ের টাকা, অন্যদিকে জুয়োয় জেতা টাকা।
এখন প্রশ্ন হল, এত টাকা দিয়ে সুহাসিনী কী করেন?
এমন হতে পারে যে সুহাসিনীর কোনও অতীত জীবন আছে, প্রাক্তন প্রেমিক আছে। হয়তো কোনও বাউণ্ডুলে কবি, কিংবা ছন্নছাড়া গায়ক বা চিত্রশিল্পী। তাকে মাসে মাসে কিছু সাহায্য করতে হয় সুহাসিনীকে। এমনও হতে পারে কোনও দুষ্টু লোক কোনও অজ্ঞাত গোপন কারণে সুহাসিনীকে ব্ল্যাকমেইলিং করে।
কিন্তু পঙ্কজবাবু জানেন, এসব কিছুই বিশ্বাসযোগ্য নয়। পারিবারিকসূত্রে সুহাসিনীকে তিনি সুদূর বাল্যকাল থেকে জানেন, বিয়ের পরও অনেকটা দেখলেন।
পঙ্কজবাবু স্থিরনিশ্চিত যে তার স্ত্রী সুহাসিনীর কুমারী জীবন সম্পূর্ণ নিষ্কলঙ্ক, যাকে বলে একেবারে ধোয়া তুলসীপাতা।
.
তাহলে এসব টাকা নিয়ে সুহাসিনী দেবী কী করেন?
