০৪. মিলন মেমোরিয়াল ক্লাব
কলিম দারোগার অনুরোধ রক্ষা করে আমরা ক্লাবের নাম রেখেছিলাম। দাদা একটা সাইনবোর্ড তৈরি করে এনে কাছারিঘরের পাশে টাঙিয়ে দিয়েছিল।
মিলন মেমোরিয়াল ক্লাব।
এরকম ক্লাব তো আনাচেকানাচে, পাড়ায় পাড়ায় থাকে, কেউ বেশি কৌতূহল প্রকাশ করেনি।
অনেক পরে জেনেছিলাম দারোগা সাহেব আগে অন্য এক থানায় মিলন নামে এক দাগি আসামিকে পিটিয়ে মেরে ফেলেছিলেন। তারপর থেকে মানসিক দুঃখে এবং অনুতাপে দগ্ধ হয়ে যেখানেই গিয়েছেন সেখানেই একটি করে মিলন মেমোরিয়াল ক্লাব স্থাপন করেছিলেন।
মানুষ থাকে না, কিন্তু প্রতিষ্ঠান থেকে যায়।
কিছুদিন আগেও দেশের বাড়িতে গিয়ে দেখেছি, মিলন মেমোরিয়াল রয়ে গেছে। নতুন যুগের বালকেরা আমাদের মতোই দাপিয়ে পাঁচনম্বর ফুটবল নিয়ে খেলছে।
কবেকার দাগি চোর মিলন, কবেকার কলিম দারোগা, কেউ তাদের মনে রাখেনি। কিন্তু মিলন মেমোরিয়াল এখনও, পুলিশ ব্যারাকের মাঠে খেলে যাচ্ছে।
ফুলকুমারী
বিয়ের পরে শ্বশুরবাড়িতে এসে শ্রীলতার দিন আর কাটতে চায় না।
শ্বশুরবাড়ি কথাটা অবশ্য ঠিক হল না, বলা উচিত বরের বাড়ি, কলকাতার শহরতলিতে দুঘরের সরকারি কোয়ার্টার্স শ্ৰীলতার বরের। শ্বশুরবাড়ি কাটোয়ায়, সেখানে শ্বশুর-শাশুড়ি, দেওর ননদ, ঝি-চাকর, আত্মীয়-স্বজন নিয়ে বাড়ি ভর্তি লোক। উকিলের বাড়ি, সারাদিন কাকডাকা ভোর থেকে। প্রায় মাঝরাত পর্যন্ত মক্কেল-মুহুরিতে বাড়ি সরগরম। ছুটির দিনে আত্মীয় কুটুমে হইচই আরও বেশি।
বিয়ের পর দু-তিন মাস শ্ৰীলতা কাটোয়ার সেই বাড়িতে ছিল। সে পাড়াগাঁর ইস্কুলের হেডমাস্টারের মেয়ে। শ্বশুরবাড়ির হই হট্টগোলে প্রথম প্রথম তার হাঁফ ধরে গিয়েছিল। তা ছাড়া বিয়ের পনেরো দিনের মধ্যেই অষ্টমঙ্গলার পরে পরেই শ্রীলতার স্বামী জ্যোতিষ কলকাতায় সরকারি চাকরিতে ফিরে আসে। হাফ লাগার সেটাও একটা কারণ।
শ্ৰীলতার বিয়ে হয়েছিল শ্রাবণের শেষে। এর মধ্যে অষ্টমঙ্গলা, পূজো এই সব ধরে কয়েক সপ্তাহ বাপের বাড়িতে কাটিয়ে কার্তিক বাদ দিয়ে, অঘ্রানের প্রথম সপ্তাহে শ্ৰীলতা কলকাতায় স্বামীর ঘরে এসে পৌঁছল।
ঘরে মানে দশ ফুট বাই আট ফুট দুটো কামরা, সাবানের বাক্সের মতো খাওয়ার জায়গা, রান্নাঘর, এক চিলতে বারান্দা। তবু এই দুর্দিনের বাজারে শ্রীলতার স্বামী জ্যোতিষ কী করে এই ফ্ল্যাট পেল তা জানতে গেলে আরেকটা ঠক্কর কমিশন বসাতে হয়।
সে যা হোক স্বামীর ঘর করতে এসে শ্রীলতা প্রায় গৃহবন্দিনী হয়ে পড়েছে। স্বামী সাড়ে নয়টার মধ্যে অফিস পেরিয়ে যায়, তারপর থেকে সারাদিন সেই সন্ধ্যা ঘোর হওয়া পর্যন্ত সে একা, বাড়িতে আর কোনও লোক নেই।
একটা ঠিকে ঝি আছে, সেও শ্রীলতার স্বামী অফিস চলে যাওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঘর মোছা, বাসন মাজা শেষ করে চলে যায়। নতুন সরকারি ফ্ল্যাট বাড়ি, পাশের ফ্ল্যাটে এখনও লোক আসেনি। এ বাড়িটা হাউসিং এস্টেটের একেবারে শেষ প্রান্তে, এখান থেকে কোনও রাস্তা চোখে পড়ে না। মাঝে মধ্যে বারান্দায় দাঁড়িয়ে শ্রীলতা উলটোদিকের উঠোনে ছোট ছেলেদের ক্রিকেট খেলা দেখে তাতে খেলার চেয়ে ঝগড়াই বেশি।
এত বড় কলকাতা শহরে শ্রীলতার আত্মীয়স্বজন বলতে প্রায় কিছু নেই। এক দূর সম্পর্কের পিসি থাকে অনেক দূরে গড়িয়ায়। সেখানে শ্রীলতার একা একা যাতায়াত করার সাহস নেই। আর কোথাও যাওয়ার নেই তার, এ শহরে কোনও বন্ধুবান্ধবীও থাকার কথা নয় শ্রীলতার মতো নিতান্ত মফসসলি মেয়ের।
মোট কথা শ্ৰীলতার সময় আর কাটতে চায় না। জ্যোতিষ অফিস চলে যাওয়ার পরে সদর দরজায় শক্ত করে ছিটকিনি দিয়ে সে এসে একটু বারান্দায় দাঁড়ায়, জ্যোতিষের যাওয়া দেখে, প্রায় প্রতিদিনই কোয়ার্টার্স থেকে বেরুনোর পথে বাঁক নিয়ে অদৃশ্য হওয়ার আগে জ্যোতিষ একবার ঘুরে সোহাগভরা দৃষ্টিতে নবপরিণীতা বউয়ের দিকে তাকায়।
এর পরে সব ফাঁকা। সারাদিন দরজা বন্ধ ঘরের মধ্যে শ্রীলতার একা একা অসহ্য লাগে। দুটো কুমিরের মতো আকারের কালো ডোরাকাটা টিকটিকি আছে ঘরের মধ্যে, একেকদিন তারা নিজেদের মধ্যে খুব লড়াই করে। শ্রীলতার মন খুব নরম, ঝগড়া-লড়াই এসব তার একদম পছন্দ নয়। সে একটা হাতপাখা তুলে দূর থেকে ওদের ভয় দেখায়, শাসায়। টিকটিকিরা যে খুব ভয় পায় তা নয় তবে শ্ৰীলতার সময় কিছুটা কাটে।
এ ছাড়া কয়েকটা চড়ুই পাখি আছে। তারা মাঝে মধ্যে শ্রীলতাদের ফ্ল্যাটে দল বেঁধে বেড়াতে আসে। কিচির-মিচির করে শ্রীলতাকে অনেক কিছু বলে। শ্রীলতা সব বুঝতে পারে না, তবে চালের কৌটো খুলে কয়েকটা দানা বার করে মেঝেতে ছড়িয়ে দেয়, চড়ুইগুলো খুট খুট করে খায়।
বিয়েতে উপহার পাওয়া কয়েকটা গল্প-উপন্যাসের বই আছে। অধিকাংশ গল্প-উপন্যাসে খুব বেশি প্যাঁচ, সেসব পড়তে শ্রীলতার মোটেই ভাল লাগে না। তবু নিতান্ত বাধ্য হয়ে শ্রীলতা এসব বই-ই, সময় কাটানোর অজুহাতেই পড়ে ফেলেছে, এগুলো এমন বই নয় যে দুবার পড়া যায়। তবে খবরের কাগজ আছে। সেটা আবার ইংরেজি কাগজ। জ্যোতিষ ইংরেজি কাগজ পড়ে, শ্ৰীলতা স্বামীকে বলতে সাহস পায়নি বাংলা কাগজ রাখতে, কী জানি, সে হয়তো তাকে পাড়াগেঁয়ে, অশিক্ষিত, মূর্খ ভাববে। এখন আস্তে আস্তে ইংরেজি কাগজ পড়ার অভ্যেস করছে শ্রীলতা। তবে বড় খটমট, অনুমানে অর্থ বুঝে খবর পড়তে কারই বা ভাল লাগে? শ্রীলতারও লাগে না। তবু দুপুর জুড়ে বেশ কয়েকবার সে সমস্ত কাগজটা আগাগোড়া ওলটায়।
