নিম্ন স্বাক্ষরকারীর বিবাহ রেজেস্ট্রিকৃত হইয়া গিয়াছে সুতরাং বন্ধুদের জানাইতে আর বাধা নাই। আলাদাভাবে অসংখ্য বন্ধুকে নিমন্ত্রণ করা অসম্ভব। সুতরাং এই বিবাহ উপলক্ষে আয়োজিত ভোজসভায় যাঁহারা যোগদান করিতে ইচ্ছুক আগামী শনিবার বিকাল পাঁচ ঘটিকায় মনুমেন্ট পাদদেশে সমবেত হইয়া ব্যক্তিগতভাবে আমার নিকট হইতে নিমন্ত্রণপত্র গ্রহণ করিতে আবেদন করিতেছি।
বলা বাহুল্য, এই বিজ্ঞাপন বরাহমিহিরের বিয়ের। এর পরে বরাহত্ব প্রসঙ্গে কোনও প্রশ্নই বোধহয় ওঠে না। এবং এর পরেও কী করে এই নিমন্ত্রণে এত লোক এল, কোনও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন পাঠক নিশ্চয়ই এরকম প্রশ্ন তুলতে পারেন, কিন্তু তিনি বরাহমিহিরের বন্ধুদের একবার জানলে আর এ প্রশ্ন তুলবেন না।
সে যাহোক, বরাহমিহিরের শ্যালী প্রসঙ্গে প্রত্যাবর্তন বাঞ্ছনীয়। আমি অঙ্কে কাঁচা। সূতরাং তার শ্যালীর সংখ্যা কয়টি এ আমার পক্ষে গণনাতীত। নিমন্ত্রিতদের মধ্যে বিশুদ্ধ অঙ্কে একজন ডি-ফিল ছিলেন, তাঁকে প্রশ্ন করায় তিনি খুব অপমানিত বোধ করে মুখ-চোখ লাল করে বললেন, আমি কি চৌকিদার না সেন্সাস অফিসার? এ প্রশ্নের উত্তর নেই, বলতে কী সেদিন সেই নিমন্ত্ৰণবাড়িতে আমাদের অনেকেরই এরকম সংশয় দেখা দিয়েছিল যে, আমাদের সমীপবর্তিণী সমস্ত কুমারীই বুঝি বরাহমিহিরের শ্যালীসম্পর্কীয়া।
সব একরকম দেখতে। একই ভঙ্গির কবরী রচনা, প্রত্যেকের চোখে একই কটাক্ষ, গ্রীবায় অবিকল এক বঙ্কিমতা। এই মুহূর্তে যাঁকে জানা গেল টেলিফোন একসচেঞ্জে কাজ করেন বলে, পরমুহূর্তে আবিষ্কার করলাম তিনি তিনি নন, তিনি পাড়ার শখের থিয়েটারে জনপ্রিয় অভিনেত্রী এবং সঙ্গে সঙ্গে জানা গেল তিনি তিনিও নন, তিনি এখন ঘি পরিবেশন করছেন আর সেই তিনি জুনিয়র হাইস্কুলে হেডমিস্ট্রেস। সমস্ত ব্যাপারটা ভীষণ গোলমেলে হয়ে ঘুলিয়ে গেল। সমরেন্দ্র খেতে খেতে কার কাছে আলোয়ান জমা দিয়েছিল, আমি নেমেই কাকে আমার ব্যাগ রাখতে দিয়েছিলাম সব জড়িয়ে গেল। যাকে একটু আগে স্কুলের ছাত্রী জেনে শংকর এক গ্লাস জল চাইল, এই খুকি, এক গ্লাস জল দাও তো। খুকি বলমাত্র তিনি রেগে দুটো কাঁচের গ্লাস আর একটা আয়না ভাঙার পর জানা গেল, তার বয়স সাতচল্লিশ। তিনি স্কুল ছেড়েছেন আজ তিরিশ বৎসর, সেই প্রায় নন-কো-অপারেশনের সময়।
০৩.
সকালবেলা দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে রোদ পোহাব কিনা মনস্থির করতে পারছি না এমন সময়ে একসঙ্গে গোটা কয়েক কোকিলের ডাকে খেয়াল হল রোদ পোহানোর দিন চলে গেল। কিন্তু শুধু কোকিলই নয় আরও নানা পাখি আমাদের বাড়ির বাইরে ভীষণ কিচিমিচি লাগিয়ে দিয়েছে। আমার বারান্দা থেকে সদর রাস্তা দেখা যায় না, সিঁড়ি দিয়ে নেমে রাস্তায় যেতে হল। বিশাল দুই খাঁচায় অজস্র ভিন্ন জাতের, বিচিত্র রঙের পাখি, দূর দূর জঙ্গল আর জনপদের খ্যাত-অখ্যাত বিহঙ্গ সমিতি।
কী মনে করে পাখিওলার কাছ থেকে প্রায় পনেরো মিনিট দামদর করে দুটো টিয়াপাখি কিনে ফেললাম। এক ধরনের পাখি, চোখটা লাল টুকটুকে, চারপাশে বেগুনি অঞ্জন মাখা, মধ্যে মধ্যে এদিক ওদিক তাকিয়ে নির্লিপ্তভাবে সিটি দিচ্ছে, এমনই সেই সিটি যে অ্যান্টি-রাউডি পুলিশের আওতায় পড়ে যায়। সেটাও কিনব ভাবছি, রাজেনবাবুর স্ত্রী এর মধ্যে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছেন, তিনি বললেন, এই পাখিগুলো মিছরি ছাড়া কিছুই খায় না।
পাখিওলা শুনে বললে, না, তাজা ফড়িংও খায়। একই সঙ্গে এমন শর্করাবিলাসী এবং মাংসাশী প্রকৃতির পরিচয় পেয়ে চমৎকৃত হলাম। কিন্তু এই দুর্দিনের বাজারে মিছরি জোগাড় করা কিংবা গড়ের মাঠে গিয়ে অফিস কামাই করে ফড়িং ধরা কোনওটাই আমার পক্ষে সম্ভবপর বলে মনে হল না।
পাখিওলা টিয়াপাখি দুটোর দাম চেয়েছিল চৌদ্দ টাকা, আর সঙ্গে খাঁচা পাঁচ টাকা এবং করজোড়ে বকশিশ এক টাকা, সব মিলে কুড়ি টাকা। এই টিয়াগুলো নাকি মোটেই সাধারণ টিয়া নয়, নেপালে জয়বাবা হরহর ত্রৈলোকেশ্বর পাহাড় (পাখিওলা বর্ণনার সময় এইখানে এসে কপালে হাত ঠেকিয়েছিল) তার পেছনে নামাঈকা আশ্রম (আবার কপালে হাত), সেই আশ্রমের টিয়া বহু শ্রমে সংগৃহীত।
আমি শুনে তাজ্জব বোধ করছিলাম, বারাসত, দমদম কিংবা শ্রীরামপুর, ত্রিবেণী থেকে না ধরে নন্দামাঈকা আশ্রম পর্যন্ত ধাওয়া করতে হয়েছিল টিয়া ধরবার জন্যে, এর পরে দামদরের বোধহয় প্রশ্নই ওঠে না। রাজেনবাবুর স্ত্রী কিন্তু বাদ সাধলেন, কোনও রকম অবান্তরতায় না গিয়ে সোজাসুজি বললেন, খাঁচার দাম পাবে না। টিয়া দুটো রেখে দুটো টাকা নিয়ে যাও। যদি বেঁচে থাকে সামনের মাসে এসে আর এক টাকা নিয়ে যেয়ো
এই প্রস্তাবে পাখিওলা তা-না না করতে লাগল আর আমি ভীষণ অবাক হয়ে গেলাম এই দেখে যে কত সহজেই সবসুদ্ধ পাঁচ টাকায় পাখিওলা পাখি দুটো দিয়ে দিল।
কিন্তু কেন কিনলাম টিয়া দুটো? বারান্দায় কাপড় ঝোলানোর তারে খাঁচা ঝুলিয়ে ভাবতে লাগলাম। এখন এর জন্যে কাঁচালঙ্কা, ছোলা এইসব নিয়মিত সংগ্রহ করা সে আর এক দায় হয়ে দাঁড়াল। এই সব অন্যমনস্ক হয়ে ভাবছিলাম, খাঁচার ভেতর থেকে ঠোঁট বার করে একটা টিয়া কখন আমার ঘাড়ের নীচে খুবলে ধরেছে। ব্যাপারটা বুঝতে কয়েক সেকেন্ড গেল, কিন্তু ততক্ষণে কাঁধ দিয়ে গলগলিয়ে রক্ত পড়তে আরম্ভ করেছে। প্রাণভয়ে পরিত্রাহী চিৎকার করতে লাগলাম। নিচতলার অধিবাসীরা সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে উঠে এলেন, আশেপাশের বাড়ির জানলায় তোকজন দাঁড়িয়ে গেল। কিন্তু টিয়া নাছোড়বান্দা, কিছুতেই কামড় ছাড়ে না। মধ্যে মধ্যে অল্প অল্প ঘাড়ে আঁকি দিচ্ছি, কিন্তু ভয়ংকর যন্ত্রণা, টিয়া কিছুতেই ছাড়ে না।
