মুখটা দেখতে পাচ্ছি না, কিন্তু গলার স্বরটা? কে বরাহমিহির না? আমি উঠে দাঁড়ালাম।
সত্যিসত্যিই বরাহমিহির। আমি উঠে দাঁড়াতেই যেন কিছুই ঘটেনি এইভাবে আমাকে হাসিমুখে অভ্যর্থনা করলেন, কী খবর, আপনিও আটকে গেছেন দেখছি। আমি বিনীতভাবে ঘাড় নেড়ে স্বীকার করলাম। একটু আগের ঘটনায় লজ্জিত হব কিনা স্থির করার আগেই লক্ষ করলাম বরাহমিহিরের। হাতে ছোট ছোট চার-পাঁচটা ঠোঙায় যেন কী সব রয়েছে। বরাহমিহির তাহলে বিয়ে করে পুরোপুরি সংসারী হয়ে গেছেন। রাত দশটায় সওদা করে বাড়ি ফিরছেন।
এগুলোর মধ্যে কী? আমার প্রশ্নের উত্তরে বরাহমিহির বললেন, আর বলবেন না মশায়, আমি তো এদিকে হোটেলে খাই। রাত দশটা হয়ে গেল, আটকা পড়লুম বৃষ্টিতে, এদিকে হোটেল বন্ধ হয়ে যায়।
আমার প্রশ্নের কিন্তু উত্তর হল না। আমাকে আরেকবার কৌতূহল প্রকাশ করতে হল, কিন্তু এগুলো কী, এইসব ছোট ছোট ঠোঙায়?
এবার আমার জবাব না দিয়ে বরাহমিহির বারান্দার বাইরে হাত বাড়িয়ে একটু পরীক্ষা করে নিয়ে তারপর এক লাফে রাস্তায় নেমে পড়লেন এবং সঙ্গে সঙ্গে আমাকে এক টান, বৃষ্টি ধরে গেছে, নেমে আসুন, আমার সঙ্গে হোটেল পর্যন্ত আসুন দেখতেই পাবেন, এগুলো কী? একটু থেমে ঘুরে তাকিয়ে বললেন, এর থেকে ভাগ পাবেন না কিন্তু।
কিছুটা হেঁটে হিয়ে হোটেলে উঠলাম। দেখলাম বরাহমিহির এখানে বেশ পরিচিত। আমি আর বরাহমিহির বসলাম। দূরে এক কোণে একটা ব্ল্যাকবোর্ড টাঙানো রয়েছে দেয়ালে, তার উপরে সাদা হরফে লেখা রয়েছে খাদ্যতালিকা আর নীচে সাত আনার কম খাওয়া নাই, এবং আমাদের কোনও ব্রাঞ্চ বা শাখা নাই।
সে যাহোক, বরাহমিহির খুব ধৈর্য সহকারে খাদ্যতালিকাটি পর্যবেক্ষণ করলেন প্রায় মিনিট পাঁচেক ধরে। বহুবিধ খাদ্যদ্রব্য আর তার মূল্য লেখা চকখড়ি দিয়ে, দু একটার পাশে এরই মধ্যে ক্রশ চিহ্ন দেয়া, বোধহয় ফুরিয়ে গেছে কিংবা পাওয়া যাবে না।
যতক্ষণ বরাহমিহির খাদ্যতালিকা নিয়ে গবেষণা করছিলেন, পাশে একটি ছোকরা বয় মৃদু হাস্যময় মুখে দাঁড়িয়েছিল, এইবার তার সঙ্গে বরাহমিহির নিচুগলায় কী একটু আলোচনা করে ঠোঙাগুলো তুলে দিলেন তারপর ম্যানেজারের দিকে মুখ করে অর্ডার দিলেন, দুপ্লেট ভাত, ডাল দুবাটি, আলুভাজা চারানা, পটল সেদ্ধ দুটো, রুই মাছের মাথা দুটো ইত্যাদি হরেক খাদ্যদ্রব্য, সব দুটো করে।
আমি আপত্তি জানালাম, না, না বাড়িতে আমার রান্না হয়ে রয়েছে, আমি কিছু খাব না। কিছু খাবেন না, যেন কিছু নয় এইভাবে বরাহমিহির বললেন, ঠিক আছে আমি একাই খেতে পারব। এর মধ্যে বাচ্চা বেয়ারাটা প্লেটে করে অনেকগুলো কাঁচালঙ্কা, পাঁচটা আস্ত পেঁয়াজ ফালি করা, তিনটে তিনটে করে লেবু আর লঙ্কার তেল-আচার এনে দিল। বরাহমিহির মৃদু হেসে বললেন, এগুলো আমার ঠোঙায় ছিল বুঝলেন, হোটেলে আসার সময় মুদিখানা আর পানের দোকান ঘুরে কিনে আনি।
খাওয়ার ওই অর্ডারের পরে আমার আর অবাক হওয়ার উপায় ছিল না, আমি মনে মনে গুনে দেখলাম চব্বিশটা কাঁচালঙ্কা। ছটা কাঁচালঙ্কা, একটা তেল লঙ্কা, দেড়টা পেঁয়াজ সহযোগে একবাটি ডালভাত দিয়ে মেখে খেয়ে, পরের বাটিতে চুমুক দিতে দিতে আমাকে বললেন, আপনি কিছু খান। অন্তত একটা আম।
আমি দুসপ্তাহ মাছ খাইনি, আর বরাহমিহির এর পরে ওই মাছের মাথা দুটো একলা আমার সামনে বসে বসে খাবে। এইসব ভাবতে ভাবতে আমি বললাম, তা, আম পাওয়া যাবে এখানে?
বরাহমিহির খাদ্যতালিকার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করলেন। দেখলাম একেবারে নীচের দিকে কলার পাতা পাঁচ পয়সা, মাটির ভাঁড় চার পয়সা, তার উপরে লেখা রয়েছে, আম পঞ্চাশ পয়সা।
আপত্তি করে কোনও রকম বোকামির মধ্যে না গিয়ে আমি সোজাসুজি রাজি হয়ে গেলাম, ঠিক আছে একটা আম খাওয়া যাক। নিচু হয়ে রুইয়ের মাথাটা যথেষ্ট যত্নসহকারে চিবুতে চিবুতে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, কত দাম লেখা রয়েছে পাশে একটু দেখুন তো। সব জিনিসই খাওয়ার আগে দাম জেনে নেওয়া ভাল। না জেনে আমি একবার যা বিপদে পড়েছিলুম। একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে বরাহমিহির তার হাতের তর্জনী দিয়ে ডান চোখের ওপর দিকে একটা কাটা দাগ দেখালেন।
নিশ্চয়ই এর পিছনে খুব করুণ কাহিনি রয়েছে, যা শুনলে হয়তো অশ্রু সংবরণ করা কঠিন হবে। কিন্তু রাত্রে বাড়ি ফিরে আমাকে অদ্বিতীয়ের এই সপ্তাহের কিস্তি দিতে হবে, কোনও করুণ কাহিনির সুযোগ সেখানে নেই সুতরাং অশ্রুসম্বরণ করতে হল। আমি সোজা কথায় ফিরে গেলাম, আমের দাম দেখছি পঞ্চাশ পয়সা লেখা রয়েছে।
দ্বিতীয় মস্তকটির গোড়ার দিকটি কিছুতেই আয়ত্ত করতে পারছিলেন না, একবার হাঁ করে মুখের মধ্যে পুরোটা ঢুকিয়ে দিয়ে প্রায় দমবন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হতে প্লেটে নামিয়ে রেখে একটু হাঁপালেন। মোটা মানুষ অল্পেই হাঁপিয়ে পড়েন। একটা আম খাওয়াচ্ছেন বলেই হোক বা অন্য যেকোনও কারণেই হোক আমার একটু মায়া হল।
একটু জিরিয়ে নিয়ে আঙুল দিয়ে মুখ ঘাঁটলেন, বেশ পরিতৃপ্তিসহকারে একটা সেঁকুর তুললেন, ধীরে-সুস্থে প্লেটস্থিত মাছের মাথাটার দিকে তাকিয়ে আবার হাতে তুলে নিলেন। ৫২৬
মুখের ভিতর মাছের মাথার সামনের দিকটা চালিয়ে দিতে দিতে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কত দাম বললেন? তারপর আমার জবাবের জন্য প্রতীক্ষা না করে নিজেই মাথা ঘুরিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডটার দিকে তাকালেন, উচ্চারণ করে পাঠ করলেন, আম পঞ্চাশ পয়সা। এই স্বগত উক্তিটুকু করে নিয়ে চোয়াল শক্ত করে মাড়ি দিয়ে মাছের মাথাটায় চাপ দিলেন, এবার মাথাটা বোধহয় মুখের মধ্যে ভেঙে গেল, কিছুক্ষণ আপনমনে চিবিয়ে আমাকে বললেন, আপনার কাছে একটা টাকা হবে?
