বাড়িতে একটা নতুন কাজের লোক এসেছে, তাকে দেখলেই বাণেশ্বরের মাথা গরম হয়ে যায়। গায়ে গোলাপি গেঞ্জি, মাথায় টেরি কাটা, কেমন বাবু বাবু ভাব। লোকটা কাজ খারাপ করে না, কিন্তু লোকটাকে বাণেশ্বরের মোটেই পছন্দ নয়। একদিন সকালবেলায় বিছানায় শুয়ে বাণেশ্বর খবরের কাগজ পড়ছিলেন, নতুন চাকরটা ঘর মুছছিল, হঠাৎ বাণেশ্বর দেখেন খাটের নীচে রাখা জুতোজোড়া লোকটা নিজের পায়ে গলিয়ে দেখছে। সঙ্গে সঙ্গে লোকটাকে দূর-দূর করে ঘর থেকে বার করে দিয়েছিলেন। তারপর রামেশ্বরকে ডেকে বলেছিলেন, বউমাদের বলে দিও, এই লোকটা যেন কখনও আমার ঘরে না ঢোকে। কত বড় সাহস ব্যাটার, আমার জুতোয় পা গলাচ্ছে।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই রামেশ্বর তার মতলব হাসিল করলেন। একদিন দুপুরবেলা বাণেশ্বর তার ঘরে দিবানিদ্রায় মগ্ন, সেই সময় রামেশ্বর চুপি চুপি বাণেশ্বরের ঘরে ঢুকে খাটের নীচ থেকে বিখ্যাত জুতোজোড়া বার করে বারান্দায় এসে নতুন ভৃত্যটিকে ডাকলেন, এই জুতোজাড়া তোর পছন্দ? নোকটা কিছু বুঝতে না পেরে, কিঞ্চিৎ ইতস্তত করে স্বীকার করল, হ্যাঁ, জুতোজোড়া ভাল। সঙ্গে সঙ্গে রামেশ্বরবাবু জুতোজোড়া তাকে দিয়ে আর বকেয়া মাইনে চুকিয়ে, সঙ্গে দশ টাকা বখশিশ দান করে লোকটাকে বললেন, যা এ বাড়ি থেকে বিদায় হ। আর কোনওদিন এ মুলুকে আসবি না। লোকটি এই অভাবিত সৌভাগ্যে বিগলিত হয়ে দাঁত বার করে হেসে নিজের জিনিসপত্র নিয়ে জুতোজোড়া হাতে করে দ্রুত প্রস্থান করল।
বিকেলে ঘুম থেকে উঠে জুতোজোড়া না দেখতে পেয়ে বাণেশ্বর রীতিমতো মুষড়ে পড়লেন, বলা উচিত একেবারে ভেঙে পড়লেন। যখন তাঁকে জানানো হল যে নতুন বাবুবাবু চাকরটাই জুতো নিয়ে পালিয়েছে, তিনি একদম ম্লান হয়ে গেলেন। কেবল ছি-ছি করতে লাগলেন আর স্বগতোক্তি করতে লাগলেন, আমি আগেই সন্দেহ করেছিলাম, ধরেও ফেলেছিলাম। ছি ছি সাধে কি আর জুতো বলে, কত কষ্ট করে কত ডাক্তার দেখিয়ে কঠিন অসুখ থেকে বাঁচালাম–ছি ছি শেষে একটা চাকরের সঙ্গে ছি ছি ছি।
সর্বশেষ খবর, বাণেশ্বরবাবু ভাল হয়ে গেছেন। একজোড়া নতুন জুতো কিনেছেন, তবে তার প্রতি তার তেমন আসক্তি নেই, প্রয়োজনমতো পায়ে দেন। আর সিগারেট খাওয়া সম্পূর্ণ ছেড়ে দিয়েছেন। আসুন আমরা সবাই তার নীরোগ, দীর্ঘজীবন কামনা করি।
বিপদ ও তারাপদ
সেই কবে, কতকাল আগে, নিতান্তই ইয়ার্কি করে আমি লিখেছিলাম,
বিপদ এবং তারাপদ
কখনও একা আসে না।
সবাই জানেন, অকারণে বিপদে পড়া আমার পুরনো স্বভাব। এবার আমেরিকায় এসে নিতান্ত পরোপকার বৃত্তি পালন করতে গিয়ে আবার বিপদে পড়লাম।
বিপদ বলে বিপদ, রীতিমতো গোলমাল।
আসলে দোষটা সম্পূর্ণই আমার। আজীবন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কিছু না কিছু করে এসেছি। তা, সে লেখাপড়াই হোক, বাজার করাই হোক কিংবা স্নান-খাওয়া, অফিস যাওয়া, আড্ডা দেওয়া।
কিন্তু নিরিবিলি অবসর যাকে বলে তা এ জীবনে খুব বেশি পাইনি। কলকাতার বাসায় তো ফোনের অত্যাচারে আপন মনে একা থাকার সুযোগ নেই। সেই যে কবি লিখেছিলেন যে পাখির গানে আমরা ঘুমিয়ে পড়ি, পাখির গানে আমরা জেগে উঠি, সেটা অনুকরণ করে বলা যায় টেলিফোনের ঝংকারে ঘুমোই, টেলিফোনের ঝংকারে ঘুম থেকে উঠি।
অবশ্য এসব কথা বলে আমি জাহির করতে চাইছি না যে আমি খুব করিৎকর্মা লোক। তালেবর ব্যক্তি।
সে যা হোক, পঁয়ত্রিশ বছর সরকারি চাকরি ঘাড়-মুখ গুঁজে করার পরে অবসর পেয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছিলাম, সমুখে শান্তি পারাবার।
কিন্তু তা হয়নি। বাসায় ভিড় আরও বেড়ে গেছে। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী। সদর দরজা বন্ধ করলেই কলিংবেলের কর্কশ ক্রিং ক্রিং ক্রিং ক্রিং। তদুপরি টেলিফোনের রিং রিং তো আছেই।
.
অবশেষে এখন আমার সত্যিকারের অখণ্ড অবসর পূর্ণ বিশ্রাম।
প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তর প্রান্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্য। চিরবসন্তের দেশ। শীত কখনওই জোরালো নয়, গ্রীষ্ম কখনওই প্রখর নয়। ফুল-ফল, গাছপালা, নদী-পর্বতের বিচিত্র সমারোহ।
ক্যালিফোর্নিয়ার এক প্রান্তে উপকূলবর্তী ছবির মতো শহর বার্কলে, মহানগরী সানফ্রানসিসকোর শহরতলিই বলা যায়। চারদিক জলে ঘেরা, এপাশে ওপাশে ছোটবড় পাহাড়, বনমালা। এত রকমের গাছ, এত রকমের ফুল কোথাও সচরাচর দেখা যায় না।
আবহাওয়া দার্জিলিংয়ের মতো। তবে অত বৃষ্টি হয় না। শীতে বরফ পড়ে না, তবে বরফ পড়ার কাছাকাছি পৌঁছে যায় পারদের মাত্রা।
এ কালে ফায়ারপ্লেস প্রায় উঠেই গেছে। এখানে এই বার্কলে শহরে কোনও কোনও পুরনো বাড়িতে বসবার ঘরে ফায়ার প্লেস বা কাঠ দিয়ে আগুন জালানোর জায়গা এখনও আছে। ব্যবহৃতও নিশ্চয় হয়, না হলে প্রতিটি দোকানেই জ্বালানি কাঠ বিক্রির জন্যে মজুত থাকে কেন? তা ছাড়া দু-একজনকে জ্বালানি কাঠ, প্যাকেট বদ্ধ ফায়ারউড কিনতেও দেখেছি।
তা যা হোক আমরা যে বাড়িতে আছি সে বাসায় ফায়ারপ্লেস একটা আছে কিন্তু তার ব্যবহার নেই। তা বদলে ইলেকট্রিকের রুম হিটার। বারবার কাঠ দেয়ার প্রয়োজন নেই, হঠাৎ আগুন লেগে যাওয়ার ভয় নেই। তা ছাড়া প্রয়োজন অনুযায়ী তাপমাত্রা কমানো বাড়ানো যায়।
শীতের নিভৃতে এই বিখ্যাত উপনগরীতে ভালই ছিলাম। নিরুপদ্রব, নিরিবিলি। কলকাতায়। সল্টলেকের বাড়িতে যে ব্যস্ততা, লোক সমাগম, পিয়ন, কুরিয়ার, চিঠিপত্র, টেলিফোন, কলিংবেল, ক্যানভাসার, ভিখিরি এমনকী কুকুর বেড়াল; এখানে তার কোনওটাই নেই, একেবারে ফাঁকা ফাঁকা। এখানে কাক পর্যন্ত নেই, একদিন সন্ধ্যায় বার্কলে মেরিনে বেড়াতে গিয়ে দুর থেকে একটা কাক দেখতে পেলাম, ছোটজাতের দাঁড়কাক। আমি একটু এগিয়ে যেতেই কাকটা কাকা করে ডেকে উড়ে গেল।
