অবশ্য কখনও কখনও বেশ ঝামেলায় পড়তে হয়। একটা ছবিতে পাগলা গারদের একটা দৃশ্য ছিল। পরিচালক আদেশ দিলেন, পাগলা গারদের ভিতরটা একবার দেখে আসুন পটলবাবু, সেট সাজাবার সময় কাজে লাগবে।
একদিন ভোরে শহরতলির একটা পাগলা গারদের মধ্যে ঢুকে গোপনে পাগলদের থাকা-খাওয়া, ব্যাপার-স্যাপার সব দেখে যখন দেয়াল টপকে বেরিয়ে আসছিলেন, গারদের দারোয়ান তাঁকে আটকিয়ে দেয়।
সেখান থেকে ছাড়া পাওয়া সোজা কথা নাকি! পটলবাবু যত বলেন, আমি পাগল নই,দারোয়ান বিশ্বাস করে না। পাগলদের সম্পর্কে তার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, সব পাগলই বলে, মনে প্রাণে বিশ্বাস করে যে সে পাগল নয়।
আরও বিপদ হল অন্য কারণে। দেয়াল টপকানোর সময় দুজন ঘরবন্দি পাগল তাদের জানলা দিয়ে তাকে বাহবা দিচ্ছিল পালানোর জন্য, এবার তারাই চেঁচাতে লাগল, ছাড়বেন না দারোয়ানজি। এ ব্যাটা এক নম্বরের পাগল। ছাড়লে আপনার চাকরি যাবে।
এরপরে দারোয়ান আর ছাড়ে?
সেদিন সারাবেলা পটলবাবুকে অভুক্ত অবস্থায় বন্দি থাকতে হয়েছিল। সন্ধ্যাবেলায় গারদের ঘরে ঘরে তালা দেওয়ার আগে, পাগলদের মাথাগুনতি হয়, মাথাগুনতি করে প্রত্যেককে যে যার ঘরে ঢুকিয়ে তালা দিয়ে দেওয়া হয়। সেই সময় ধরা পড়ে যে একজন বেশি আছে। তখন পটলবাবু সব বলে হাতে-পায়ে ধরে সেই পাগলা গারদ থেকে বেরিয়ে আসেন।
সম্প্রতি পটলবাবু একটি ঘোরতর সমস্যায় পড়েছেন। বি সি এল নামে খ্যাত, প্রযোজক বিমলচন্দ্র লাহিড়ির আগামী আকর্ষণ বরের ঘরের মাসি, কনের ঘরের পিসি ছবির ক্লাইম্যাক্সে বইমেলার সিন রাখা হয়েছে।
পরিচালক গোবিন্দ দাশগুপ্ত ঝানু লোক, তিনি খেয়াল করেছেন আজকাল ইংরেজি বছরের গোড়ার দিকে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে বইমেলা কলকাতায় একটা ক্রেজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু কলকাতায় কেন, আশপাশে বিরাটি থেকে সোনারপুর, গ্রামে-গঞ্জে, মফস্সলে, জেলায়-মহকুমায়, আঁদাড়ে-বাঁদাড়ে, যেকোনও খালিমাঠে বইমেলা আর বইমেলা।
এই রকম জনপ্রিয় বইমেলাকে লাহিড়ি এবং দাশগুপ্ত তাঁদের সিনেমায় ব্যবহার করবেন। একটি বিচ্ছেদ কাহিনি। কাহিনির মধ্যে বইমেলার নানা অনুষ্ঠান, মণ্ডপ, ছবি-গান-কবিতা, মাছ-ভাজা, দই সবই অল্প অল্প করে থাকবে। নায়ক-নায়িকা হাত ধরাধরি করে দিনের পর দিন ভিড়ের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। শেষ দৃশ্যে তাদের বিদায়ের পালা। দেখা যাবে দুদিকের দু গেট দিয়ে নায়ক-নায়িকা আলাদা আলাদা বেরিয়ে যাচ্ছে। নায়কের হাতে বুদ্ধদেব গুহর বিরহের উপন্যাস আর নায়িকার হাতে জয় গোস্বামীর কবিতার বই।
অবশ্য এর কয়েকদিন আগে কমিক রিলিফ হিসেবে প্রেমিক-প্রেমিকা দুজনাকে আনন্দ পাবলিশার্সের স্টলে দেখা যাবে তারাপদ রায়ের কাণ্ডজ্ঞান বইয়ের পাতা ওলটাতে ওলটাতে হাসাহাসি করছে।
তা পটলবাবুর উপরে গুরুদায়িত্ব পড়েছে বরের ঘরের মাসি, কনের ঘরের পিসি সিনেমায় বইমেলার দৃশ্যগুলির চলচ্চিত্র গ্রহণের বন্দোবস্ত করা।
এর মধ্যে অবশ্য উটকো ঝামেলা দেখা দিয়েছিল। বইয়ের প্রযোজক লাহিড়িবাবুর ধারণা বইয়ের নাম, বরের ঘরের মাসি, কনের ঘরের পিসি। ওদিকে পরিচালক দাশগুপ্ত সাহেবের ধারণা কথাগুলো হবে বরের ঘরের পিসি, কনের ঘরের মাসি।
মহরত অনুষ্ঠানের সংবাদ যেসব পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল তার কোনওটায় বরের ঘরের পিসি… কোনওটায় বরের ঘরের মাসি…।
ব্যাপারটা দাশগুপ্ত সাহেবের চোখে পড়ে এবং চিন্তার কারণ হয়। লাহিড়িবাবু প্রযোজক, তিনি যদি জানতে পারেন, তাঁর দেওয়া নাম বদল করা হয়েছে, টাকাপয়সার পথ বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
পটলবাবুকে পাঠানো হল বাংলা আকাঁদেমির সচিব শ্রীযুক্ত সনৎ চট্টোপাধ্যায়ের কাছে। সনৎবাবু অভিজ্ঞ ব্যক্তি। বরের ঘরের পিসি, কনের ঘরের মাসি নাকি বরের ঘরের মাসি, কনের ঘরের পিসি সমস্যাটির জটিলতা অনুমান করে তিনি পটলবাবুকে অধ্যাপক পবিত্র সরকারের কাছে পাঠালেন।
বাংলা ভাষার ব্যাপারে অধ্যাপক সরকার এক নম্বর লোক। কিন্তু তাঁর খুব ঠাণ্ডা মাথা, পিসি-মাসি মনের মধ্যে দু-চারবার ঘুরপাক খাইয়ে বললেন, ব্যাপারটা গোলমেলে। দুটোই তো ভুল মনে হচ্ছে। তারপর একটু থেমে বললেন, আপনি বরং একবার জ্যোতিবাবুর কাছে যান।
জ্যোতিবাবু? প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এ ব্যপারে কী বলবেন, পটলবাবু ঠাহর করে উঠতে পারেন না। পবিত্রবাবুই তাঁর ভুল ভাঙালেন। জ্যোতিবাবু মানে জ্যোতিভূষণ চাকী। পণ্ডিত মানুষ। বালিগঞ্জ কাঁকুলিয়ায় থাকেন।
তবে কাঁকুলিয়া পর্যন্ত যেতে হয়নি। তার আগেই লাহিড়িবাবু নিজেই একটা সমাধান করেছেন, দাশগুপ্ত সাহেব সেটা মেনে নিয়েছেন।
সমাধানটি আর কিছু নয়, দুটোই থাকবে। ওপরে থাকবে বরের ঘরের মাসি, কনের ঘরের পিসি নীচে বরের ঘরের পিসি, কনের ঘরের মাসি। ব্যাপারটা এই রকম।
বরের ঘরের মাসি কনের ঘরের পিসি নাকি
বরের ঘরের পিসি কনের ঘরের মাসি।
লাহিড়িবাবুর মতে আর কিছু না হোক বিশ্বের দীর্ঘতম নামের সিনেমা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। চাই কী এজন্য টিমবাকটু কিংবা দামাস্কাস ফিলম ফেস্টিভ্যাল থেকে প্রাইজ আনতে পারে।
এইভাবে নামকরণের ঝামেলাটা পটলবাবুর ঘাড় থেকে নামল। কিন্তু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলার জো নেই।
