ডানদিকের বাড়ির ছাদে এক ভদ্রলোক দাড়ি কামাচ্ছিলেন, তিনি দাড়ি কামানোর আয়নাটা রৌদ্রে। ঘুরিয়ে টিয়াপাখির চোখে আলো ফেলে বিব্রত করতে চাইলেন। কিছু হল না, তখন নিরাশ কণ্ঠে বললেন, এসব পাখি একবার ধরলে বেঁচে থাকতে ছাড়ে না।
নন্দামাঈকা আশ্রমের পাখি এত হিংস্র স্বভাবের, এ কখনওই ভাবা যায় না। এই সময়ে ভাগ্য ভাল কোথা থেকে একটা বিড়াল রেলিং টপকে আমাদের দোতলায় ঢুকল আর সঙ্গে সঙ্গে টিয়াটা আমার ঘাড় ছেড়ে গুটিসুটি মেরে খাঁচার এক কোনায় সরে গেল।
ঘাড়ে ডেটল লাগাতে লাগাতে স্থির করলাম টিয়া দুটোকে বিদায় করব। পাঁচ টাকা খরচ করে পাখি কিনে উড়িয়ে দেব, বুকটা খচখচ করতে লাগল, কিন্তু কী করা যায়?
০৪.
ঘাড়ের ব্যথা কমলে মাথায় বুদ্ধি এল, পাখি দুটো কাউকে উপহার দিলে বেশ হয়। তেমন কাউকে, যার দংশন চিরদিন আমাকে পীড়া দিয়েছে তারই বিনিময়ে এই সামান্য উপহার। কিন্তু কলকাতায় কাউকে নয়, সে তাহলে পরদিনই ফেরত পাঠিয়ে দিতে পারে; দূরে, বহু দূরে কাউকে যার পক্ষে এটা ফেরত পাঠানো অসম্ভব হবে।
কিন্তু কাকে দেয়া যায়? ভাবতে ভাবতে বরাহমিহিরের কথা মনে পড়ল। বরাহমিহিরের বিয়েতে কিছু উপহার দেয়া হয়নি, সেই ছলে এই দংশনপ্রিয় টিয়া দুটি দেয়া যেতে পারে, সুমধুর দাম্পত্যজীবনের প্রতীকরূপে। তবু কীভাবে পাঠাব, এই প্রশ্ন ঝুলে রইল সামনে। বারান্দায় পায়চারি না করলে আমার বুদ্ধি তেমন খোলে না, কিন্তু বারান্দায় টিয়ার খাঁচা ঝোলানো রয়েছে, কিছুতেই আর সাহস হচ্ছে না বারান্দায় যেতে। বালিশে চিত হয়ে শুয়ে ভাবব তারও অবস্থা নেই, ঘাড়ে দগদগে কাটা ঘা।
ডাকে কি পাখি পাঠানো যায়? একবার ডাকঘরে গেলাম। অনুসন্ধান কাউন্টারে যে মহিলা বসেছিলেন তাকে বিহঙ্গমের ডাকযোগ্যতা সম্বন্ধে প্রশ্নে বোধহয় আমার কিছু ত্রুটি হয়েছিল, তিনি দুবার শুনলেন প্রশ্নটা তারপর বড় উত্তেজিত হয়ে পড়লেন, কী বললেন, এতবড় আস্পর্ধা। পাখি ডাকে যায় কিনা, ভদ্রমহিলাকে অপমান। তিনি তারস্বরে চেঁচাতে লাগলেন, ভিড় জমে গেল। এই সর্বপ্রথম লক্ষ করলাম ডাক বিভাগের কর্মীরা বড় বলশালী হয়। পাখি ডাকে যায় কিনা এই সামান্য সংবাদটি সংগ্রহ করা ছাড়া আমার আর কোনও উদ্দেশ্যই ছিল না–এই কথাটা বোঝাতে আমার আধ ঘণ্টা সময় গেল।
ব্যর্থ, ক্ষুব্ধ, অপমানিত হয়ে বাড়ি ফিরে তখনই খাঁচা হাতে বেরিয়ে পড়লাম। সোজা বরাহমিহিরের ওখানে যাব। দুই হাতে কবজি পর্যন্ত পুরু করে তোয়ালে জড়িয়ে নিলাম। আত্মরক্ষার্থে।
এবার বাস। কিন্তু প্রথমেই বাধা। বাসে উঠতেই কন্ডাক্টর বললেন, নেমে যান, নেমে যান, বাসে পাখি নিয়ে যাওয়া আইনে নিষেধ আছে।
আমি তখন উত্তেজিত, কীসের আইন মশায়। কোথায় আপনার আইন? কন্ডাক্টর পকেট থেকে একটা দুমড়ানো কাগজ বের করে দেখালেন, তাতে লেখা রয়েছে, মাতাল বা উন্মাদ অবস্থায়, বসন্ত হইলে অথবা কুকুর ও সাইকেলসহ বাসে ওঠা নিষিদ্ধ। এইসব সময়ে বিশেষ করে সাইকেল নিয়ে লোকে কেন বাসে উঠতে যাবে বুঝতে পারলুম না, কিন্তু টিয়াপাখির কথা কোথাও লেখা নেই।
তখন কন্ডাক্টর বললেন, তাহলে টিকেট লাগবে। দুটো টিয়ের দুটো আলাদা টিকেটকন্ডাক্টর যে বিজ্ঞপ্তি বার করেছিলেন তারই নীচের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে আমি দেখালাম, এই দেখুন তিন বৎসরের কম বয়স্কদের টিকেট লাগিবে না। আমার এই টিয়ে দুটো নেহাত বাচ্চা, দুগ্ধপোষ্য; এখনও ছমাস হয়নি।
সামনের সিট থেকে এক বুড়ো ভদ্রলোক আমার সপক্ষে বললেন, আর তা ছাড়া টিয়েপাখি তিন বছর বাঁচেই না।
কন্ডাক্টর গজগজ করতে লাগলেন। শেয়ালদা অবধি আসা গেল। এইবার মূল সমস্যা। রেলওয়ে আইনে স্পষ্ট লেখা রয়েছে পশুপাখির আলাদা বুকিং লাগবে। গেটে চেকার-সাহেবের সঙ্গে এই নিয়ে কিঞ্চিৎ বচসা হল। ইতিমধ্যে সুযোগ মতো টিয়া দুটো ইতস্তত তিনজন যাত্রী, একজন কুলি এবং একজন রেলকর্মচারিকে আহত করে ফেলেছে। প্রাথমিক শুশ্রূষার অঙ্গ হিসেবে আমি একশিশি ডেটল সঙ্গে এনেছিলাম, সেটা কিছু কাজ দিল। হয়তো মারধোরও কিছু হত আমার উপরে, কিন্তু আমার হাতে শাণিত চক্ষু দুটি টিয়া, কেউ আমাকে আক্রমণ করতে সাহস পেল না। পনেরো গজ ব্যাসে বৃত্তাকারে মারমুখী জনতা আস্ফালন করতে লাগল।
গতিক বুঝে আমি বুকিং করতে রাজি হয়ে গেলুম। বুকিংয়ে প্রথম ধাপ ওজন করা। এই রকম মারাত্মক দুটি জীব আলাদা আলাদা ওজন করা কী করে সম্ভব, ভাবতে ভাবতে বুকিং অফিসে এসে পৌঁছলাম। বুকিংয়ে যে ভদ্রলোক বসেছিলেন তিনি, আমি কিছু বলবার আগেই, খাঁচার দরজাটা যেই খুলেছেন, একটা টিয়া বেরিয়ে গিয়ে তাঁর নাক থাবা দিয়ে ধরল। দ্বিতীয় টিয়াটি কোনও গতিকে ছুটে ওপাশের প্ল্যাটফর্মে এক ভদ্রলোক আপনমনে তরমুজের ফালি কামড়াচ্ছিলেন তাকে কিচমিচ করে জাপটে ধরল।
আর এক মুহূর্তও নয়। কোলাপুরি চপ্পলের মায়া ত্যাগ করে আমি এক লাফে স্টেশন থেকে সামনের ফুটপাথে, পরের লাফে একটা চলন্ত ট্যাকসিতে।
বাঁচার মতো বাঁচা
বড় বড় লেখকেরা বাঁচা মরার গল্প লিখে কিংবা উলটো ভাবে বলা যায় মরা বাঁচার কাহিনি লিখে নাম করেন। বাঁচা মরার গল্প খুব গুছিয়ে লিখতে পারলে, তার মধ্যে আর্থ সামাজিক বীক্ষণ যদি থাকে তবে তো পোয়াবারো, জয়জয়কার।
