আমার মতো হালকা গল্প লিখে লেখক সমাজে কলকে পাওয়া অসম্ভব। পুরস্কার-টুরস্কার তো কোনও দিনই পাব না, সভাসমিতিতে বক্তৃতা করতেও কেউ সচরাচর ডাকে না, এমনকী আমার লেখা বই পর্যন্ত সমালোচকেরা আলোচনা করে হাস্যাস্পদ হতে চান না।
সুতরাং অবশেষে আমি একটা জীবনমরণ প্রতিজ্ঞা করেছি, অন্তত একটা, কমপক্ষে একটা বাঁচা। মরার গল্প লিখবই, লিখব।
এই জীবনধর্মী গল্পটি সেই প্রতিজ্ঞারই ফসল।
প্রথমেই কবুল করে রাখি, এই গল্পের নায়কের নাম জীবনচন্দ্র চক্রবর্তী।
সুতরাং গল্পটি, এই ছোট রচনাটি কয়েক মিনিটের মধ্যে পাঠ করার আগে কোনও সমাজ সচেতন, আর্থ-রাজনৈতিক চিন্তায় চিন্তিত পাঠক যদি কোনও কটু প্রশ্ন তোলেন তাই আগে ভাগেই ব্যাখ্যাটা দিয়ে রাখছি, আর কোনও কারণে নয়, শুধু এই ক্ষুদ্র কাহিনির নায়কের নাম জীবন বলেই এটাকে একটা জীবনধর্মী কাহিনি হিসেবে ধরা যেতে পারে।
আমাদের এই খণ্ড কাহিনির সামান্য নায়ক শ্রীযুক্ত জীবনচন্দ্র চক্রবর্তীর জীবন কাহিনি কিন্তু রীতিমতো রোমাঞ্চকর এবং যথেষ্টই শিক্ষাপ্রদ।
জীবনবাবুর পূর্বপুরুষদের বসবাস ছিল সাবেকি বঙ্গ প্রদেশের ঢাকা বিভাগের ঢাকা জেলার মুন্সিগঞ্জ মহকুমার বিক্রমপুর পরগনার অন্তর্গত ডিহি গজানন নগরের নন্দপুকুর গ্রামে।
স্বাধীনতা মানে পূর্ববঙ্গের হিন্দুদের কাছে যেটা পার্টিশন, দেশ ভাগ, সেই দুঃখজনক, হৃদয়বিদারক ঘটনার পরেও প্রায় বছর তিনেক জীবনবাবু নন্দপুকুর গ্রামে পিতৃপুরুষের ভিটেয় থাকার চেষ্টা করেছিলেন।
উনিশশো সতেরো সালে জীবনচন্দ্রের জন্ম। সেই গোলমেলে সাতচল্লিশ সালে তার বয়েস নিতান্ত তিরিশ। কিন্তু বিরাট সংসারের বোঝা ঘাড়ে।
বাইশ বছর বয়েসে বিয়ে করেছিলেন জীবনচন্দ্র, তেইশ বছর বয়েসে তার স্ত্রী মারা যান, পিত্রালয় থেকে ফেরার পথে ঝড়ে নৌকোডুবি হয়ে ধলেশ্বরী নদীতে।
কিন্তু তাতে সংসারের দায়দায়িত্ব মোটেই কমেনি। নিজের এবং খুড়তুতো, জ্যাঠতুতো এবং সেই সঙ্গে পিসতুতো ভাই বোন (এক বিধবা পিসিমা তাঁদের নন্দপুকুর বাড়িতে থাকতেন)। শুধু তুতো ভাইবোনের সংখ্যাই একুশজন, সেই সঙ্গে নিজের বিধবা মা এবং ঠাকুমা সমেত ওই সব ভাই বোনদের জনকজননীর সংখ্যা এগারো। এর ওপরে ছিল আসোজন বসোজন।
একেক বেলায় চল্লিশ-পঞ্চাশ জনের পাত পড়ত জীবনচন্দ্রদের নন্দপুকুরের বাড়িতে। এক সময়ে প্রচুর ধান জমি ছিল তাদের, পরবর্তীকালে কাঁচা টাকার লোভে এর কিছু কিছু জমিতে পাট চাষ করা হত। কিন্তু দেশ বিভাগের পরে সেসব জমির ফসল সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে দাঁড়াল।
তবু জমিজমা বেচে, কষ্ট করে জীবনচন্দ্র উনিশশো পঞ্চাশ সাল পর্যন্ত নন্দপুকুরেই থাকার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু সে বছরের মারাত্মক দাঙ্গার পরে আর থাকতে পারলেন না। আত্মীয়স্বজন, পাড়াপ্রতিবেশী স্বজাতি সকলেই ক্রমে ক্রমে দেশ ছেড়েছে। এমনকী এতদিন যারা জীবনচন্দ্রের মুখাপেক্ষী ছিল, তারাও অনেকে একে একে এপারে চলে এল।
অবশেষে জীবনচন্দ্রও একদিন সাত পুরুষের ভিটে ছেড়ে সংসারের বাকি যারা অবশিষ্ট ছিল সবাইকে নিয়ে কলকাতায় চলে এলেন। ভিটে বাড়ি, জমি জমা বেচে সামান্য কিছু টাকা পাওয়া গিয়েছিল, সেই অর্থের ওপর ভরসা করে সেই সঙ্গে মা-ঠাকুমার গায়ের অবশিষ্ট গয়নাটুকু কলকাতায় এসে স্যাকরার কাছে বাঁধা দিয়ে জীবনচন্দ্ৰ নতুন জীবন শুরু করলেন।
তখন জীবনচন্দ্রের বয়েস মাত্র তেত্রিশ। চাকরি করার বা ব্যবসার অভিজ্ঞতা কিছু নেই, কলকাতা মহানগরী সম্পর্কেও তার মনে একটা অজানা, দ্বিধাগ্রস্ত ভাব।
যা হোক সদর কলকাতায় না থেকে শহরতলি দমদমে ষাট টাকায় একটা ছোট একতলা বাড়ি ভাড়া করে বসবাস শুরু করলেন জীবনচন্দ্র।
টাকা ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে। এদিকে ঠাকুমা, মা দুজনেই বিগত হয়েছেন। তবুও সংসারে সাত আটটি পুষ্যি এখনও বর্তমান। তাদের বাঁচা মরা সবই এখনও জীবনবাবুর ওপরেই নির্ভর করছে।
অতঃপর শুরু হল জীবনবাবুর জীবন সংগ্রাম।
সে এক ভয়াবহ, অসম লড়াই।
বেঁচে থাকার জন্যে জীবনবাবুকে কী কী করতে হয়েছে তার তালিকা রচনা করতে গেলে সে খুবই দীর্ঘ হয়ে যাবে। তা ছাড়া যেকোনও বুদ্ধিমান লোকই সেসব অনুমান করতে পারেন।
কথায় আছে, অসফল ব্যবসায়ী আলপিন থেকে হাতি সব কিছুর ব্যবসা করার চেষ্টা করে।
ব্যবসা মানে কেনা বেচা। কোনও জিনিস কিনে সেটা বেচা। কেনার দর আর বেচার দর, এই দুইয়ের মধ্যে যত ব্যবধান হবে ততই লাভ।
হাতি কিংবা হাতি জাতীয় দুর্মূল্য, দুর্লভ জিনিস কেনা বেচার অসুবিধে হল যত সহজে কেনা যায় তত সহজে বেচা যায় না। আর ব্যবসার আসল রহস্য হল ওইখানে, কেনার পর যত তাড়াতাড়ি বেচা যায়, লাভ যতই কম হোক, আবার কেনা-বেচা করা যাবে। আবার লাভ, এই ভাবে পৌনঃপুনিক লাভ এক দফায় লাভের থেকে বেশি।
এই অর্থে হাতির ব্যবসা কোনও কাজের কথা নয়। যত ছোট, যত কম দামের জিনিস হবে তত সুবিধে।
জীবন সংগ্রামে জীবনবাবু সফল হয়েছিলেন।
তিনি বুদ্ধিমান লোক ছিলেন এবং সহজেই টের পেয়েছিলেন যে তাঁর পক্ষে বড় কিছুর ব্যবসা ঠিক হবে না। বলা বাহুল্য, তিনি ঠিকই ধরেছিলেন। তিনি হাতির ব্যবসা করেননি। এবং শুধু হাতি কেন, তিমি, জিরাফ, জলহস্তী কোনও কিছুর ব্যবসাতেই তিনি মাথা গলাননি।
