জ্যাঠা আরেকবার দারগ্রহণ করলে তাদের যে কী অবস্থা হতে পারত, তারা সেসব ভাবেনি। তারা আগাগোড়া জ্যাঠাকে বোকাই ভেবে গেছে।
কিন্তু জীবনচন্দ্র বোকা নন। কোনও বোকা লোক ব্যবসায় উন্নতি করতে পারে না।
তবে জীবনচন্দ্র জীবনসায়াহ্নে পঁচাত্তর বছর বয়েসে পৌঁছে ভেবে দেখলেন জীবনে সাধ আহ্লাদ কিছুই পূরণ করা হল না। এক নাগাড়ে দম না ফেলে খাটতে খাটতেই সারা জীবন চলে গেল।
এত টাকা পয়সা, সব ভাই-ভাইপোরা ধ্বংস করছে। তার নিজের প্রয়োজন খুবই কম। আর এ বয়েসে এসে হঠাৎ বিলাসিতা শুরু করা বেমানান হবে। তা ছাড়া বিলাসিতার পরিশ্রমও কিছু কম নয়, সেটা অভ্যাস করতে হয়।
কিন্তু নিজের জন্যে তো কিছু খরচ করতে হবে। পুরো জীবনটা কৃচ্ছসাধনে ব্যয় করার পর এই চিন্তাটা বার বার ঘুরে ঘুরে জীবনবাবুর মাথায় আসতে লাগল।
অবশেষে নিজেই একটা বুদ্ধি বার করলেন। বুদ্ধির অভাব তার কোনও দিনই হয়নি, এবারেও হল না।
জীবনচন্দ্র তার সহ ব্যবসায়ী প্রাণগোপালের কাছে গেলেন। গিয়ে প্রাণগোপালকে বললেন, দ্যাখো, আমার পঁচাত্তর বৎসর বয়েস হয়েছে। আমার নিজের ধারণা আমি আর খুব বেশিদিন বাঁচব না।
হ্যাঁ, কিংবা না কিছু না বলে প্রাণগোপাল মন দিয়ে জীবনচন্দ্রের কথা শুনতে লাগলেন।
জীবনচন্দ্র তার কাঁধের ঝোলা থেকে একশো টাকার নোটের দশটা বান্ডিল মোট এক লক্ষ টাকা বার করে প্রাণগোপালকে দিলেন এবং সেই সঙ্গে একটি তালিকা। প্রাণগোপাল সেই তালিকাটি খুঁটিয়ে দেখলেন এবং টাকার বান্ডিল ও তালিকাটি যত্ন করে দেয়াল সিন্দুকে ভরে রাখলেন।
এর অল্প কিছুদিন পরে জীবনচন্দ্র মারা গেলেন।
খবর পেয়ে নবাগতা নায়িকার ফ্ল্যাট থেকে ছুটে এলেন প্রডিউসার ভাইপো। বার থেকে টলতে টলতে এসে গেলেন আরেক ভাইপো। অন্য একজন গাঁজা পার্কে উঠতি কবিদের সঙ্গে গঞ্জিকা সেবন করতে করতে পরবর্তী সংখ্যার পরিকল্পনা করছিলেন। তিনিও ছুটে এলেন।
দেখা গেল, কোনও রকমে জ্যেষ্ঠতাতের শেষকৃত্য নমোনমো করে শেষ করে যে যার ভাগ তাড়াতাড়ি বুঝে নেওয়াই তাদের সকলের উদ্দেশ্য।
জীবনচন্দ্রের এক ভাই তখনও জীবিত। কিন্তু পক্ষাঘাতে তিনি শয্যাশায়ী। বাকরুদ্ধ। তাঁর মতামত কিছু জানা গেল না। তবে তার মত আর কী আলাদা হত?
সবাই বলাবলি করছে কাশী মিত্রের ঘাটে নিয়ে যাবে না নিমতলায়। কোথায় তাড়াতাড়ি হবে।
এমন সময় খবর পেয়ে প্রাণগোপাল এলেন। এসে বললেন, আপনাদের কিছু ভাবতে হবে। আমি সব ব্যবস্থা করছি।
সত্যিই সুব্যবস্থা। একজন মৃতের জন্যে এর চেয়ে ভাল ব্যবস্থা আর হতে পারে না।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ফুলে ঢাকা বিশাল ট্রাক এল। এক হাজার আটটি শ্বেতপদ্ম দিয়ে সাজানো। এল অগুরু, চন্দন। সিল্কের পাঞ্জাবি, তাতের কোরা ধুতি পরানো হল জীবনচন্দ্রকে, যেসব জিনিস তিনি জীবনে পরিধান করতে পারেননি।
সাদা ফুলে সাজানো মাইক লাগানো আরও বহু গাড়ি এল। বিখ্যাত সানাইবাদক রহমতুল্লা করুণ, করুণতর সুরে সানাই বাজালেন। তার পিছনের গাড়িতেই ততোধিক বিখ্যাত কীর্তন গায়িকা আশারানী। তিনি মধুর কণ্ঠে হরিনাম গাইতে লাগলেন।
শ্মশানে আর এক এলাহি কাণ্ড। কয়েক মণ চন্দন কাঠ, দুই কলসি ঘি। শ্মশান বন্ধুদের জন্যে দই, রাবড়ি, সন্দেশ।
মহাসমারোহে জীবনচন্দ্রের সকার হল। ভাইপোরা স্তম্ভিত হয়ে গেল।
শুধু যারা জীবনচন্দ্রকে জানত না, যারা শবযাত্রা ও সৎকারের প্রত্যক্ষদর্শী তারা সবাই একবাক্যে স্বীকার করল, একেই বলে বেঁচে থাকা। একেই বলে বাঁচার মতো বাঁচা।
বাণেশ্বরের রোগমুক্তি
বাণেশ্বর সরকার একসময়ে খুব সিগারেট খেতেন। প্রতিদিন প্রায় তিরিশ-চল্লিশটা। একবার তার খুব গলা ফুলে যায়, ডাক্তারকে দেখান। ডাক্তারবাবু বলেন, আপনাকে সিগারেট খাওয়া ছাড়তে হবে। আপনার গলার মধ্যে চাকা চাকা, লাল হলুদ দাগ দেখা যাচ্ছে। সিগারেট খাওয়া বন্ধ করলে এগুলো মিলিয়ে যাওয়ার আশা আছে। আর সিগারেট খাওয়া যদি না ছাড়তে পারি বাণেশ্বরের এই সংলগ্ন প্রশ্নে নির্বিকার কণ্ঠে ডাক্তারবাবু মোক্ষম জবাব দিয়েছিলেন, ক্যান্সার হয়ে মারা পড়বেন।
এ ধরনের মর্মান্তিক কথা ডাক্তারবাবুরা সাধারণত বলেন না। বাণেশ্বরের দুর্বল চরিত্র সম্বন্ধে সবিশেষ জ্ঞান থাকায় ডাক্তারবাবু তাকে ভয় দেখিয়েছিলেন।
ভয়ে কিন্তু কাজও হয়েছে। বাণেশ্বর সিগারেট খাওয়া কমিয়েছেন, যদিও কেনা কমাননি। এখনও দৈনিক কুড়িটা সিগারেটের প্যাকেট দুটো কেনেন। খুব বেশি বিলি বিতরণ করেন তা নয়। তবে কোনও সিগারেটই ধরানোর পর একবারের বেশি দুবার টান দেন না। একটান দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে এক মুখ ধোয়া ছেড়ে মেঝেতে বা রাস্তায় যখন যা পায়ের নীচে থাকে সেখানে ফেলে দেন সিগারেটের টুকরোটা, তারপর নির্মমভাবে পায়ের জুতো দিয়ে মাড়িয়ে দেন জ্বলন্ত সিগারেটটি।
এইভাবে যাচ্ছিল। সারাদিনে চল্লিশটা সিগারেটে চল্লিশ টান, মোটমাট দুটো পুরো সিগারেটের সমান। বাণেশ্বরের গলা আর তাকে ভোগাচ্ছে না। কিন্তু সিগারেট খাওয়া দুম করে ছেড়ে দেওয়ার জন্যেই হোক অথবা অন্য কোনও কারণেই হোক, গলা সুস্থ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাণেশ্বর সরকারের কেমন যেন মাথার গোলমাল দেখা দিল।
প্রথম গোলমাল দেখা দিল তার জুতো নিয়ে। দৈনিক চল্লিশটি জ্বলন্ত সিগারেট হজম করতে গিয়ে তার জুতোর নাকি ক্যান্সার হয়েছে–এই রকম একটা সমস্যা দেখা দিল বাণেশ্বরের। একজন নামজাদা ডাক্তারকে তিনি যোগাযোগ করে দেখা করতেও গেলেন। এমনিতে তার কথাবার্তা শুনে কিছু বোঝা যায় না, ফলে অ্যাপয়েন্টমেন্ট অনুযায়ী বাণেশ্বরের যথাসময়ে ডাক্তারের চেম্বারে পৌঁছাতে বিশেষ কোনও অসুবিধে হল না। কিন্তু জুতো পরীক্ষা করতে, জুতো দেখতে ডাক্তারবাবুর রাজি হওয়া অসম্ভব।
