অবশ্য দু-একবার যে তাঁর লেখা চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেনি তা নয়। বিভিন্ন বিষয়ে বই লিখতে লিখতে অবশেষে উনিশশো সাতষট্টি সাল নাগাদ তিনি একটি গ্রন্থ রচনা করেন, তার নাম দিয়েছিলেন বাঙালিরা পারে, সাহেবরা পারে না।
প্রায় দশ বারোটি বই পাণ্ডুলিপি অবস্থায় অমুদ্রিত থাকার পরে নরোত্তম দত্তগুপ্তের এই বইটি প্রকাশিত হয়েছিল। বিলাতফেরত এক দেশপ্রেমিক চিকিৎসক যিনি আবার নরোত্তমবাবুর একটু দূর সম্পর্কের ভাগিনেয়ি জামাতা তিনি বইটির নাম শুনেই মুগ্ধ হয়ে যান। আসলে প্রবাসে দীর্ঘদিন থেকে তার মনে প্রচণ্ড গ্লানি জন্মেছে, সাহেব মেমদের ব্যবহারে তাঁর বিতৃষ্ণা এসে গেছে, তিনি নরোত্তমবাবুকে বলেন, মামা, আমি আপনাকে একশো পাউন্ড দিচ্ছি, আপনি বইটি বার করুন।
একশো পাউন্ড কম টাকা নয়, তখন প্রায় দুহাজার টাকা। নরোত্তম দত্তগুপ্ত অসাধু লোক নন।
তিনি ভাগিনেয়ি জামাতার কাছে ঋণ রাখতে চাননি সাহায্যও নিতে পারেননি। ওই টাকা দিয়ে যুগ্মভাবে একটি প্রকাশক প্রতিষ্ঠান শুরু করেন। প্রকাশক প্রতিষ্ঠানটির নাম দেওয়া হয় দত্তগুপ্ত অ্যান্ড নেফিউ ইন ল পাবলিশিং কোম্পানি।
বাঙালিরা পারে, সাহেবরা পারে না সত্যিই কিছুটা চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিল। নরোত্তমবাবু দেখিয়েছিলেন শতকরা নব্বই জন বাঙালি সাঁতার জানে, অথচ সাহেবদের মধ্যে মাত্র শতকরা পনেরো জন। কতকগুলো জিনিস বাঙালিদের সহজাত যেমন একহাতে ছাতা ধরে অন্যহাতে সাইকেল চালানো কিংবা এক রিকশায় একসঙ্গে তিনজন চারজন বসে যাওয়া। নরোত্তমবাবু দেখালেন এসব ব্যাপারে সাহেবরা বাঙালিদের ধারে কাছে ঘেঁষার যোগ্যতা রাখে না।
বই পড়ে কিছু কিছু লোক বাহবা দিয়েছিল, দু-একটা ছোটবড় কাগজে অল্পবিস্তর প্রশংসাও বেরিয়েছিল কিন্তু বিক্রি বিশেষ কিছু হয়নি। ফলে বাঙালিরা পারে, সাহেবরা পারে না বইটি দত্তগুপ্ত অ্যান্ড নেটিভ ইন ল পাবলিশিং কোম্পানির প্রথম ও একমাত্র বই হয়ে রইল।
কিন্তু নরোত্তম দত্তগুপ্ত অদমিত। কোনও ঠান্ডা অভ্যর্থনা বা অনুদার সমালোচনা তাকে আটকিয়ে বা থামিয়ে রাখতে সমর্থ হয়নি।
সেই অদমিত প্রয়াসের শেষ ফসল তার নবতম গ্রন্থ নিজের চুল নিজে কাটুন। বইটি প্রকাশ করা সম্ভব হবে কি না তা এখনও জানা যায়নি। কিন্তু সম্প্রতি নরোত্তমবাবুর মাথায় একটা নতুন আইডিয়া বা পরিকল্পনা এসেছে। ময়দান এবং এদিক ওদিকে কয়েকটা বুক ফেয়ার বা বইমেলায় ঘুরে ঘুরে তাঁর মাথায় এক অভিনব বুদ্ধি এসেছে।
বহু লেখকের বহু প্রকাশকের অনেক রকম বই দিয়ে যদি বইমেলা হতে পারে তবে একজন লেখকের নিজস্ব বইমেলাই বা হতে পারবে না কেন?
নরোত্তম দত্তগুপ্ত মনস্থির করে ফেলেছেন। ওই সব প্যান্ডেল, গেট, স্টল এসবের ঝামেলার মধ্যে তিনি যাবেন না। তার সর্বসমেত তিনটি মুদ্রিত গ্রন্থ এবং ছাব্বিশটি পাণ্ডুলিপি নিয়ে তিনি একক ভ্রাম্যমাণ বইমেলা করবেন।
খবর পাওয়া গেছে এরই মধ্যে কোথাও নরোত্তমবাবু ময়দানের আশেপাশে কোনও গাছের ছায়ায় কিংবা গাড়িবারান্দার নীচে মুদ্রিত গ্রন্থত্রয় এবং অমুদ্রিত পাণ্ডুলিপিগুলি নিয়ে একক বইমেলা শুরু করে দিয়েছেন। সেখানে সকলেরই নিমন্ত্রণ, তবে নরোত্তমবাবুর টাকাপয়সা নেই। বিজ্ঞাপন করতে পারেননি, মেলাটা কোথায় সেটা একটু কষ্ট করে খুঁজে বার করতে হবে।
বইমেলায় পটলবাবু
পাঠক-পাঠিকাদের মধ্যে এমন কেউ কি এখনও আছেন, যাঁর কাছে পটললালের পরিচয় দেওয়ার প্রয়োজন?
পটললাল অবশ্যই কোনও বিখ্যাত লোক নন। তবে অসংখ্য লোকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় আছে। তাঁরা তাকে নানা কারণে চেনেন। তারাপদ রায়ের মতো ঘরকুনো, অলস লেখক পর্যন্ত তাঁকে নিয়ে নয় নয় করে অন্তত আট-নয়টি গল্প লিখে ফেলেছেন।
পটললাল।
শ্ৰীযুক্ত পটললাল পাল।
অনেকেই তাঁকে পটলবাবু কিংবা পটলদা বলেন। তেমন কেউ কেউ অবশ্য তাঁকে মি. পাল নামেও ডাকেন। আবার যেমন হয়, যাঁরা তাঁকে বহুকাল ধরে চেনেন, তাঁরা তাঁকে নিতান্তই পটল বলে ডাকেন।
এই গল্পে আমরা অবশ্য তাঁকে পটলবাবুই বলব।
পটলবাবু সিনেমা লাইনের লোক। তিনি কিন্তু নায়ক বা অভিনেতা নন। প্রযোজক বা পরিচালক কিছুই নন। কখনও কখনও বাংলা সিনেমায় টাইটেলের মধ্যে পটলবাবুর নাম দেখা গেছে সহকারি পরিচালক হিসেবে কিংবা ব্যবস্থাপনার সহায়ক রূপে কিন্তু আসলে তিনি ইন্ডাস্ট্রির মানে সিনেমা শিল্পের সর্বঘটে কাঁঠালি কলা।
মেট্রোরেলের কামরায় নায়কের সঙ্গে নায়িকার প্রথম দেখা। ডিরেক্টর বললেন, পটলবাবু, ব্যাপারটা অ্যারেঞ্জ করুন।
সোজা কাজ নয়, নায়ক-নায়িকা, ডিরেক্টর এবং অন্যরা না হয় টিকিট কেটে ঢুকে যাবে, কিন্তু ক্যামেরা যাবে না, তা ছাড়া ছবি তোলার অনুমতি ইত্যাদি জোগাড় করতে হবে।
প্রগতিশীল এক প্রযোজক সরকারের টাকা নিয়ে বই করছেন। তাঁর বইয়ের নায়ক ছেষট্টির খাদ্য আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছিলেন। বইয়ে পুলিশের গুলি চালনার ছবি থাকবে, তখনকার পুলিশের পোশাক, রাইফেল বা বন্দুকের চেহারা এগুলো পটলবাবুকে সংগ্রহ করতে হল।
অবশ্য খুব বেশি পরিশ্রম করতে হয়নি। খাদ্য-আন্দোলন নিয়ে একটা তথ্যচিত্র হয়েছিল অনেকদিন আগে, পুরনো রিল সরকারি গুদামে পড়েছিল। দারোয়ানকে পঞ্চাশ টাকা ঘুষ দিয়ে ছবির রিলটা সংগ্রহ করে এনেছিলেন। তাতেই কাজ চলে যায়।
