০৩. আসল ফুটবল
ক্রমে দুর্গাপুজো এসে গেল। পুজো শেষ হতে না হতে স্কুলের বাৎসরিক পরীক্ষা।
তারপর শীতকাল, ব্যাডমিন্টন, ক্রিকেট। আমরা অবশ্য ক্রিকেট বলতাম না। খেলতাম এবং বলতাম, ব্যাটবল।
ফুটবলের কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। তবে শুনেছিলাম, আমাদের সেই ভূতে পাওয়া ফুটবলটি গঙ্গাজল ছিটিয়ে শোধন করে ঠাকুমা আন্নাদিকে দিয়ে আমাদের পাড়ার পিছনের খালের মধ্যে ফেলে দিয়েছিলেন। ততদিনে সে বল স্রোতে ভাসতে ভাসতে খাল-বিল, নদীনালা হয়ে বোধহয় মহাসাগরে গিয়ে পৌঁছেছে।
তা পৌঁছাক, এদিকে পাড়ায় পাড়ায় ছেলেরা যেখানেই ফাঁকা জায়গা আছে বাঁশের খুঁটি পুঁতে নিয়ে ইট ফেলে গোলপোস্ট বানিয়ে ফুটবল শুরু করে দিয়েছে। তারা অবশ্য আমাদের থেকে বড়, তারা বড় ফুটবলে খেলে।
অনেক দেখেশুনে, চিন্তা করে আমরা গিয়ে মণিকাকাকে ধরলাম। মণিকাকা ভাল লোক, আমাদের খুব সাহায্য করলেন।
তবে মণিকাকা বললেন, তোদের আমি খেলার জায়গা দেখিয়ে দিচ্ছি। একটু দূরে হবে কিন্তু জায়গাটা নিরিবিলি, কেউ বিরক্ত করবে না। কিন্তু কখনও বাসায় খেলতে পারবে না। তাহলেই আমি বল কেড়ে নেব।
মণিকাকার বেছে দেওয়া জায়গাটা সত্যিই ভাল। আমাদের বাড়ি থেকে একটু দূরে থানার পিছনে জায়গাটা। বেশ বড় খোলামেলা জায়গা। একটাই অসুবিধে মাঠের প্রায় মাঝখানে একটা বুড়ো বেলগাছ আছে, সে আর কী করা যাবে।
মাঠটার দুপাশে দুটো বড় লম্বা চালাঘর। পুলিশ ব্যারাক–একটা হিন্দু পুলিশ ব্যারাক, অন্যটা মুসলিম পুলিশ ব্যারাক। হিন্দু ব্যারাকের পাশে আরেকটা বেলগাছ, তার নীচে শিবমন্দির। মুসলিম ব্যারাকের পাশে একটা টিনের মসজিদ।
এদিকে মণিকাকা ঠাকুমাকে কী সব বুঝিয়ে, ভুজুং-ভাজুং দিয়ে আমাদের নাম করে পুরো পাঁচটা টাকা তার কাছ থেকে আদায় করলেন।
এখন আমরা বড় হয়েছি। এখন আর আমাদের জন্য ছোট ফুটবল নয়, বড় ফুটবল কেনা হল। তিন নম্বর ফুটবল। পৌনে পাঁচ টাকা দাম।
পাঁচ টাকা, পৌনে পাঁচ টাকা এসবের মূল্য তখন অনেক। পাঁচ টাকায় আমাদের বাজারে পাঁচটা বড় ইলিশ মাছ পাওয়া যেত যার কলকাতার বাজারে এবছর অন্তত দুশো টাকা করে মোট হাজার টাকা দাম হত।
তা সেই বহু মূল্যবান চর্মগোলক দিয়ে আবার আমাদের খেলা শুরু হল।
সেই ফুটবলের প্রচুর তোয়াজ করত দাদা। তখন যুদ্ধের বাজারে গ্রিজ পাওয়া যেত না। দাদা ময়রাপাড়া থেকে মাখন কিনে এনে ফুটবলের গায়ে মাখাত।
বিকেলবেলায় মাঠে যাওয়ার আগে দল বেঁধে যেতাম সাইকেল রিপেয়ারিং স্টোরে। সেখানে এক পয়সা দিয়ে ব্লাডার পাম্প করানো হত। সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল ব্লাডারের নল সুতো দিয়ে বেঁধে সেই নল বলের মধ্যে ঢোকানো। এই সময়ে দোকানদারের অসাক্ষাতে দাদা একটু ভেসলিন দোকানের কৌটো থেকে নিয়ে নলের মুখে লাগিয়ে দিত, নলটা ঢোকানো সহজ হত। তারপরে টাইট করে ফিতে বাঁধা। নলের জায়গাটা উঁচু হয়ে থাকলে কিক করার সময়ে সেখানে লাগলে পায়ে ব্যথা লাগবে।
এইরকম নানা বিধিনিয়ম মান্য করে আমরা পুলিশ ব্যারাকের মাঠে খেলতে যেতাম।
কিন্তু তিনদিনের মাথায় আবার ফ্যাসাদ। আমাদের ভাগ্যই খারাপ। এবং এই দুর্ভাগ্যের মূলে আবার দাদা।
দাদা এমন একটা পেনাল্টি কিক নিলে যে সেটা গোলকিপারের মাথার তিনহাত ওপর দিয়ে গিয়ে পড়ল হিন্দু পুলিশ ব্যারাকের বারান্দায়। বারান্দায় তখন কাঠের উনুনে বড় কড়াইতে সেপাইদের ডাল রান্না হচ্ছিল।
বল গিয়ে পড়ল সেই কড়াইতে। আন্নাদির ব্যাপারের থেকেও মারাত্মক অবস্থা হল সেদিন। জনাদশেক ষণ্ডা-গুণ্ডা চেহারার সেপাই আমাদের এই মারে তো সেই মারে।
গোলমাল শুনে থানার ভারপ্রাপ্ত কলিম দারোগা থানা থেকে বেরিয়ে আমাদের খেলার মাঠে এলেন। এসে ঘটনার বিবরণ শুনে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কি হিন্দু?
আমরা বললাম, হ্যাঁ।
কলিম দারোগা বললেন, বাঁচা গেল। হিন্দুর বল হিন্দুর ডালে পড়েছে, আমি এর মধ্যে নেই।
এতদিন পরে সাম্প্রদায়িকতার ঘোলাজলে বেষ্টিত হয়ে সেদিনের কলিম দারোগার স্বস্তির অর্থটা বুঝি।
সে যা হোক, একটু পরে ডাল থেকে তুলে আনা বলটা দেখে কলিম সাহেব বললেন, সে কী, তোমরা এই ছোট বলে খেল নাকি? তাই বল উড়ে গিয়ে রান্নার কড়াইতে পড়ে।
দারোগা সাহেবের পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন টাউন জমাদার। তাকে দারোগা সাহেব বললেন, জমাদার সাহেব, ঢাকাইপট্টিতে গিয়ে একটা বড় ফুটবল নিয়ে আসেন। আমার নাম বলবেন।
জমাদার সাহেব বল আনতে গেলেন, কলিম দারোগা আমাদের সঙ্গে গল্পগুজব শুরু করলেন। কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর প্রশ্ন করলেন, তোমাদের ক্লাবের নাম কী?
আমরা বললাম, আমাদের ক্লাব নেই। ক্লাবের নাম নেই। ক্লাব না হলে ফুটবল খেলা হয়? কলিম দারোগা বললেন, তোমাদের ক্লাবের নাম দাও মিলন মেমোরিয়াল ক্লাব।
ইতিমধ্যে জমাদার সাহেব একটা প্রমাণসাইজের ফুটবল নিয়ে চলে এসেছেন। তখনকার পুলিশের প্রতাপ খুব কম ছিল না। জমাদার সাহেব বলটা কলিম দারোগার হাতে দিয়ে বললেন, তোরাব চোটার দোকান থেকে নিয়ে এলাম। পাঁচনম্বর, একেবারে আসল ফুটবল, টি লেন।
টি লেন মানে কী, কে জানে? আমরা খুশিমনে বলটা নিয়ে চলে এলাম। আসার সময় দারোগা সাহেব আবার মনে করিয়ে দিলেন, মিলন মেমোরিয়াল ক্লাব মনে রেখো।
