একটা টাকা? মুখে বলতে বলতে আমি মনে মনে ভাবলুম আম খেতে রাজি না হলেই ভাল ছিল।
হ্যাঁ, দুজনে দুটো আম খেতুম। এক যাত্রায় পৃথক ফল হয় কেন? আর আম হল সেরা ফল, বুঝলেন কিনা? নিজের রসিকতার আনন্দেই হোক বা রুইয়ের মাথাটা আয়ত্তে আনার সার্থকতাতেই তোক তিনি আকর্ণ হাসলেন।
আমি থিতিয়ে থিতিয়ে জানালাম, তা হতে পারে একটা টাকা। বরাহমিহির ম্যানেজারের দিকে তাকিয়ে অর্ডার দিলেন, ম্যানেজার তাঁর কাউন্টার থেকে চেঁচিয়ে, ভেতরে যেখানে রান্না হয়। খাবার-দাবার থাকে সেদিকে মুখ করে বললেন, এই দুটো আম, আলাদা আলাদা করে মিহিরবাবুর টেবিলে।
বাচ্চা বেয়ারাটা খাবারের ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। ম্যানেজারবাবুর আদেশ শুনে সামনের তাক থেকে দুটো ডিশ নিয়ে ভেতরে চলে গেল, একটু পরই বেরিয়ে এল ফঁকা ডিশ দুটো নিয়ে, এসে যেখান থেকে নিয়েছিল সেখানে রেখে আমাদের টেবিলে বরাহমিহিরের পাশে এসে দাঁড়াল। বরাহমিহির তখন চোখ বুজে ডিমের ঝোল থেকে ডিম তুলে নিয়ে, যেভাবে বাচ্চারা লজেঞ্জস চোষে, সেইভাবে চুকচুক করে চুষছেন। বেয়ারাটা ওঁকে একটু পর্যবেক্ষণ করল, তারপর আমার দিকে একবারও না তাকিয়ে ম্যানেজারের কাছে গিয়ে কী জানাল। ম্যানেজার শুনে নিয়ে আবার খাবার ঘরের দিকে মুখ করে চিৎকার করে বললেন, এই ভজুয়া আম কাট, আম কেটে দে তাড়াতাড়ি।
অনুমান করলাম ভজুয়া নামে কোনও ভিতরস্থ কর্মচারি কোনও কারণে আম কাটতে অক্ষমতা জানিয়েছে। কিছু সময় গেল, এর মধ্যে বরাহমিহির খাওয়া প্রায় গুছিয়ে এনেছেন। দ্বিতীয় ডালের বাটির অর্ধেকটা বাঁচিয়ে রেখেছিলেন, ডিমের ঝোলের দুটো আলু ছিল, একটা লেবুর আচার আর কিছু লঙ্কা, পেঁয়াজ তখনও ছিল; আরেক প্লেট ভাত এনে চটকিয়ে মেখে চেটেপুটে খেয়ে নিলেন।
আম কিন্তু দিল না। বরাহমিহির হাত ধুয়ে এলেন, আমের কথা তিনিও আর কিছু বললেন না। কিন্তু আমি ভাবলাম ম্যানেজার তো আম কাটতে বলেছিলেন, দাম না চায় আবার। কাউন্টারে ম্যানেজারকে এসে বললাম, আম কিন্তু দেয়নি।
আজ্ঞে, আম তো কাটা হয়ে গেছে। ম্যানেজারের বিনীত নিবেদনের উত্তরে আমি বললাম, কাটা হয়েছে কিন্তু আমাদের দেয়া হল না কেন?
বরাহমিহির একটা কনুই দিয়ে গুতো দিয়ে আমাকে বললেন, আরে তা নয়, ফুরিয়ে গেছে বলে কেটে দিয়েছে। ওই দেখুন। ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে তাকালাম আমের পাশে একটা কাটা চিহ্ন পড়েছে, কখন এর মধ্যে আম এবং আরও কিছু কিছু কেটে দেয়া হয়েছে।
এবার বুঝলেন তো,বরাহমিহির মৃদু হেসে বললেন, আমের দামটা তো লাগল না, এবার তাহলে আমার মিলের চার্জটা দিয়ে দিন। আমের দামের বদলে আমার দাম। হেঁ হেঁ বরাহমিহির পুনরায় আকর্ণ হলেন।
০২.
অনিবার্য কারণবশত আজ এই বিবাহ-উৎসব বন্ধ রহিল। অভ্যাগতদের পরবর্তী সময় এবং স্থান পরে জানানো হইবে।
কলকাতা থেকে ছত্রিশ মাইল রাস্তা লোকাল ট্রেনে গলদঘর্ম হয়ে ঝুলতে ঝুলতে এসে, তারপর খোয়ার রাস্তা রিকশায় কিছুটা, কিছুটা পায়ে হেঁটে পৌনে দুই মাইল, শ্রান্ত, ক্ষুধার্ত অবস্থায় এই ধরনের বিজ্ঞাপন দেখব নিমন্ত্রণ বাড়িতে এসে এরকম আমরা কেউ কখনও দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি।
সঙ্গী বন্ধুরা মারমুখী। ধরতে গেলে বরাহমিহিরের বিয়েতে আমিই জোর করে তাদের ধরে এনেছি। কে আর কলকাতা ছেড়ে শনিবার সন্ধ্যাবেলা আসতে চায়? আর সকলেরই খটকা ছিল বউভাত কেন মেয়ের বাড়িতে হবে, ছেলের যেখানে কলকাতায় বাড়ি রয়েছে। এই বিজ্ঞপ্তি দেখবার পর অবশ্য আর কোনও খটকাই রইল না, ব্যাপারটা জলের মতো পরিষ্কার মনে হল।
কেউ কেউ বলল, বিয়ে-টিয়ে সব বাজে কথা, বরাহমিহিরের আবার বিয়ে। কিন্তু ম্যারেজ রেজিস্ট্রারের অফিসে আমি নিজে অন্যতম সাক্ষী ছিলাম। বিয়েটা যে অন্তত সত্যি সেটা আমি আইনত অস্বীকার করতে পারব না।
সুতরাং আমি চুপ করে রইলাম। এমন সময় সমস্ত রহস্যের উপর যবনিকা টেনে বরাহমিহির নিজেই পাশের একটা গলি থেকে বেরিয়ে এলেন, মুখে অমল হাসি, এই যে আপনারা এসে গেছেন।
বরাহমিহিরকে দেখে সকলের সঙ্গে আমিও প্রচণ্ড খেপে গেলাম। এসে গেছি মানে? এসব ইয়ার্কির মানে কী, মশায়?
বরাহমিহির কিন্তু বিচলিত হলেন না। বললেন, কী করব এ বাড়িটা বড় ছোট, জায়গা হবে না। বিয়েবাড়ি যদি একটু খোলামেলা না হয়।
যদি একটু খোলামেলা না হয়, তাই বলে খাওয়া হবে না, বিয়ে বন্ধ থাকবে? একজন নিমন্ত্রিত উত্তেজিতকণ্ঠে বললেন।
বিয়ে বন্ধ থাকবে কেন, বিয়ে তো আগেই হয়ে গেছে। আর খাওয়ার বন্দোবস্ত পিছনের ওই বাড়িতে। বরাহমিহির কিছু দূরে আলোকিত একটি বাড়ির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করলেন।
তাহলে এই নোটিশ এখানে লটকানো রয়েছে কেন? এতক্ষণ রাগে সমর কিছু বলতে পারছিল না, এবার গিয়ে একটানে সাইনবোর্ডটা টান দিয়ে নামাল।
বরাহমিহির খুব করুণ প্রায় পরিতাপের কণ্ঠে বললেন, কী করব বলুন, ওটা আমার শ্যালীরা টাঙিয়েছে, কতবার না করলুম কিছুতেই শুনল না। ওদের বাড়িতেই যখন ব্যাপারটা হচ্ছে আমি আর কী করি?
অভ্যাগতদের অধিকাংশই অবিবাহিত, সুতরাং এই শ্যালীঘটিত প্রসঙ্গের উল্লেখে সবাই কেমন যেন কাবু বোধ করলেন। কিন্তু তখনও ঢের বাকি ছিল।
এতক্ষণ বরাহমিহির বলে যাঁর উল্লেখ করেছি তার আসল নামের সঙ্গে বরাহ অংশটুকু যোগ করে এই পুরো নামটা বন্ধুদের প্রদত্ত। অবশ্য এই পশুত্ব অর্জনে তাকে বিশেষ শ্রমস্বীকার করতে হয়নি, তার স্বভাব-চরিত্রই এর জন্য দায়ী বলা যায়। বিভিন্ন বাংলা পত্রিকায় সপ্তাহ দুয়েক আগে এই বিজ্ঞাপনটি নিশ্চয়ই অনেকের নজরে পড়েছিল:
