কোনও পাঠকের মনে যদি এই প্রশ্ন উদয় হয়, তিনি যদি অন্তত মধ্যবয়সি হন তবে বলব তিনি ফুটবলের অ-আ-ক-খ জানেন না। ফুটবলের বর্ণপরিচয় তার হয়নি।
এখনও আছে কিনা জানি না, আমাদের ছোটবেলায় ফুটবল ছিল এক থেকে পাঁচ নম্বরের।
গেঞ্জির যেমন নম্বর আটাশ, বত্রিশ, ছত্রিশ তেমনই ফুটবলের নম্বর আকার অনুযায়ী। সবচেয়ে ছোটটা ছোট বয়সের বালকদের, সদ্য যারা শৈশব উত্তীর্ণ হয়েছে তাদের জন্য। আকার একটা ভাল সাইজের বাতাবি লেবুর মতো।
আকারে ছোট হলেও বড় ফুটবলের মতোই এর মধ্যে রবারের ব্লাডার ছিল, সেটা পাম্প করে। ফোলাতে হত। ফিতে ছিল, যাকে বলা হত লেস, ব্লাডার ফোলানোর পর সেই নল বলের মধ্যে ঢুকিয়ে ফিতে বাঁধা হত। এই একনম্বর বল দিয়েই প্রকৃত ফুটবল খেলা শুরু।
প্রথম ধাপ ছিল রবারের কিংবা টেনিস বল দিয়ে। রবারের লাল-নীল বল, দাম তিন পয়সা কি চার পয়সা। কিন্তু যুদ্ধ মানে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ সরগরম হতে রবারের বল বাজারে দুষ্প্রাপ্য হল।
দাদা ঠাকুমার শরণাপন্ন হল।
তিন পয়সা বা এক আনা নয়, দু আনা দশ পয়সাতেও বাজারে বল মিলছে না। বেশি দামে যদিও বা কোনও কোনও দোকানে পাওয়া যাচ্ছে সেও অতি পুরনো, লিক হওয়া বল, একটু খেলতেই ফুটো দিয়ে হাওয়া বেরিয়ে গিয়ে, চুপসিয়ে যায়। সে বল দিয়ে আর খেলা যায় না।
এরপরে আমরা কাঁচা বাতাবি লেবু দিয়ে কিছুদিন খেলার চেষ্টা করলাম। আমাদের অঞ্চলে বলত জাম্বুরা। প্রকৃত গোলাকার জাম্বুরা বিরল, সে সংগ্রহ করাও কঠিন। আর সেই জাম্বুরাও ভাদ্রমাসের মধ্যে সব ফুরিয়ে গেল।
ঠাকুমাকে দাদা সমস্যার কথা বলতে, ঠাকুমা সব শুনে বললেন, ঠিক আছে আমি দেখছি। মণিকে একটা খবর দিস।
ঠাকুমার দক্ষিণ হস্ত ছিলেন মণিকাকা। আমাদের পাড়াতেই থাকতেন। পাড়া সুবাদে কাকা, আমাদের আত্মীয় ছিলেন না। খুব ভাল বাঁশি বাজাতেন। তখন গানের মাস্টারি করতেন আর ফাঁইফরমায়েস খাটতেন।
পরদিন বিকেলে আমাদের এত্তেলা পেয়ে মণিকাকা ঠাকুমার কাছে এলেন। তার পনেরো মিনিট পরে মণিকাকার সঙ্গে বেশ কয়েকজন সহ-খেলোয়াড় সমেত আমি আর দাদা গেলাম ঢাকাইপট্টিতে।
ঢাকাইপট্টি আমাদের শহরের বড় রাস্তায় বাজারের পিছন দিকে একসারি দোকান। সবই জুতোর। দোকান। জুতো ছাড়াও এসব দোকানে পাওয়া যেত ছাতা, ওয়াটারপ্রুফ, খেলার সরঞ্জাম ইত্যাদি।
এই ইত্যাদির মধ্যে ক্যারামবোর্ড, ব্যাডমিন্টনের নেট ও র্যাকেট, ক্রিকেট ব্যাট, ফুটবল, ফুটবলের ব্লাডার ও পাম্প এইসব রয়েছে।
ঢাকাইপট্টির প্রথম দোকানই মণি মিঞার দোকান। মণিকাকা আর দোকানদারের নামের মিল থাকাতে দুজনে পরস্পরের মিতা।
সেই মিতার দোকান থেকে দেড় টাকা দিয়ে আমাদের জীবনের প্রথম ফুটবল কেনা হল। সবচেয়ে ছোট সাইজের একনম্বর ফুটবল।
০২. নম্বরের ক্রম বিবর্তন
এক নম্বরের ফুটবল ছিল বেশ ছোট আকারের। প্রায় একটা বড় বাতাবি লেবুর সাইজেরই হবে। আগে আমরা যে বড় রবারের বল নিয়ে খেলতাম তার চেয়ে বড় বটে কিন্তু খুব হালকা।
আমরা খেলতাম বাড়ির সামনের উঠোনে, দালান আর কাছারিবাড়ির মধ্যে। সুযোগ পেলেই দাদা এক কিকে বলটাকে ছাদের ওপরে পাঠিয়ে দিত। সিঁড়ি দিয়ে ছুটে ছাদে উঠে আবার বলটাকে নামিয়ে আনতে হত।
অনেক সময় ছাদে আমসত্ত্ব, কাসুন্দি, ডালের বড়ি রোদে দেওয়া হত। হঠাৎ বল পড়ে সেসব তছনছ হয়ে যেত। রীতিমতো হইচই পড়ে যেত বাড়ির মধ্যে, ঠাকুমা দুবার বল কেড়ে নিয়ে তার লেপ-তোশক রাখার বড় কাঠের আলমারিতে তালা দিয়ে রাখলেন। বহু কষ্টে, কাদাকাটি করে দাদা সে বল উদ্ধার করে নিয়ে এল, তবে মুচলেকা দিতে হল, বল আর ছাদে উঠবে না।
কিন্তু প্রতিশ্রুতি রক্ষিত হল না। খেলার উত্তেজনার মধ্যে ঠাঁই করে এক হাফ কিক দিয়ে দাদা আবার বল শূন্যে পাঠাল, শূন্য থেকে ছাদে পড়ল সেই বল।
সেদিন খুবই কেলেংকারি হল। বড় চিনেমাটির বয়ামে জলপাইয়ের তেল-আচার ছাদে রোদে দেওয়া হয়েছিল। বিকেলের পরে রোদ পড়তে এসব জিনিস ছাদ থেকে নামিয়ে নিয়ে যাওয়া হত।
কিন্তু আমাদের খেলা শুরু হয়ে যেত রোদ পড়তে না পড়তে, স্কুল থেকে ফিরেই।
সেদিন বয়াম নামিয়ে আনার সময় ঠাকুমার খাস পরিচারিকা আন্নাদির মাথার পিছনে গিয়ে লাগল দাদার কিক করা বল। ওরে বাবারে, মেরে ফেললে রে বলে আর্ত চিৎকার করে ছাদের ওপরে লুটিয়ে পড়ল আন্নাদি। তার কাঁখ থেকে পড়ে আচারের বয়াম চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। সারা ছাদ জুড়ে চিনেমাটির ভাঙা টুকরো, জলপাই আর তেলের ছড়াছড়ি।
আন্নাদির ছিল ভূতের ভয়। ছাদের চিলেকোঠা ঘরে এক বা একাধিক ভূত আছে, এ কথা আন্নাদির কাছে জ্ঞান হওয়া ইস্তক আমরা শুনে আসছি।
ভূতের ভয়ে ভরদুপুরে, ভর-সন্ধ্যায়, রাতের বেলায় আন্নাদি ছাদে উঠত না। কিন্তু পড়ন্ত বিকেলে ভূত পিছন থেকে মাথার ওপরে লাফিয়ে পড়বে এটা আন্নাদি ভাবতেও পারেনি।
আন্নাদি চিৎকার শুনে পাড়ার অর্ধেক লোক আমাদের বাড়িতে ছুটে এল। সব কথা শোনার পর তারা ঠাকুমাকে দুষতে লাগল, এসব কর্তামার দোষ। তিনি আহ্লাদ করে ওইটুকু নাতিদের ফুটবল কিনে দিতে গেলেন কেন?
আবার ফুটবল বাজেয়াপ্ত হল।
আমরাও বিকেলবেলা খেলাধুলা না করে নদীর ধারে গিয়ে খেয়াঘাটে লোকজন যাতায়াত দেখে সময় কাটাতে লাগলাম।
