কথাটা অমরজিৎ খেয়েছে। আগামী মরশুম থেকেই তার যাত্রাপার্টি চালু হবে। সে সাবেকি কায়দায় তার যাত্রাদলের নাম রাখতে চেয়েছিল চক্রবর্তী কোম্পানি কিন্তু মিলনলাল বলেছে, আজকাল ওসব চলবে না। লাগসই আধুনিক নাম চাই। অবশেষে অমরজিতের ভাবী যাত্রাদলের নাম হয়েছে। সখাসখী অপেরা।
সখাসখী অপেরার নামকরণ হওয়ার পর আজ মিলনলাল অমরজিতকে নিয়ে বেরিয়েছে হিরোইন নির্বাচন করতে। যাত্রার মরশুম এখনও বেশ দূরে, ধীরে সুস্থে হিরোইন নির্বাচন করলেই চলত। কিন্তু অমরজিৎ উতলা হয়ে পড়েছে অবিলম্বে হিরোইন সংগ্রহ করার জন্য।
কারণটা অবশ্য একটু অন্যরকম। গতকালই শ্যামলীর সঙ্গে তার একহাত হয়েছে। শ্যামলী তাকে ধরেছিল, তুমি আলাদা থাক কেন? বম্বে-মাদ্রাজে কী করেছিলে? ইত্যাদি বহুবিধ মর্মভেদী প্রশ্ন, সেই সঙ্গে লম্পট, হিজরে ইত্যাদি বিশেষণ প্রয়োগে তাকে জর্জরিত করেছিল শ্যামলী, কুৎসিত, মোটা, কালো, কোলা ব্যাঙের মতো থপথপে, মরা কাতলা মাছের মতো ঠান্ডা শ্যামলী।
নিতান্ত প্রতিশোধ স্পৃহা থেকে আজ এই সাতসকালে মিলনলালকে সঙ্গে নিয়ে নায়িকা পছন্দ করতে বেরিয়েছেন অমরজিৎ। মিলনলাল সকাল সকালেই এসে গেছে, বাড়ি থেকে বেরিয়ে অমরজিতের সাদা বিরাট গাড়িটায় বসে মিলনলাল প্রথমেই বলল, স্যার, তাহলে প্রথম হেমামালিনীর কাছেই যাই।
হেমামালিনীর নাম শুনে চমকিয়ে উঠলেন অমরজিৎ, বম্বেতে পঞ্চাশ হাজার টাকা গচ্চা যাওয়ার শোক এখনও তিনি ভুলতে পারেননি, ভাবলেন হেমামালিনী বোধহয় কলকাতায় এসেছে, মাঝে মাঝেই তো আসে, এ্যান্ডে বা এয়ারপোর্ট হোটেলে হয়তো উঠেছে। কিন্তু হেমা বাংলা যাত্রার হিরোইন হতে রাজি হবে কি, সময়ই বা পাবে কোথায়?
মিলনলাল বোঝাল, না, না। এ হেমামালিনী সে হেমামালিনী নয়। এ থাকে বরানগরে, আগের নাম ছিল কুঁচি পাল, ধর্মাধর্ম অপেরার ম্যানেজার গজানন মণ্ডল ও নাম চলবে না বলে হেমামালিনী করে দিয়েছে। আমরা এখন যাচ্ছি হেমাকে ধর্মাধর্ম অপেরা থেকে ভাঙিয়ে আনতে।
বরানগরের গলিতে দোতলার ওপরে দু কামরার ফ্ল্যাট, বাইরের ঘরে বেতের সোফা সেট, খুব দামি নয় কিন্তু ভালই। হেমা খুব সপ্রতিভ মেয়ে, স্নান করতে গিয়েছিল, স্নান সেরে ভেজা এলোচুলে এসে নমস্কার করল, পাতলা, ছিপছিপে, শ্যামাঙ্গিনী তরুণী। সামান্য কথাবার্তার পর হেমা বলল তার একটু তাড়াতাড়ি আছে, পুরুলিয়ায় যাত্রা আছে রাতে, একটু পরেই বেরোতে হবে। মিলনলাল বলল, ঠিক আছে, পরে একদিন এসে কথা বলা যাবে।
দুজনে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে এল। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে অমরজিৎ একবার ফুঃ বললেন। তারপর আবার গাড়িতে বসে আরেকবার ফুঃ বললেন।
ফুঃ! এই উক্তি অমরজিতের ওষ্ঠে শুনে মিলনলাল চিন্তিত হল, কী রে বাবা হেমাকে পর্যন্ত পছন্দ হল না। তারপর একটু ভেবে ঠিক করল যাত্ৰাজগতের মক্ষিরানী অনন্ত যৌবনা অমলাবালার কাছে নিয়ে যাই, অমলাবালাকে পছন্দ হতেই হবে। যাত্রার এক নম্বরী মহিলা যাকে বলে তাই।
অমলাবালা প্রায় মধ্যবয়সিনী, গৌরতনু, সুডৌল এক রমণী। তাকে খুব মনোযোগ দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন অমরজিৎ। কিঞ্চিৎ বাক্যালাপ ও চা পান ইত্যাদিও হল। কিন্তু অমলাবালার বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাইরের দরজার পাপোশে পা রেখেই অমরজিৎ আবার বললেন, ফুঃ! গাড়িতে উঠে সিটে বসে যথারীতি আরেকবার ফুঃ।রীতিমতো চিন্তায় পড়ল মিলনলাল। হেমাকেও ফুঃ, অমলাকে ফুঃ অমরজিতের রুচিটা তো ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। যা হোক একবার রেহানা বেগমের কাছে নিয়ে গিয়ে শেষ চেষ্টা করল মিলনলাল।
রেহানা বেগম যাকে বলে একেবারে আগুন। যেমন তার গায়ের রং, তেমনি গড়ন, যেমন তার চোখ, তেমন তার চাউনি, চলাফেরা কিন্তু ওই রেহানা বেগমকে দেখে বেরিয়ে আবার অমরজিৎ ফুঃ বললেন। ঘরের মধ্যে সোফায় বসেও একবার অস্ফুটে ফুঃ বলেছিলেন, রেহানা যখন চা আনতে গেল তখন তার পিছন দিকে তাকিয়ে। আবার এবার গাড়ির মধ্যে ফিরে এসে আরেকবার ফুঃ।
রেহানার পর জবা, জবার পর মালতী। নায়িকা খুঁজতে খুঁজতে দুপুর গড়িয়ে গেল। কিন্তু সব জায়গাতেই ওই ফুঃ।
অবশেষে ক্লান্ত, পর্যদস্ত মিলনলাল সাহস করে অমরজিৎকে প্রশ্ন করল, সে কী স্যার এত ভাল ভাল রাজ্যের সব সেরা হিরোইন দেখালাম আপনার কাউকেই পছন্দ হল না?
অমরজিৎ বললেন, পছন্দ হবে না কেন? সবাইকে পছন্দ হয়েছে।
মিলনলাল বলল, তা হলে?
অমরজিৎ বললেন, তা হলে!
মিলনলাল বলল, ওই যে একেকজনকে দেখেই আপনি বললেন ফুঃআমি ভাবলাম বুঝি আপনার অপছন্দ হয়েছে।
অমরজিৎ বললেন, ধুৎ, তুমি যেমন গাধা। আমি কি আর ওদের ফুঃ বলেছি, আমি ফুঃ বলেছি আমার বউ শ্যামলীকে, কোথায় ওরা আর কোথায় শ্যামলী, তাই ফুঃ বলেছি।
আশ্বস্ত হল মিলনলাল, বলল, তাহলে কাকে নেবেন। অমরজিৎ বললেন, যে কয়জনকে পাওয়া যাবে সবাইকে নেব। সখাসখি অপেরা নয়, সখি অপেরা নাম হবে আমার কোম্পানির, নায়ক-টায়ক লাগবে না, সাতজন নায়িকা থাকবে।
এই বলে আবার একটা বিশাল ফুঃ করলেন অমরজিৎ, অবশ্যই সাতজন নায়িকা বনাম ধুমসী, থপথপে শ্যামলীর উদ্দেশে।
ফুটবল
০১. ধাপে ধাপে ফুটবল
পাঁচ নম্বর ফুটবল?
সে আবার কী?
ফুটবলের আবার নম্বর কীসের? ফুটবলের খেলোয়াড়ের জার্সিতে অবশ্য নম্বর দেখা যায়, কিন্তু ফুটবলের নম্বর জিনিসটি কী?
