বইমেলায় সিনেমার শুটিং-এর বন্দোবস্ত করার পুরো ঝামেলা পড়ল পটলবাবুর ঘাড়ে। এদিকে আসল সমস্যা হল বইমেলা বিষয়ে পটলবাবুর কোনও পরিষ্কার ধারণা নেই।
প্রত্যেক বছর শীতকালে ট্রামবাসে যাতায়াতের পথে দেখেন বটে, চৌরঙ্গির একধারে ময়দানের মধ্যে বড় সার্কাসের মতো ঘেরা মাঠ, জমজমাট ব্যাপার। দেখেছেন রাস্তাঘাটে, হাটে বাজারে, এমনকী টালিগঞ্জের স্টুডিয়ো পাড়ায় অতি বড় গোমূর্খেরাও বইমেলা বইমেলা করে হন্যে হয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু পটলবাবুর কখনওই উৎসাহ হয়নি বইমেলায় যাওয়ার।
আসলে লেখাপড়া, বই-খাতার সঙ্গে তাঁর সম্বন্ধ চুকে গেছে তিরিশ বছর আগে। সেই নাইনটিন সেভেনটিতে, তখন তিনি পাইকপাড়া গদাধর মল্লিক হাইয়ার সেকেন্ডারি স্কুলে ক্লাস নাইনের ছাত্র। আঠারো বছরের টগবগে তরুণ। কয়েকজন নকশাল বন্ধুর সঙ্গে সরস্বতী পুজোর গভীর রাতে ইস্কুলের পুজোমণ্ডপে হানা দেন।
সেইদিন রাতে তিনি স্বহস্তে সরস্বতাঁকে ছিন্নমস্তা করেছিলেন। সরস্বতীর রাজহাঁসকে কোলে তুলে ইস্কুলের দোতলায় ছাদে উঠে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। দুঃখের বিষয় হাঁসটি না উড়ে নীচে গেটের কাছে দণ্ডায়মান ইস্কুলের দারোয়ান রাম তেওয়ারির মাথায় পড়ে। এবং তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান। পরদিন খবরের কাগজের প্রথম পৃষ্ঠায় বেরিয়েছিল :
সরস্বতী পূজায় নকশালি তাণ্ডব
সরস্বতী প্রতিমার ভাঙচুর
সরস্বতীর রাজহাঁস উধাও
এগুলো ছিল হেডলাইন, প্রথমটি বড় টাইপে, পরেরগুলি মাঝারি টাইপে, এর নীচে দীর্ঘ প্রতিবেদন, যার মধ্যে এক জায়গায় রয়েছে :
…বিদ্যালয়ের প্রবীণ ও বিশ্বস্ত দ্বাররক্ষক শ্রীযুক্ত রাম তেওয়ারি নকশালদের বাধা দিতে গিয়ে আক্রান্ত হন। তিনি অজ্ঞান অবস্থায় মেডিক্যাল কলেজে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন।
.
আসল কথাটা এই যে অজ্ঞান হওয়ার পরে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথেই তেওয়ারিজির জ্ঞান ফিরে আসে। হাসপাতালে চেক আপ করে পরদিন সকালেই বাড়ি ফিরে আসেন।
অন্যদিকে পটললালের আর বাড়ি ফেরা হয়নি। স্কুলের ছেলেরা যারা সেই রাতে পুজোর ভলান্টিয়ারি করছিল তারা সবাই পটললালকে চিনে ফেলেছিল। সেই সূত্র ধরে পুলিশ পটললালকে খোঁজা শুরু করে। ফলে পটললালকে বেশ কয়েকবছর গা-ঢাকা দিয়ে থাকতে হয়।
মা সরস্বতীর সঙ্গে পটললালের বিচ্ছেদ সেই থেকে শুরু।
লেখাপড়া, বই-খাতা এসবের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক তিনি সেই থেকে চুকিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু ভাগ্যদোষে এবার পুরো বইমেলাটা তাঁর ঘাড়ে পড়ে গেছে।
কী করবেন? কীভাবে কী করবেন?
বইমেলা নিয়ে ভাবতে ভাবতে পটলবাবুর খেয়াল হল খাঁড়াদা-র কথা।
খাঁড়াদা মানে গজপতি খাঁড়া। আজ থেকে পনেরো-বিশ বছর আগে টালিগঞ্জের স্টুডিও পাড়ায় গজপতিবাবুকে সবাই একবাক্যে খাঁড়াদা বলত।
পটলবাবু যখন টালিগঞ্জ পাড়ায় প্রথম আসেন খাঁড়াদা তাঁকে খুব সাহায্য করেছিলেন। খাঁড়াদা ছিলেন সিনেমা লাইনের সাহিত্যিক, সহকারী চিত্রনাট্যকার, কখনও-সখনও সহযোগী গীতিকার।
বেনামে খাঁড়াদা অনেক গান লিখতেন, সেই যে আশির দশকের বিখ্যাত গান
চুনচুন চুরচুর মুড়মুড়
চানাচুর-চানাচুর-চানাচুর
শাশুড়ি খাবেন খাবেন শ্বশুর
হুড়মুড় গুড়মুড় চুড়মুড়
কিংবা সেই অশ্রুসজল গীতি–
জীবনে মরণে হায় তোমার বিহনে
মাঠে ঘাটে গৃহকোণে
ফুল ঝরে শিশিরের সনে
পাখি ডাকে বনে বনে
আমি কাঁদি মনে মনে।
এরকম বিপরীতমুখী দুরকম চূড়ান্ত মেজাজের সব গান রচনার হাত ছিল খাঁড়াদা-র।
খাঁড়াদা নামটি প্রথম পটলবাবুকে আকৃষ্ট করে।
খাঁড়া হল রামদা। বড় দা খড়গ বা রামদাকে বলে খাঁড়া। ফলে খাঁড়াদা কথাটাই খুব বিশিষ্ট মনে হয়।
আসলে ঘটনা অন্যরকম।
ভদ্রলোকের উপাধি খাঁড়া। তাই খাঁড়াদা। যেমন বোসদা, চৌধুরিদা, রহমানদা।
এই খাঁড়াদা আসলে ছিলেন একজন কবি। অত্যন্ত গোলমেলে চরিত্র। বঙ্গীয় পানশালা খালাসিটোলার আতঙ্ক। একটা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বড় বড় কবিদের টয়লেট পেপার পাঠিয়ে বলতেন, আপনি যা কবিতা লেখেন সাধারণ কাগজে লিখবেন না। আপনার কবিতার উপযুক্ত কাগজ এই টয়লেট পেপার।
অবশেষে একটু বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে গিয়েছিল। রাত-বিরেতে মন্ত্রী, আমলা, পুলিশকর্তা এমনকী লাটসাহেবের বাড়িতে ফোন করে জিজ্ঞাসা করতেন, আজ কোনও কবিতা পড়েছেন কি না?
এই করতে করতে একদিন পুলিশ তাঁকে ধরে, লালবাজারে মুচলেকা লিখিয়ে নেয়, জীবনে গজপতি খাঁড়া আর কবিতা লিখবে না।
কিন্তু খাঁড়াদার বুদ্ধি পুলিশ বুঝবে কী করে?
তৎকালীন পুলিশ কমিশনার ছিলেন রঞ্জিত গুপ্ত। খাঁড়াদা রঞ্জিত গুপ্ত ছদ্মনামে কবিতা লিখতে লাগলেন।
.
বইমেলার দায়িত্ব কাঁধে পড়ায় এই খাঁড়াদার কাছেই যাওয়া মনস্থির করলেন পটলবাবু।
এক সকালে খাঁড়াদার সঙ্গে তার বেহালার বাড়িতে গিয়ে দেখা করলেন পটলবাবু।
পটলবাবুকে দেখে খাঁড়াদা খুব খুশি।
আরে পটল… এতদিন পরে?… এসো এসো। ঠিক সময়েই এসে গেছ। একটা ফাইভার হবে তোমার কাছে? এই বলে ডানহাতটা পটলবাবুর সামনে পাতলেন খাঁড়াদা।
ফাইভ থেকে ফাইভার।
যেমন টেন থেকে টেনর।
ফাইভার মানে আগে ছিল পাঁচ টাকা। এখন আর পাঁচ টাকা কে চায়? এখন ফাইভার মানে পাঁচশো টাকার একটা নোট।
না। পাঁচশো টাকার নোট কেন বিশেষ কিছু টাকা পটলবাবুর কাছে নেই। কখনও থাকে না।
