বিয়ের বছরেই বাপের বাড়ি যেতে চায় না এমন মেয়ে দুর্লভ। স্তম্ভিত খুল্লতাত এবং হতচকিত স্বামী অনেক বোঝানোর পরে শ্রীলতা তিনদিনের জন্যে পিত্রালয়ে যেতে রাজি হল শুধু এক শর্তে ফুলকুমারীর দেখাশোনা, স্নান করানো, খাওয়ানো সব কিছু জ্যোতিষকে ঠিকমতো করতে হবে।
জ্যোতিষ অবশ্যই রাজি হল এবং মাত্র তিনদিনের মধ্যে শ্রীলতা বাপের বাড়ি থেকে ফিরবে শুনে খুশি হল, তার তো আর ফুলকুমারীকে নিয়ে সময় কাটবে না। শ্রীলতা যত তাড়াতাড়ি ফেরে ততই মঙ্গল।
এক শুক্রবার শ্রীলতা বাপের বাড়ি গেল, পরের মঙ্গলবার ফিরবে। বন্দোবস্তটা ভালই, শনি-রবিবার জ্যোতিষের ছুটি, সোমবারও ছুটি নেবে, ফলে ফুলকুমারীকে কোনওদিনই অরক্ষিত থাকতে হবে না।
ফুলকুমারীকে কীভাবে স্নান করাতে হয়, কীভাবে খাওয়াতে হয়, কীভাবে ফুলকুমারীর খাঁচা পরিষ্কার করতে হয় সমস্তই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জ্যোতিষকে বুঝিয়ে দিয়ে গেল শ্রীলতা।
অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গেই ফুলকুমারীর দেখাশোনার ভার গ্রহণ করল জ্যোতিষ। কিন্তু সে এ কাজের মোটেই যোগ্য নয়। শনিবার সকালেই এক ভয়াবহ অঘটন ঘটল। সে অঘটনের কথা এখানে। নয়, যথাস্থানে বলা যাবে, না হলে গল্পটা মারা পড়বে।
যথা নির্দিষ্ট মঙ্গলবার দিন শীলতা ফিরল যথেষ্ট উৎকণ্ঠা নিয়ে কিন্তু তার উৎকণ্ঠার কোনও কারণ ছিল না। সে ভেবেছিল তার অদর্শনে ফুলকুমারীর মন খারাপ, শরীর খারাপ হবে।
কিন্তু শ্রীলতা এসে দেখল ফুলকুমারী আরও টগবগে, আরও উজ্জ্বল। ফলে জ্যোতিষকে এ জন্যে। যথাসাধ্য কৃতজ্ঞতা নিবেদন করতে সে ভুলল না।
আবার দিন কাটতে লাগল। শ্রীলতা, জ্যোতিষ আর ফুলকুমারীর সময় চমৎকার কাটতে লাগল। বাজার থেকে প্রচুর সাদা ছোলা আর রাঙামরিচ কিনে আনতে লাগল জ্যোতিষ ব্যাগ ভর্তি করে। ভালই চলছিল সবকিছু কিন্তু হঠাৎ একদিন, মাসখানেক পরে শ্রীলতা লক্ষ করল ফুলকুমারীর চাঞ্চল্য আর উজ্জ্বলতা কেমন কমে এসেছে। সে কেমন নেতিয়ে পড়েছে। সাদা ছোলায়, রাঙামরিচে তার আর রুচি নেই। খাঁচার মধ্যে নীল-লাল প্লাস্টিকের বাটিতে সেসব পড়ে থাকে। স্নান করাতে গেলে ফুলকুমারী আর আগের মতো উল্লসিত হয় না।
অফিস থেকে জ্যোতিষ শুনে এল টিয়াপাখির এরকম অসুখ হয়, এরকম নেতিয়ে পড়ে, খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দেয়, গরম পড়লে টিয়াপাখির মাথায় একরকম গ্যাঁজ বেরোয়। কতকগুলো সামলে ওঠে, কতকগুলো মারা পড়ে।
এসব কথা শ্ৰীলতাকে কিছু বলল না জ্যোতিষ কিন্তু পরদিন ভোরবেলা বারান্দায় শ্রীলতার আর্ত চিৎকারে আচমকা ঘুম ভেঙে গেল জ্যোতিষের। সে দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দেখে খাঁচার মধ্যে কাত হয়ে পড়ে রয়েছে পাখিটা আর শ্রীলতা ডুকরে ডুকরে কঁদছে, ইনিয়ে বিনিয়ে বলছে, আমার ফুলকুমারী আমাকে ছেড়ে চলে গেল।.
অনেকক্ষণ কাদাকাটি শোনার পর জ্যোতিষ শ্ৰীলতার মাথায় হাত রেখে বলল, তুমি এত কাদাকাটি কোরো না। আমি তোমাকে সামনের রবিবার সকালেই হাতিবাগান বাজার থেকে আরেকটা ভাল টিয়াপাখি এনে দেব।
এই কথা শুনে শ্রীলতা কপাল চাপড়িয়ে, চিৎকার করে কেঁদে উঠল, বলতে লাগল, আমি ভাল টিয়াপাখি দিয়ে কী করব? ফুলকুমারীকে ছাড়া আমি বাঁচব না। অন্য পাখি আর ফুলকুমারী কি এক হল? দুরন্ত কান্নার সঙ্গে রাগারাগি করতে লাগল শ্রীলতা।
এই সময় জ্যোতিষ বলল, কিন্তু এই পাখিটা তো তোমার ফুলকুমারী নয়। এ কথা শুনে হতভম্ব হয়ে গেল শ্রীলতা, শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছে বলল, এ আমার ফুলকুমারী নয়তো কার ফুলকুমারী?
তখন জ্যোতিষ বলল, তুমি সেই যে বাপের বাড়ি গেলে, বাপের বাড়ি যাওয়ার পরদিন সকালে খাঁচা পরিষ্কার করে স্নান করাতে গিয়ে হঠাৎ তোমার ফুলকুমারী তো উড়ে পালিয়ে গেল। আমি আর কী করব পরের দিন রবিবার ছিল, হাতিবাগান গিয়ে ওইরকম আরেকটা পাখি কিনে আনলাম। এটাই সেই পাখিটা। না হয় আরেকটা এরকম পাখি নিয়ে আসব। সেটাকেও ফুলকুমারী নাম দিও।
জ্যোতিষের কথা শুনে শ্রীলতা স্তম্ভিত হয়ে গেল। এত বড় প্রবঞ্চনা তার সঙ্গে জীবনে কেউ করেনি। সে আরও অঝোরে কাঁদতে লাগল। শোয়ার ঘরে ছুটে গিয়ে বিছানায় উপুড় হয়ে বালিশে মুখ। গুঁজে ফোঁপাতে লাগল।
শ্ৰীলতার শোক আর অভিমান কীভাবে দূর করতে পেরেছিল জ্যোতিষ সে কাহিনি এখানে অবান্তর। তবে শ্রীলতা আর পাখি পোষেনি। জ্যোতিষ শেয়ালদার মোড় থেকে কয়েকটা বেলফুল গাছ নিয়ে এসেছে। সেগুলো সামনের ছোট বারান্দায় টবে সুন্দর লেগেছে। দুবেলা সে গাছগুলোয় জল দেয় শ্রীলতা।
ভরা গ্রীষ্মে গাছগুলোয় দুয়েকটা করে সুগন্ধময় ছোট ফুল ফোঁটা শুরু হয়েছে। সেগুলো তুলে নিয়ে শ্ৰীলতা সন্ধ্যাবেলা খোঁপায় গোঁজে।
আজকাল জ্যোতিষ শ্রীলতাকে প্রায়ই ফুলকুমারী বলে ডাকে।
বইমেলা
নরোত্তমবাবু সমস্ত জীবন ধরে বই লিখেছেন, শুধু বই আর বই।
তবে বই লেখার জন্য নরোত্তম দত্তগুপ্ত যে রকম পরিশ্রম করেছেন সেই পরিমাণ খ্যাতি অর্জন করতে পারেননি। তার একটা কারণ অবশ্য যে নরোত্তমবাবুর অধিকাংশ বইই পাণ্ডুলিপির পর্যায়ে আছে, মুদ্রিত বা প্রকাশিত হয়নি।
নরোত্তম দত্তগুপ্ত রচিত বইগুলির প্রকাশকের বড়ই অভাব। নরোত্তমবাবু যে ধরনের বিষয়ে লেখেন সেই সব বিষয়ে, এদেশে এমনকী বিদেশেও খুব বেশি লোক লেখেননি। কিন্তু প্রকাশকেরা ভরসা পান না এই রকম বই ছাপতে। তারা বলেন, যত ইচ্ছে নভেল দিন, বাচ্চাদের বই দিন– ছাপব। কিন্তু ছেলে বউ নিয়ে সংসার চালাই, ব্যবসায়ে লস দিতে পারব না।
