এখানে লিখে রাখা উচিত, সে সময়ে জীবনবাবুর সে সামর্থ্যও খুব ছিল না।
তখন দমদমে প্রচুর ব্যাঙ। সে দমদম এ দমদম নয়। পানাপুকুর, ডোবা, দমদম, সিঁথি আর বরানগরের মধ্যে দৈর্ঘ্য-প্রস্থে লম্বা-চওড়া জলাজমি।
আর সেই জলাজমিতে ব্যাঙ আর ব্যাঙ। সে যে কতরকম ব্যাঙ, কোলা ব্যাঙ, চোলা ব্যাঙ, ধেড়ে ব্যাঙ, ধাড়ি ব্যাঙ, টুনি ব্যাঙ, টোনা ব্যাঙ।
দমদমের বাসিন্দাদের তখন খুব রাগ ছিল ব্যাঙের ওপরে। সকাল নেই, সন্ধ্যা নেই, সারাদিন সারারাত শুধু ঘ্যাঙর ঘোঁ, ঘো ঘোঁ এবং ঘোঁ ঘোঁস, ঘ্যাঙর ঘোঁকঁহাতক সহ্য করা যায়।
কিন্তু জীবনচন্দ্রের জীবনবোধ ছিল অন্যরকম। তার প্রজ্ঞাও ছিল অসাধারণ।
ঢাকা, মুন্সীগঞ্জের ছেলে, সরাসরি বলা যায় নন্দপুকুর গ্রামের সুসন্তান জীবনচন্দ্রের জীবনে ব্যাঙের অভিজ্ঞতা এই প্রথম নয়। তিনি জানতেন, ভালই জানতেন ব্যাঙ পোকা মাকড় এমনকী জোনাকি ধরে খায়। জোনাকির আলো জ্বলে আর নেভে, সে শুধু ব্যাঙকে ধরানোর জন্যে।
কিন্তু দমদমে এসে জীবনবাবুর অভিজ্ঞতা হল যে সাধারণ পোকামাকড় নয়, জোনাকি নয় ব্যাঙের সবচেয়ে প্রিয় খাদ্য হল মশা, মানুষের রক্তাপ্লুত মশা।
তখন দমদমে মশাও খুব। রাতে মশারি টাঙিয়ে শুলেও মশারির জাল ভেদ করে মশা ঢুকে যায়, তারপর কামড়িয়ে জর্জরিত করে।
কিন্তু যেদিন থেকে জীবনচন্দ্র টের পেলেন যে ব্যাঙ হল মশাভোজী প্রাণী, মুখের নাগালের মধ্যে পেলে উড়ন্ত মশাকে এক লাফে ধরে সে গিলে ফেলতে পারে। তিনি ব্যাঙকে নিজের কাজে ব্যবহার করতে লাগলেন।
সন্ধ্যায় সন্ধ্যায় চারটে বড় কোলা ব্যাঙ ধরে তার তক্তাপোশের চার পায়ার সঙ্গে এক পায়ে দড়ি বেঁধে আটকিয়ে দিলেন।
মশারির মধ্যে মশা ঢোকে প্রধানত বিছানার তোষকের নীচে যেখানে মশারি গোঁজা হয় সেই গোঁজার সূক্ষ্ম ফাঁক দিয়ে।
ব্যাঙ বেঁধে রাখার ব্যবস্থা করায় মশাদের অনুপ্রবেশ করার জায়গা ব্যাঙগুলোর নাগালের মধ্যে এসে গেল। তারপর, কী আশ্চর্য, সেই রাত থেকে জীবনচন্দ্রের মশারির মধ্যে আর একটি মশাও ঢুকতে পারল না।
এই ঘটনা এই কাহিনির পক্ষে তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়, শুধু একটা কথা এখানে জানানো দরকার যে মশার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে ব্যাঙ ধরে ধরে জীবনচন্দ্র এই বিদ্যায় এক্সপার্ট হয়ে। গিয়েছিলেন।
এরপরের ঘটনাবলি খুবই সংক্ষিপ্ত। যখন আলপিন, সেফটিপিন, গুলিসুতো, কান খোঁচানি, জিবছোলা ইত্যাদির ব্যবসায়ে জীবনচন্দ্র প্রায় সর্বস্বান্ত হতে বসেছেন সেই সময়ে খবর পেলেন, খবরের কাগজে দেখতেও পেলেন জাপান, হংকং, সিঙ্গাপুরে খুব ব্যাঙের চাহিদা তাদের দিশি ব্যাঙে আর হচ্ছে না তারা ভারত থেকে ব্যাঙ আমদানি করতে চায়।
সঙ্গে সঙ্গে যথাস্থানে যোগাযোগ করলেন জীবনচন্দ্র এবং সেই যোগাযোগ ফলপ্রসূ হল।
এরপর থেকে তিনি তাঁর আটজন সম্পর্কিত এবং নিজের ভাইবোন, এই বিরাট ম্যান পাওয়ার নিয়ে ব্যাঙ ধরতে নেমে গেলেন। পরে অবশ্য মাইনে করা লোকও তাকে রাখতে হয়েছিল।
সূর্যোদয়ের দু ঘন্টা আগে থেকে সেই সূর্যাস্তের এক ঘণ্টা পরে পর্যন্ত সকাল নেই, দুপুর নেই, বিকেল নেই, সন্ধ্যা নেই সারাদিনমান ব্যাঙ ধরা চলতে লাগল, দমদমের খালে-নালায়, জলায়-ড্রেনে। সেই সময় দমদমকে তিনি প্রায় ব্যাঙ শূন্য করে ফেলেছিলেন, হয়তো সত্যিই ওই অঞ্চল থেকে ব্যাঙ নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত কিন্তু ইতিমধ্যে বানর চালানের হিড়িক পড়ে গেল।
দমদমে আবার বানর নেই। তার জন্যে সেই দক্ষিণেশ্বর, আলমবাজার, কলকাতার হেস্টিংস, ময়দান এইসব জায়গায় ছুটতে হল। আর বানর ধরা সোজা কাজ নয়।
বিস্তারিত বর্ণনায় গিয়ে লাভ নেই।
মোদ্দা কথা, ব্যাঙ চালানের আর বানর চালানের কারবারেও কিন্তু খুবই সফল হলেন জীবনচন্দ্র। এক জীবনে একার চেষ্টায় ও পরিশ্রমে লক্ষ লক্ষ টাকা উপার্জন করলেন। সবচেয়ে বড় কথা টাকা দু হাতে উপার্জন করলেন বটে কিন্তু জীবনচন্দ্রের জীবনধারা একদম পালটাল না।
সেই মালকোঁচা মারা ধুতি, কালো কাবলি জুতো আর ফুলহাতা টুইলের শার্ট যে পোশাকে গ্রাম ছেড়ে তিনি কলকাতায় এসেছিলেন সেই পোশাক আর বদলায়নি।
খাওয়া-দাওয়া, চালচলনেও কোনও ব্যতিক্রম নেই। নিজের কোনও গাড়ি নেই, একটা জাল ঢাকা ভ্যান আছে সেটা বানরদের জন্যে। জীবনচন্দ্র নিজে ট্রামে বাসেই যাতায়াত করেন।
শুধু ওই দমদমের ভাড়াটে বাড়ি কিনে সেটাকে তিনতলা করেছেন। আর সবই খরচ করেছেন তার পুষ্যিদের জন্যে।
জীবনচন্দ্র যখন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ফুটপাথের দোকানে মাটির ঊড়ে চা খেতেন কেউ ভাবতেও পারত না এই লোকটাই খুড়তুতো ভাইকে আমেরিকা পাঠিয়েছে, পাঁচ লক্ষ টাকা খরচ করে বোনের বিয়ে দিয়েছে। এরই পয়সায় ভাই-ভাইপোরা লাল মারুতি, সাদা অ্যামবাসাডর হাঁকাচ্ছে, বারে-রেস্তোরাঁয় টাকা ওড়াচ্ছে, সল্ট লেকে বাড়ি বানাচ্ছে।
তাদের সব বড়লোকি চালচলন, বড়লোকি ব্যবসা। এক ভাইপো সিনেমার প্রডিউসার হয়েছে। আরেক ভাইপো কবিতার কাগজ করেছে। সব ফ্লপ হওয়ার কারবার। নিঃসন্তান, বিগতদার জ্যাঠার পয়সা, বহু কষ্টার্জিত পয়সার তারা সদ্ব্যবহার করতে লাগল।
এবং এসব ক্ষেত্রে সাধারণত যা হয়ে থাকে তারা ধরেই নিয়েছিল যে তাদের জ্যাঠা খুব বোকা, একেবারে মূর্খ, গণ্ডমূর্খ। এত কষ্টের উপার্জনের টাকা একটু ফুর্তি করল না। একটু আহ্লাদ করল না, একটু বিলাসিতা করল না, অন্তত আরও একটা বিয়ে তো করতে পারত।
