ধীরে ধীরে জ্যোতিষ সমস্ত টের পায়। শ্রীলতার মধ্যাহ্নকালীন নিঃসঙ্গতার সমস্যা সে হৃদয়ঙ্গম করতে পারে এবং অল্প অল্প ব্যবস্থা নিতে থাকে।
জ্যোতিষ মাঝে মধ্যে অফিস কামাই করতে লাগল স্ত্রীকে সঙ্গ দেওয়ার জন্যে। কিন্তু খুব বেশি অফিস কামাই করা যায় না, তাহলে চাকরি রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। তা ছাড়া অফিসে সহকর্মীদের মধ্যে এসব ক্ষেত্রে যথেষ্ট হাসাহাসি ও ঠাট্টা হয়।
শ্ৰীলতার একঘেয়েমি দূর করার জন্য অতঃপর জ্যোতিষ ইংরেজি খবরের কাগজ ছেড়ে দিয়ে বাংলা খবরের কাগজ রাখতে লাগল। ইংরেজি কাগজ ঘুম থেকে উঠে চা খেতে খেতে পড়া জ্যোতিষের বহুদিনের অভ্যেস, সে অভ্যেস ছেড়ে তার খুব কষ্ট হল কিন্তু শ্ৰীলতার জন্যে এইরকম কষ্ট করতে তার ভালই লাগল।
এতেও কিন্তু পোষাল না। তখন জ্যোতিষ অফিস থেকে গল্পের বই, ম্যাগাজিন স্টল থেকে সিনেমার অথবা মেয়েদের রঙিন কাগজ এইসব নিয়ে আসতে লাগল।
কিন্তু এতে আর কতটুকু সময় কাটে। দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ দীর্ঘ দ্বিপ্রহর শুধু ম্যাগাজিন বা গল্পের বই পড়ে কাটানো যায় না। শ্ৰীলতার হঠাৎ যে ছেলেপিলে হবে তারও আপাতত কোনও সম্ভাবনা নেই।
অবশেষে অনেক রকম চিন্তা করে, অনেক কথা বিবেচনা করে এক রবিবার সকালে জ্যোতিষ শ্ৰীলতাকে নিয়ে হাতিবাগান বাজারের ওখানে গেল। সেখানে নানারকম পশুপাখির মেলা। কুকুর, খরগোশ, টিয়া, চন্দনা, ময়না মানুষ পুষবার জন্যে কিনে আনে ওখান থেকে।
শ্ৰীলতার কুকুর পছন্দের নয়। বাড়িতে উঠোন না থাকলে কুকুর পোষা খুব হাঙ্গামা। খরগোশও ঘরদোর নোংরা করে, বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। অনেক দেখেশুনে একটা পাখি কেনাই ঠিক হল, একটা টিয়া পাখি। উজ্জ্বল সবুজ রং, লাল ঠোঁট, ঝলমলে চোখ একটা টিয়া খাঁচাসুদ্ধ কেনা হল।
দুদিনের মধ্যে টিয়াপাখিটির সঙ্গে শ্ৰীলতার খুবই ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠল। পাখির খাবার দেয়, স্নান করায়, খাঁচা পরিষ্কার করে–পাখিকে ঘিরে ভালই সময় কাটতে লাগল শ্রীলতার। সে ভালবেসে পাখিটির নাম দিল ফুলকুমারী।
এই নামকরণে জ্যোতিষের সামান্য আপত্তি ছিল। এই টিয়াটি কুমারী কিনা, এমনকী মেয়েপাখি কিনা সে বিষয়ে জ্যোতিষ নিঃসন্দেহনয়। সে চেনাশোনা দু-একজনকে জিজ্ঞাসা করে খোঁজখবর করল কী করে ছেলেপাখি মেয়েপাখির পার্থক্য ধরা যায়। বিজ্ঞজনেরা বললেন, দুটোর মধ্যে যেটা বড়সড় আর সুন্দর দেখতে সেটাই ছেলেপাখি। মেয়েপাখিগুলো একটু নিরেস দেখতে হয়, যেমন মুরগি আর মোরগ, ময়ূরী আর ময়ূর।
জ্যোতিষ এসব শুনে যখন বলল, আমার তো দুটো পাখি নয় একটা পাখি, আমি কী করে বুঝব এটা নিরেস না সরেস, ছেলে না মেয়ে, মেলাব কী করে?
সবাই ঘাড় নেড়ে বলল, তাহলে অসম্ভব। তবে অপেক্ষা করে দ্যাখ ডিম পাড়ে কিনা। যদি ডিম পাড়ে তা হলে মেয়েপাখিই হবে।
জ্যোতিষ এ কথার কোনও জবাব দিল না, সে ভাল করেই জানে মেয়েই হোক আর ছেলেই তোক খাঁচায় আটকানো নিঃসঙ্গ পাখির ডিম পাড়ার সম্ভাবনা শূন্য। আর তা ছাড়া গাছের ডালে যদি একজোড়া পাখি বাসা বাঁধে তবে তার মধ্যে কোন পাখিটা ডিম পেড়েছে সেটা বলাও খুবই কঠিন। সুতরাং জ্যোতিষ বিশেষ আপত্তি বা প্রতিবাদ করতে পারল না। শ্ৰীলতার টিয়াপাখির ফুলকুমারী নামই বহাল রইল। দিনে দিনে শ্রীলতার আদরযত্নে, সোহাগে ফুলকুমারীর ঔজ্জ্বল্য বাড়তে লাগল। ফুলকুমারীর জন্যে জ্যোতিষকে বাজার থেকে সাদা কাবুলি ছোলা কিনে আনতে হয়। লাল রঙের পাকা কাঁচালঙ্কা ফুলকুমারীর খুবই পছন্দ, বাজার থেকে খুঁজে পেতে, বাছাই করে শ্রীলতার আদেশে সেইরকম লঙ্কা জ্যোতিষ নিয়ে আসে।
ফুলকুমারীর সঙ্গে সারাদিন কতরকম গল্প করে শ্রীলতা। ফু, ফুলু, ফুলকুমারী…কত রকম ভাবে আদর করে ডাকে পাখিকে।
একেক সময় জ্যোতিষের রাগ হয়, খুব হিংসেও হয়, কিন্তু পাখির সঙ্গে তো আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা চলে না, সে চুপ করে থাকে।
কিছুটা স্বামীর সঙ্গে, অনেকটা পাখির সঙ্গে শ্রীলতার দিনরাত এখন ভালই কাটছে। স্বামীর প্রতি তার কর্তব্য সে নিশ্চয়ই করছে কিন্তু জ্যোতিষের একেক সময় সন্দেহ হয় সে নিতান্তই দায়সারা।
কথাটা হয়তো কিছুটা সত্যিও, ক্রমশ ক্রমশ ফুলকুমারী অন্ত প্রাণ হয়ে উঠল শ্রীলতা। শীলতার ধ্যান, জ্ঞান, সারাক্ষণ ফুলকুমারী। খাঁচার ভেতর থেকে ঠোঁট বাড়িয়ে যাতায়াতের পথে শ্ৰীলতার আঁচল ধরে টানে ফুলকুমারী। তার খাঁচা টাঙানো হয়েছে শোয়ার ঘর থেকে রান্নাঘরের মধ্যে ছোট চিলতে খাওয়ার জায়গায়। শ্রীলতাকে দেখতে না পেয়ে খাঁচায় বসেই চেঁচায়। ফুলকুমারীর কিন্তু খুব রাগ জ্যোতিষের ওপরে। সে প্রায়ই চেষ্টা করে কোনও অসতর্ক মুহূর্তে জ্যোতিষ খাঁচার কাছে চলে এলে তাকে ঠুকরিয়ে দিতে। একদিন ঘাড়ের ওপরে ধারালো ঠোঁটে ঠুকরিয়ে সে রক্ত বার করে দিয়েছিল। কিন্তু প্রেয়সীর পাখিকে কিছু বলেনি জ্যোতিষ।
এর মধ্যে শীত শেষ হয়ে এল। প্রতি বছর ফাল্গুনের গোড়ায় শ্রীলতাদের গ্রামে কানা ভৈরবীর মেলা বসে। খুব বড়, অনেক পুরনো মেলা। সারা গ্রামে উৎসব লেগে যায়।
শ্ৰীলতার বাবা আগেই চিঠি লিখেছিলেন। মেলার আগে শ্রীলতাকে নিয়ে যেতে শ্রীলতার এক জ্ঞাতি কাকা এল। স্ত্রীর বাপের বাড়ি যাওয়া নিয়ে আপত্তি করার মতো ছোটলোক নয় জ্যোতিষ। কিন্তু আপত্তি দেখা দিল শ্রীলতার দিক থেকেই। সে ফুলকুমারীকে ছেড়ে কী করে যাবে?
