তা ছাড়া পাঁচশো টাকার নোট শুনলেই পটলবাবুর বুকের রক্ত হিম হয়ে যায়।
গত বছর ভুটানের এক প্রযোজক দোজেন দোরজি টালিগঞ্জের স্টুডিয়োতে একটা ভুটিয়া ছবির কাজ করেছিলেন। সে বইয়ে ব্যবস্থাপনার কিছু কাজ পেয়েছিলেন পটলবাবু। কাজের শেষে পাঁচটা পাঁচশো টাকার নোট মোট আড়াই হাজার টাকা পারিশ্রমিক পটলবাবুকে মি. দোরজি দিয়েছিলেন।
সেই নোট ভাঙাতে গিয়ে পটলবাবুকে পুলিশের হাতে পড়তে হয়। পাঁচটি নোটই জাল, এবং একই নম্বরের। লালবাজারের জালিয়াতি শাখায় তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানে গিয়ে দেখেন তাঁর আগেই হাজতে রয়েছেন মি. দোজেন দোরজি, সেই ভুটানি প্রযোজক।
মি. দোরজিকে দেখামাত্র পটলবাবু পুলিশকে বলেন যে তিনি টাকাগুলো এর কাছ থেকেই পেয়েছেন। একটু জেরা করার পর পুলিশ অফিসাররা পটলবাবুর কথার সত্যতা বুঝতে পারেন। দোজেন দোরজিকে আদালতে সোপর্দ করা হয়। সেই মামলা এখনও চলছে। দোরজি আসামি, সরকারপক্ষে প্রধান সাক্ষী পটলবাবু।
সে যা হোক, আজ খাঁড়াদাকে পটলবাবু বললেন, দাদা এই মুহূর্তে আমার কাছে কোনও টাকা নেই তবে আমার কাজটা করে দিলে আপনাকে আমি অন্তত দুটো ফাইভারের ব্যবস্থা করে দেব।
খাঁড়াদা পটলবাবুর কথা শুনে খুবই মনঃক্ষুণ্ণ হলেন। কিন্তু টাকার লোভেই কেসটা হাতছাড়া করলেন না।
সমস্ত কিছু শুনে নিয়ে তিনি বুঝতে পারলেন, বইমেলায়, সুষ্ঠুভাবে শুটিং করাটাই এই বইয়ের সমস্যা। একে বইমেলায় গিজগিজে ভিড় তার উপরে হিরো-হিরোইন, ক্যামেরা এসব যুক্ত হলে কেলোর কীর্তি হওয়া মোটেই আশ্চর্য নয়।
অনেক চিন্তা-ভাবনা করে খাঁড়াদা প্রথমে পটলবাবুকে পাঠালেন কলেজ স্ট্রিটে বইমেলার প্রধানদের কাছে। কিন্তু সেখানে বিশেষ কোনও সুবিধে হল না।
প্রধান কর্তাদের অন্যতম মিত্র ও ঘোষের ভানুবাবু মৃদুভাষী স্থিতধী মানুষ। সব কথা ভেবেচিন্তে বলেন। কখনও কোনও বিষয়ে সহজে হ্যাঁ কিংবা না বলেননি।
ভানুবাবু সব শুনে বললেন, একটু ভেবে দেখি আপনি সামনের সপ্তাহের শেষের দিকে ফোন করবেন।
পরের সপ্তাহের শেষদিকে তিনি বললেন, আরেকটু ভাবি। এক সপ্তাহ পরে আসুন।
এদিকে আনন্দ পাবলিশার্সের বাদলবাবুর কাছে যেতে তিনি তেড়ে এলেন। আসলে পটলবাবু ভুল করেছিলেন, বাদলবাবু মোটেই তেড়ে আসেননি ওটা ওঁর কথা বলার স্টাইল।
এর চেয়ে বিপদ হয়েছিল দেজ পাবলিশিংয়ের সুধাংশু দের কাছে। তাঁকে যাই বলা হোক, তিনি চোখের কোনায় হাসেন আর বলেন, খুব ভাল কথা।
.
ভাল কথা বটে। কিন্তু কোথাও কোনও সুবিধে হল না। পুরো ডিসেম্বর মাসটা পার হল পটললালের। ছিন্নপাদুকা, ভগ্নহৃদয়, নিরাশ মনে পটললাল খাঁড়াদার কাছে ফিরে এলেন।
এদিকে পরিচালক, প্রযোজক দুজনেই পটলবাবুকে চাপ দিচ্ছেন ইনডোরের কাজ শেষ হয়ে এসেছে। এখন বইমেলার আউটডোরটার প্রস্তুতি নিতে হবে। আর বইমেলার তো খুব বেশি দেরি নেই।
সব কথা শুনে খাঁড়াদা বললেন, আমারই ভুল হয়েছে। বড় বড় ঘোড়েল লেখকেরা পর্যন্ত ডিগবাজি খায় যেখানে, সেখানে পটল কী করতে পারবে। আমারই বোঝা উচিত ছিল।
এরপর বরের ঘরের মাসি, কনের ঘরের পিসি চলচ্চিত্রের বইমেলায় যে শুটিং হয়নি, তা কিন্তু নয়।
খাঁড়াদাই মতলব করলেন।
বইমেলা আরম্ভ হওয়ার আগে মানে প্রথম রবিবারের আগে, ভিড় জমতে না জমতে একদিন সকালের দিকে এসে বাইরের গেট, দেয়াল তারপর ভিতরের দোকান-টোকানের ছবিগুলো তুলে ফেলা।
তারপর একদিন সন্ধ্যায় এসে বাইরের জমজমাট ভিড়, কাউন্টারে এবং প্রবেশদ্বারে দীর্ঘ লাইন এসবের ছবি তুলে ফেলতে হবে।
তবে বইমেলার ভিড়ের মধ্যে ক্যামেরা, ডিরেক্টর, নায়ক-নায়িকা এদের ঢোকানো বিপদ হতে পারে। তা ছাড়া পুলিশ কিংবা কর্তৃপক্ষ অনুমতিই হয়তো দেবে না।
কিন্তু এ সমস্যার চমৎকার সমাধান করে দিলেন খাঁড়াদা।
এই শীতের মরশুমে পাড়ায় পাড়ায় বইমেলা হচ্ছে। সবই একরকম, একইরকম সব বইয়ের দোকান, খাবারের দোকান। কলকাতা বইমেলার গেট দেখিয়ে এইরকম যে কোনও একটা হালকা বইমেলার মধ্যে ঢুকিয়ে শুটিং করলেই দর্শকেরা কিছু ধরতে পারবে না।
সবই ঠিকঠাক হয়েছে।
শুধু এক জায়গায় অবশেষে ঠেকে গেছে।
স্টুডিয়োয় শুটিংয়ের প্রয়োজনে একটা বইমেলা গেট বানানো হয়েছে। বানাতে বানাতে পটললালের মনে প্রশ্ন জেগেছে, কলকাতা বুক ফেয়ার, নাকি ক্যালকাটা বুক ফেয়ার? কোনটা ঠিক হবে?
পটলবাবু খাঁড়াদার কাছে গিয়েছিলেন। খাঁড়াদা বললেন, এই কঠিন প্রশ্নের জবাব আমি জানি না।
বরাহমিহিরের উপাখ্যান
০১.
বৃষ্টিটা থেমে গিয়েছিল। হঠাৎ আবার কেঁপে বৃষ্টি এল। যে দোকানের বারান্দা ছেড়ে ভরসা করে। বেরিয়েছিলাম, ছুটে সেখানেই ফিরতে হল। মধ্যে থেকে যথেষ্টই ভিজে গেলাম। হাঁটু মুড়ে উবু হয়ে বসলাম বারান্দায়, মাথাটা ভীষণ ভেজা, সর্দি হয়ে জ্বর আসতে পারে, কিন্তু আমার পকেটে রুমাল। পর্যন্ত নেই যে মুছে ফেলি।
মাথার সামনেই এক ভদ্রলোকের বাগানো কোঁচা কিছুটা শুকনো অন্তত সাতসেঁতে ভেজা নয় বলেই মনে হল।
আস্তে আস্তে মাথাটা তার কোঁচায় ঘষতে লাগলাম। ভদ্রলোক প্রথমে বিশেষ আপত্তি করলেন না, সাহস পেয়ে একটু জোরে ঘষতেই, তিনি সামান্য সরে গিয়ে পকেটে হাত দিয়ে একটা শুকনো রুমাল বার করে আমার মুখের দিকে একবারও না তাকিয়ে নির্বিকারভাবে বললেন, নিন মাথাটা মুছে ফেলুন। যা ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে, জল বসে নিউমোনিয়া হয়ে যেতে পারে।
