দুদিন পরে একদিন সকালবেলা চা খাচ্ছি, এমন সময় সমিতির এক কর্তাব্যক্তির ফোন পেলাম, গাড়ি যাচ্ছে। ভীষণ জরুরি। এখনই চলে আসুন।
কোনও রকমে জামাকাপড় পরে, দাড়ি-টাড়ি না কামিয়েই ছুটলাম। জায়গাটা ওকল্যান্ডের দরিদ্র অঞ্চল, ছোট ছোট ঘিঞ্জি একতলা বাড়ি। বোরখা পরা এক মহিলা ছটফট করছেন আর উর্দুতে নাকি সুরে কঁদছেন। উর্দু যে খুব ভাল বুঝি তা নয়, তবে হিন্দিটা বুঝি, কলকাতা দূরদর্শনের উর্দু সংবাদটাও অনুধাবন করতে পারি, সেই যোগ্যতা নিয়ে কিছুটা শুনে বুঝতে পারলাম, মহিলা সন্তানসম্ভবা, আসন্নপ্রসবা। তার স্বামী কাজে গেছেন। এদিকে তার গর্ভযন্ত্রণা শুরু হয়েছে।
পাড়াপ্রতিবেশীরা প্রায় সবাই কৃষ্ণাঙ্গ বা মেক্সিকান। তারা এঁদের কথাও বোঝেন না, এঁদের সঙ্গে মেলামেশাও নেই। এঁরা যে কোথা থেকে কীভাবে এখানে এসে পৌঁছেছেন, ঈশ্বর জানেন।
তা, ব্যাপারটা বুঝতে আমার খুব বেশি দেরি হল না। আমি সঙ্গী সিনিয়র সিটিজেনকে বলতেই তিনি অ্যাম্বুলেন্সে মহিলাকে প্রসূতিসদনে পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন।
এর মধ্যে দুটো বড় ঝামেলা দেখা দিল। প্রথমটা হল, মহিলার কোনও হাসপাতালে টিকেট করা আছে কিনা, মেডিক্যাল ইন্সিওরেন্স আছে কি না কিছু জানা গেল না। দুনম্বর সমস্যা আরও জটিল, মহিলার স্বামীকে কী করে জানানো হবে যে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
অবশ্য এ নিয়ে ভাববার দায়িত্ব আমার নয়। প্রবীণ সমিতি বুঝবে কী করবে। আমি বাড়ি ফিরে এলাম।
দুদিন মোটামুটি কাটল।
আসল গোলমাল হল তৃতীয় দিন রাতে। রাতে মানে গভীর রাতে, দেড়টা-দুটো হবে, টেলিফোন বাজল।
টেলিফোন বেজে চলেছে, ঘুম চোখে ধরলাম ফোনটা। ওপ্রান্ত থেকে শোনা গেল, মি. রায়?
আমি বললাম, ইয়েস স্পিকিং।
ওপ্রান্ত বলল, প্লিজ স্পিক হিয়ার।
আমি একটু অপেক্ষা করতেই ফোনে শুনতে পেলাম, খাঁটি বাঙাল কণ্ঠস্বর, আমি কিন্তু এক্ষুনি লাফামু।
আমি প্রায় কিছুই বুঝতে না পেরে বাঙাল ভাষাতেই প্রশ্ন করলাম, তুমি লাফাবা ক্যান? কী হইছে?
বাঙাল কণ্ঠের বাংলাদেশি জবাব এল, আমি মরুম। আমি এ দ্যাশে আর থাকুম না। তারপর কী ভেবে বললে, চাচু, আপনি তো আমাগো দ্যাশের লোক?
আমি বললাম, আগে টাঙ্গাইল বাড়ি ছিল।
সে বলল, চাচু, আমার বাড়ি মানিকগঞ্জে। আপনাগোর পাশে। আমি কিন্তু এখন লাফামু।
আমি আর কী বলব, জিজ্ঞাসা করলাম, তুমি কোথায়? লাফানের কী দরকার?
সে বলল, আমি আলতাবাতাস হাসপাতালের তিনতলায়। আমি আর এইখানে থাকুম না। এবার লাফামু।…
.
উপরিউক্ত আলতাবাতাস হাসপাতাল আসলে হল সুবিখ্যাত আলটাবেটস হসপিটাল; এতদঞ্চলে, সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান। মানিকগঞ্জের এই ছোকরাকে সেখানে রাখা হয়েছে স্নায়ুরোগের চিকিৎসার জন্যে। রেখেছেন যিনি তিনি একটি ভারতীয় মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের মালিক। নানা রকম ফন্দিফিকির করে ছোকরা এদেশে এসেছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই খাবারের দোকানে বয়ের কাজ সংগ্রহ করে।
বেআইনি অনুপ্রবেশকারীদের প্রায় সর্বদাই আত্মগোপন করে থাকতে হয়। গৃহ-পরিজন থেকে দূরে অনাত্মীয় প্রবাসে মাথা খারাপ হয়ে যাওয়া বিচিত্র নয়।
সেদিন ছেলেটিকে বুঝিয়ে বললাম যে হাসপাতালের তিনতলা থেকে লাফিয়ে পড়লে তোমার হাত-পা ভাঙবে, মাথা ফাটবে কিন্তু মারা যাবে না। সেটা খুবই বিশ্রী ব্যাপার হবে।
সে বলল, আমি কী করুম? এখানে তো কাছাকাছি কোনও উচা বাড়ি নাই।
যা হোক, আত্মহত্যা করার চেষ্টা থেকে তাকে অন্তত সেদিনের মতো নিবৃত্ত করা গেল।
কিন্তু আমার ফ্যাসাদ শুরু হয়ে গেল।
.
সে যে কী বিপদ।
দিনরাত জরুরি বার্তা আসছে। বাংলা-হিন্দি-উর্দুতে ভয়াবহ সব সমস্যা।
এয়ারপোর্টে কে সন্দেহজনক জিনিস নিয়ে ধরা পড়েছে, হিন্দিতে কী সব বলছে। আদালতে সাক্ষী বাংলা ছাড়া আর কোনও ভাষায় কথা বলতে পারে না। পুলিশের আসামি উর্দুভাষায় জবানবন্দি দিচ্ছে।
সকলের সব কথা বুঝতে পারি তাও নয়। তা ছাড়া এ বয়েসে এত ধকল পোষায় না। এদিকে সিনিয়র সিটিজেন সমিতির একমাত্র বলভরসা আমি।
এই বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্যে আমি শেষ পর্যন্ত নিতান্ত নিরুপায় হয়ে একটা বুদ্ধি বার করলাম। সমিতির কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে আমি বাংলায় কথা বলতে শুরু করলাম। তারা যাই বলুন, যে বিপদের কথাই বলুন, আমি বাংলায় জবাব দিই, আমার দ্বারা সম্ভব হবে না। আমার কথা শুনে। বৃদ্ধ ভদ্রলোকেরা কিছুই বুঝতে পারেন না।
দুদিন পরে দেখি আমার সেই গ্রহ দৈনিক বার্কলে প্ল্যানেটে বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে–
মানসিকভাবে সুস্থ বাংলা-হিন্দি-উর্দু দোভাষী অবিলম্বে চাই।
বিবাহঘটিত
প্রথম তরঙ্গ: পঙ্কজবাবুর বিপদ
কোট-প্যান্ট পরে অফিসে বেরোচ্ছিলেন পঙ্কজবাবু। অফিসে যাঁর পরিচয় মিস্টার পি. চক্রবর্তী।
যা হোক এটা পারিবারিক কাহিনি। এ গল্পে আমরা তাকে পঙ্কজবাবুই বলব।
পঙ্কজবাবুর স্ত্রীর নাম সুহাসিনী। মহিলার নামটি যে উপযুক্ত নয়, এ গল্প পড়েই পাঠক-পাঠিকারা বুঝতে পারবেন।
কোট পরে টাইয়ের নট বাঁধছেন, রাস্তায় অফিসের গাড়ি হর্ন দিচ্ছে, এমন সময় সুহাসিনী বললেন, ওগো তোমার কোটের পকেটে একটা ফুটো ছিল।
পঙ্কজবাবু নির্বিকার ভাবে বললেন, জানি।
সেই ফুটোটা আমি সেলাই করে ঠিক করে দিয়েছি। সুহাসিনী বললেন।
