আহা, কতদিন পরে কাকের ডাক শুনলাম, শুনে কান-প্রাণ জুড়িয়ে গেল।
সত্যি এখানে, এমন সুন্দর জায়গায় পাখি এত কম কেন! সামান্য কাক, তার ডাকও শোনা যায় না।
কাকের ডাকের জন্যে এই আকুলতা, এটা কিন্তু অস্বাভাবিক নয়। আসলে নিথর নীরবতায় আমি হাঁফিয়ে উঠলাম। রাস্তায় যাই, দোকান বাজারে ঘুরি, লোকজনের সঙ্গে দেখা হয়, ইয়েস-নো, থ্যাংক ইউ, হ্যাভ আ নাইস ডে। সময় আর কাটতে চায় না, কাটে না।
এই সময় স্থানীয় খবরের কাগজ, যার নাম বার্কলে ডেইলি প্ল্যানেট (Berkeley Daily Planet), অর্থাৎ বাংলায় বার্কলে দৈনিক গ্রহ পড়ে আমি একটা জিনিস জানতে পারলাম, বলা উচিত গ্রহের ফেরে পড়লাম।
বার্কলে প্ল্যানেটে একটা বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে স্থানীয় সিনিয়র সিটিজেনস সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন থেকে।
মার্কিন দেশে পঁয়ষট্টি বছর বয়েস হলে সরকারি ভাবে সিনিয়র সিটিজেন গণ্য করা হয়। আমার অবশ্য এই হিসেব অনুযায়ী সিনিয়র সিটিজেন হতে আরও দুয়েক বছর লাগবে কিন্তু বিজ্ঞাপনটি পড়ে আমি কিঞ্চিৎ প্রলুব্ধ বোধ করলাম।
প্রসঙ্গত বলে রাখা ভাল যে সাধারণ নাগরিকদের তুলনায় সিনিয়ররা বা প্রধানেরা এখানে নানারকম বেশি সুবিধে পায়। বাসে-ট্রেনে, টিউবে টিকিটের দাম কম, সিট সংরক্ষিত। ট্যাক্সের সুবিধে, চিকিৎসার সুবিধে এমনকী মার্কিন নাগরিক হলে ভরণপোষণের জন্যে অনুদান।
আমি ভারতীয় নাগরিক। ভরণপোষণ, ট্যাক্সের সুবিধে আমার প্রাপ্য নয়, আমি চাইও না। তবে অ্যামট্রাকের টিকিট ভাড়ার সময় সস্তায় পেয়েছি, সেখানে ষাট বছরেই সিনিয়র। আবার সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের টিকিটে প্রবীণের সুবিধে পেয়েছি।
সে যা হোক, বার্কলে প্ল্যানেটের বিজ্ঞাপনে বলেছে ইংরেজি ও এক বা একাধিক প্রাচ্য ভাষা বোঝে এবং বলতে পারে এমন প্রবীণ ব্যক্তি চাই। বিশেষ কোনও নির্দিষ্ট কাজ নেই। তবে প্রয়োজনে ইংরেজিতে কথোপকথনে অপারগ মাতৃভাষীদের সাহায্য করতে হবে। কোনও বেতন দেওয়া হবে না, তবে যাতায়াত-ফোন ইত্যাদি বাবদ সপ্তাহে পঞ্চাশ ডলার পর্যন্ত ভাতা দেওয়া হতে পারে।
আমি দেখলাম, এই হল সুবর্ণ সুযোগ। আমাকে চুপচাপ বসে থাকতে হচ্ছে না। তা ছাড়া প্রবীণ নাগরিক কল্যাণ সমিতির অফিসও আমার বাসস্থানের খুবই কাছে। আমি টেলিগ্রাফ অ্যাভিনিউ নামক রাজপথের যে মোড়ের পাশে থাকি তার ঠিক পরের মোড়ের কাছেই ওই সমিতির অবস্থান।
ভেবে দেখলাম, টাকা-পয়সার ব্যাপার নয়, এ দেশে আমি ডলার উপার্জন করতে আসিনি তবে আমার সময় কাটানোর জন্যে বিজ্ঞাপিত কাজটি সহায়ক হতে পারে। কেউ হয়তো বলতে পারেন, এমন অমূল্য, অসীম অবসর পেয়েছেন খাতা কলম নিয়ে বসে ভালমন্দ কিছু লিখলেই পারেন।
দুঃখের বিষয়, তা পারি না। যথেষ্ট চাপ না থাকলে এবং গোলমাল হইচই ইত্যাদির মধ্যে না থাকলে আমার লেখা হয় না। এ আমার স্বভাবে দাঁড়িয়ে গেছে আর এই বয়েসে স্বভাব তো বদলানো যায় না।
সুতরাং বিজ্ঞাপনের ঠিকানায় নির্দিষ্ট দিন সকালবেলায় পৌঁছে গেলাম। দেখলাম রীতিমতো সুগঠিত একটি সংস্থা। পরিচালকমণ্ডলীর সদস্য-সদস্যাবৃন্দ একটা বড় গোল টেবিল ঘিরে ইতস্তত বসে আছেন। বিশাল ঘরের চারপাশে এবং সামনের বারান্দায় বেশ কয়েকটা সোফা। এক প্রান্তে। একটা কফি তৈরির মেশিন, দুধ, চিনি ইত্যাদি। পাশে রাখা প্লেটে অল্প কিছু পয়সা রেখে যে যার ইচ্ছে মতো কফি বানিয়ে খাচ্ছে। পাশে একটা বড় প্লেটে কয়েকটা বিস্কুটের, কুকির খোলা প্যাকেট।
আমি গিয়ে আত্মপরিচয় দিলাম। আমার চেহারায় বোধহয় একটা বয়স্কভাব দেখা দিয়েছে, কর্তাব্যক্তিরা একবারও আমার বয়েস জানতে চাইলেন না। এমনকী আমার কী ধরনের ভিসা, এ দেশে কোনও সচেতন কাজ করার অধিকার আমার আছে কি এসব বিষয়ে এঁরা কোনও প্রশ্নই করলেন না।
আমি যখন জানালাম যে আমি ইংরেজি ও বাংলা বলতে, বুঝতে পারি, হিন্দিতেও কাজ চালাতে পারি এবং উর্দুতেও চলনসই–এঁরা খুব আশ্বস্ত হলেন। বুঝতে পারলাম, এঁদের আমার মতো লোক দরকার।
এঁদের পরোপকারবৃত্তির মধ্যে প্রধান হল বিদেশিদের সাহায্য করা। বিমানবন্দরে সরকারি অফিসে বা আদালতে এমন অনেক বিদেশিকে দেখা যায় যারা মাতৃভাষা ছাড়া আর কোনও ভাষায় পারঙ্গম নয়। এদের কোনও প্রশ্ন করলে উত্তর পাওয়া যায় না। এরা কিছুই বলতে পারে না। মধ্যে থেকে ঝামেলায় পড়ে।
তা ছাড়া সিনিয়র সিটিজেনদের একটা বড় দায়িত্ব হল ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট, হয়তো কোথাও বিয়ে ভাঙার মুখে, সেখানে স্বামী বা স্ত্রী সাহায্য চাইলে সাহায্য করা। এমনকী কেউ হয়তো আত্মহত্যা করতে চাইছে কিংবা ড্রাগের নেশা ছাড়তে পারছে না–এসব ক্ষেত্রে যতটা সম্ভব আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করা।
কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভাষা বুঝতে না পারলে কিছু করা অসম্ভব। সেই জন্যে দোভাষী প্রয়োজন।
কাজের গুরুত্ব না বুঝে আমি বোকার মতো রাজি হয়ে গেলাম।
বার্কলে ডেইলি প্ল্যানেট পত্রিকায় এবং অন্যান্য জায়গায় নিয়মিত প্রধান নাগরিক সমিতির আবেদন বেরোয়–
যেকোনও মর্মান্তিক বিপদে সাহায্যের জন্য যোগাযোগ করুন।
বিস্তারিত বিজ্ঞাপন ছাড়াও সমিতির সদস্যেরা পাড়ায় পাড়ায় যোগাযোগ রাখেন। সদা সাহায্যের জন্যে তারা হাত বাড়িয়ে রয়েছেন।
