অমরজিৎ স্কটিশচার্চ কলেজ এবং যাদবপুরের ছাত্র। প্রজাপতির মতো রঙিন ও সুন্দরী সহপাঠিনী ও বান্ধবীদের সঙ্গে তার প্রথম যৌবনের দিনগুলি কেটেছে। তারপর কলেজ ছাড়তে না ছাড়তে বিয়ে। শ্যামলী। প্রথম প্রথম ব্যাপারটা খারাপ লাগেনি। বরং একটু মাদকতাই ছিল তার মধ্যে। বাইশ-তেইশ বছরের শ্যামলী তখন সেও দেখতে ভালই ছিল, সেই যে মাইকেল লিখেছিলেন না, যৌবনে কুকুরীও ধন্যা, অনেকটা প্রায় সেইরকম। শ্যামলীর তখন গায়ের কালো রঙের একটু লালিত্য ছিল, মুখে চোখে তারুণ্যের আহ্লাদ ছিল।
এখনকার শ্যামলীকে দেখলে এই শ্যামলীর কথা মনে পড়া সম্ভব নয়। স্থলাঙ্গিনী, কৃষ্ণকায়, মাংসল মুখের মধ্যে থ্যাতা নাক, কুতকুঁতে চোখ।
অথচ এখনও রাস্তাঘাটে অমরজিতের যখন পুরনো বান্ধবী বা সহপাঠিনীদের সঙ্গে দেখা হয় তার দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে, এরা এখনও কেমন তরল, চঞ্চল, ফুটফুটে রয়েছে। তা ছাড়া অমরজিতের বন্ধুদের অনেকের এখনও বিয়ে হচ্ছে, সেসব বিয়েতে তাকে বরযাত্রীও যেতে হচ্ছে। সেসব বিবাহবাসরে গিয়ে সুসজ্জিতা নববধূ এবং তাদের সঙ্গিনীদের দেখে অমরজিৎ বিহ্বল বোধ করেন। নিজের ওপর রাগ হয়, কেন মরতে একুশ বছর বয়েসে বিয়ে করতে গিয়েছিলাম। তার ওপরে ওই কালো ধুমসিকে। পিতামহ বৈকুণ্ঠনাথের ওপর তাঁর আরও রাগ হয়, নাতবউয়ের মুখ দেখার জন্যে বুড়ো তাঁকে ডুবিয়ে গেছে, বুড়ো তো মাত্র তিন মাস শ্যামলীর মুখ দেখতে পেয়েছিল তারপরেই অক্কা পায় কিন্তু তাকে যে সারাজীবন ওই মুখ দেখতে হচ্ছে। অবশেষে এখন অমরজিৎ ওড়া শুরু করেছেন। স্বৰ্গত বৈকুণ্ঠনাথের ওপর যতই রাগ হোক তার, কিন্তু বৈকুণ্ঠনাথ প্রতিষ্ঠিত চক্রবর্তী অ্যান্ড কোম্পানি, গোল্ড মার্চেন্টস অ্যান্ড জুয়েলার্স পানমরার কল্যাণে তখনও রীতিমতো বহাল তবিয়তে আছে। অর্থাভাব নেই অমরজিতের।
গয়নার দোকান যথারীতি চলতে লাগল সেইসঙ্গে উদ্বৃত্ত অর্থের সদ্ব্যবহার করার চেষ্টা করতে লাগলেন তিনি।
প্রথমে ঠিক করলেন সিনেমা কোম্পানি করবেন। বাজারে এ খবর ছড়িয়ে পড়তে ঝাকে ঝাকে পরামর্শদাতা জুটে গেল। দুবার বম্বে এবং একবার মাদ্রাজ গেলেন অমরজিৎ। কিন্তু দশ-বিশ লাখ টাকা পুঁজির বাঙালি প্রযোজকের কোনও সুবিধা হল না। সেখানকার তরলা যৌবনবতীরা এক ঝলকের জন্যেও অমরজিতের সঙ্গে দেখা করলেন না। মধ্যে থেকে দালালে টাউটে হাজার পঞ্চাশ টাকা খরচ হয়ে গেল। পঞ্চাশ, একশো কোটি অন্তত মেরে কেটে দশ বিশ কোটি টাকা না হলে বম্বেতে পাত্তা পাওয়া অসম্ভব।
কলকাতায় ফিরে এসে এক অত্যাধুনিক প্রগতিশীল পরিচালকের পাল্লায় পড়লেন অমরজিৎ। সে ছোকরা বছর সাতেক ধরে এম. এ. পড়ার পরে কফিহাউস, কলেজ স্ট্রিটে প্রচুর ধোঁয়া উড়িয়ে গলা উঁচু খদ্দরের পাঞ্জাবি পরে সুকান্তের আর শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা আবৃত্তি শুরু করে, সেখান থেকে ওই যাকে বলে গ্রুপ থিয়েটার পরিচালনা ও অভিনয়, রাবণরাজারা তিন ভাই নাটকের বিখ্যাত বিভীষণ চরিত্রে, তারপর দেশাত্মবোধক টেলিফিল্ম হাতে হাত মেলাওঅবশেষে সিনেমায় এসেছে। কলকাতার রাস্তার কুকুরদের নিয়ে তার পনেরো মিনিটের তথ্যচিত্র কামস্কাটকা ফিল্ম উৎসবে অল্পের জন্য তাম্রগাভী পায়নি।
ছোকরার আগে কী নাম ছিল বলা কঠিন তবে এখন নাম বহ্নিবলয় চৌধুরী। সে এবার কলকাতার তিনশো বছর উপলক্ষে জব চার্নকের যৌবন ও বাল্যকালের ওপর একটা চিত্রনাট্য লিখেছে।
বহ্নিবলয় তালেবর যুবক, অমরজিৎ কী চায় সে বুঝতে পেরেছিল। চার্নকের বাল্য ও যৌবনকাল কেটেছে বিলেতে, সুতরাং শ্বেতাঙ্গিনী অন্তত অ্যাংলো প্রয়োজন নায়িকা ও অন্যান্য মহিলা চরিত্রে। মাসখানেক বহ্নিবলয় ও অমরজিৎ ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে খালি কুঠি আর পার্ক স্ট্রিটে বারে হোটেলে ঘুরে শ্বেতাঙ্গিনী নায়িকার অনুসন্ধান করে বেড়াল।
এই সময়েই ডাকাবুকো মেয়ে (কলগার্ল) পামেলা বর্দের খ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। পার্ক স্ট্রিটের ফুটপাথ থেকে কেনা বিলিতি কেচ্ছা পত্রিকায় পামেলার নানা মনোহারিণী ভঙ্গিমার ছবি দেখছিল একদিন অমরজিৎ। তখন বহ্নিবলয় তাকে পরামর্শ দেয়, চলুন লন্ডনে গিয়ে পামেলাকে জোব চার্নকের যৌবনের প্রথম সঙ্গিনীর পার্টে আমাদের বইয়ের নায়িকার ভূমিকায় প্রপোজাল দিই। যদি রাজি হয় সারা পৃথিবীতে হইহই পড়ে যাবে।
মাস দেড়েক বাদে পাসপোর্ট ইত্যাদির ঝামেলা মিটিয়ে অমরজিৎ ও বহ্নিবলয় যখন লন্ডনে পৌঁছাল তখন পামেলা মেমসাহেব নাগালের বাইরে, তিনি তখন আজ এখানে কাল সেখানে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু লন্ডনে নিশ্চয় কোনও গর্হিত, অতি গর্হিত কাজ করেছিল বহ্নিবলয়। কারণ হঠাৎ একদিন দুম করে গজভুক্ত কপিথবৎ বহ্নিবলয়কে ফেলে অমরজিৎ কলকাতায় ফিরে আসেন। বহ্নিবলয়ের এরপরে আর কোনও খবর পাওয়া যায়নি, শোনা গেছে সোহো অঞ্চলে সে একটি নাইট ক্লাবে গেলাস ধোয়ার কাজ করছে।
এদিকে কলকাতায় ফিরে অমরজিৎ স্ত্রীর সঙ্গে এক ঘরে শোয়া বন্ধ করে দেন এবং কেউ কেউ বলে গোপনে এইডস রোগের কারণ, প্রতিকার ও চিকিৎসা বিষয়ে যথাসাধ্য খোঁজখবর করেন।
যতদূর মনে হয় অমরজিতের আশঙ্কাটা অমূলক ছিল। কারণ এখন আবার তিনি পুরোপুরি উড়তে শুরু করেছেন এবং শ্যামলীর শয়নকক্ষে আর ফিরে যাননি। এবার তার বাহন জুটেছে মিলনলাল সেনগুপ্ত। মিলনলাল যাত্রার লোক। সে অমরজিৎকে বার্তা পাঠিয়েছে যাত্রাপার্টি খুলুন, এ হল যাত্রার যুগ, যাত্রার মরশুমে গ্রামগঞ্জের বাতাসে লাখ লাখ টাকা হাওয়ায় ওড়ে। ঠিক মতো পালা আর খলবলে নায়িকা থাকলেই যাত্রার রমরমা।
